শুক্রবার ● ২৩ জানুয়ারী ২০২৬

নাগরিক সমাজের প্রতিবাদ কলাপাড়ায় জ্বালানি-বিদ্যুৎ খাতের খসড়া মহাপরিকল্পনা বাতিলের দাবি

হোম পেজ » লিড নিউজ » নাগরিক সমাজের প্রতিবাদ কলাপাড়ায় জ্বালানি-বিদ্যুৎ খাতের খসড়া মহাপরিকল্পনা বাতিলের দাবি
শুক্রবার ● ২৩ জানুয়ারী ২০২৬


 

কলাপাড়ায় জ্বালানি-বিদ্যুৎ খাতের খসড়া মহাপরিকল্পনা বাতিলের দাবি

সাগরকন্যা প্রতিবেদক, পটুয়াখালী

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের ২৫ বছর মেয়াদি খসড়া মহাপরিকল্পনা ‘ইন্টিগ্রেটেড পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি সিস্টেম মাস্টার প্ল্যান (ইপিএসএমপি ২০২৫)’ বাতিলের দাবিতে পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠন। শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) কলাপাড়া প্রেসক্লাবের সামনে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।

 

প্রতিবাদকারীরা অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৬-২০৫০ মেয়াদের এই খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, স্বচ্ছতা ও জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত না করেই প্রণয়ন করেছে। পরিকল্পনাটি প্রণয়নে পরিবেশ ও সমাজের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি এবং জনশুনানি বা উন্মুক্ত পরামর্শ ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নীতি চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে তারা দাবি করেন। একই সঙ্গে ডলারের রিজার্ভ রক্ষায় জ্বালানি খাতে এলএনজি নির্ভর ‘বিলাসী পরিকল্পনা’ থেকে সরে আসার আহ্বান জানানো হয়।

 

প্রতিবেশ ও উন্নয়ন ফোরাম-পটুয়াখালীর আহ্বায়ক অমল মুখার্জির সভাপতিত্বে এবং সদস্য সচিব মো. নজরুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন ফোরামের সদস্য ও পরিবেশকর্মী মেজবাহউদ্দিন মান্নু, সাবেক কাউন্সিলর মনোয়ারা বেগম এবং প্রান্তজন ট্রাস্টের মাঠ সমন্বয়ক সাইফুল্লাহ মাহমুদ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন কলাপাড়া প্রেসক্লাবের সদস্য শরীফুল হক শাহীন, ‘আমরা কলাপাড়াবাসী’ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সভাপতি নাজমুস সাকিবসহ স্থানীয় নাগরিক প্রতিনিধিরা।

 

বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি)-এর উদ্যোগে এবং প্রান্তজন ট্রাস্ট, প্রতিবেশ ও উন্নয়ন ফোরাম-পটুয়াখালী ও উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন)-এর সহ-আয়োজনে কর্মসূচিটি অনুষ্ঠিত হয়।

 

প্রান্তজন ট্রাস্টের মাঠ সমন্বয়ক বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের খসড়া মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সাধারণ জনগণ, নাগরিক সমাজ ও স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। কোনো ধরনের অর্থবহ পরামর্শ বা জনশুনানি ছাড়াই পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা পূর্ববর্তী সরকারের অস্বচ্ছ ও দায়মুক্তিমূলক নীতি প্রণয়নের পুনরাবৃত্তি। তিনি এই খসড়া মহাপরিকল্পনা অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানান।

 

আলোচনায় বক্তারা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব ছিল নিয়মিত রাষ্ট্র পরিচালনা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই সীমা অতিক্রম করে দীর্ঘমেয়াদি, উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ও বহুমাত্রিক প্রভাবসম্পন্ন একটি জ্বালানি পরিকল্পনা চাপিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তারা আরও বলেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও অংশগ্রহণমূলক পরামর্শ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। অতীতে দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন ব্যবহার করে যেভাবে বিতর্কিত প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, ইপিএসএমপি ২০২৫ সেই একই পথে ভবিষ্যতেও জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর প্রকল্পকে বৈধতা দেওয়ার কাঠামো তৈরি করছে।

 

বক্তারা জানান, মহাপরিকল্পনায় ‘এনার্জি ট্রানজিশন’ শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হলেও বাস্তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রকৃত অংশ মাত্র ১৭ শতাংশ, যেখানে কাগজে দেখানো হয়েছে ৪৪ শতাংশ। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ১৫ দশমিক ৮ গিগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে ২৫ দশমিক ২ গিগাওয়াট করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৫ বছর পরও এলএনজি, কয়লা ও তেলের ওপর নির্ভরতা থাকবে প্রায় ৫০ শতাংশ, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ বলে তারা মনে করেন।

 

এছাড়া হাইড্রোজেন, অ্যামোনিয়া কো-ফায়ারিং ও কার্বন ক্যাপচার (সিসিএস)-এর মতো ব্যয়বহুল ও পরীক্ষামূলক প্রযুক্তিকে সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা বাস্তবসম্মত নয় এবং ভবিষ্যতে দেশকে নতুন ঋণ, ভর্তুকি ও পরিবেশগত সংকটে ফেলতে পারে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৫০ সালে বাংলাদেশের কার্বন নির্গমন ১৮৬ দশমিক ৩ এমটিসিও₂ই হবে, যা জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) লক্ষ্য এবং অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষিত ‘শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব, শূন্য কার্বন’ দর্শনের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক বলে বক্তারা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি শ্রমিক পুনর্বাসন, নারী ও লিঙ্গভিত্তিক ন্যায্যতা, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পোশাক খাতের সবুজায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পরিকল্পনায় উপেক্ষিত থাকার অভিযোগ তোলা হয়।

 

প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে চার দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- অবিলম্বে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা ২০২৫ স্থগিত ও সম্পূর্ণ বাতিল, নাগরিক সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে স্বচ্ছ জাতীয় পরামর্শ প্রক্রিয়া শুরু, জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা কমিয়ে বাস্তবসম্মত শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানির রোডম্যাপ প্রণয়ন এবং ন্যায্য ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি রূপান্তরের ভিত্তিতে নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ।

 

বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এসব দাবি উপেক্ষা করা হলে ইপিএসএমপি ২০২৫ বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেকটি জনবিরোধী, অস্বচ্ছ ও দায়মুক্তিমূলক নথি হিসেবে চিহ্নিত হবে, যা দেশের জনগণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

বাংলাদেশ সময়: ১৪:৩৪:৫৩ ● ৩২ বার পঠিত