সোমবার ● ২ নভেম্বর ২০২৬

জাহাজ চলাচল শুরু হতে লাগবে ৫-৬ দিন মৌসুম শুরুর দিনে একজন পর্যটকও যাননি সেন্টমার্টিনে

হোম » পর্যটন » জাহাজ চলাচল শুরু হতে লাগবে ৫-৬ দিন মৌসুম শুরুর দিনে একজন পর্যটকও যাননি সেন্টমার্টিনে
সোমবার ● ২ নভেম্বর ২০২৬


মৌসুম শুরুর দিনে একজন পর্যটকও যাননি সেন্টমার্টিনেসাগরকন্যা প্রতিবেদক, কক্সবাজার

 

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১ নভেম্বর থেকে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন। তবে পর্যটন মৌসুমের প্রথম দিনেও দ্বীপের উদ্দেশে ছেড়ে যায়নি কোনো পর্যটকবাহী জাহাজ। প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন, কারিগরি প্রস্তুতি এবং ট্রাভেল পাসের সফটওয়্যার চালু না হওয়ায় পর্যটকেরা দ্বীপে যেতে পারেননি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে আগামী ৫ বা ৬ নভেম্বর থেকে জাহাজ চলাচল শুরু হতে পারে।

 

পর্যটন মৌসুম শুরু হওয়ায় দ্বীপের হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁগুলো পর্যটক বরণের প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করছে। একই সঙ্গে কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া জেটিঘাটেও পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচলের প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু মৌসুমের প্রথম দিনেই জাহাজ চলাচল শুরু না হওয়ায় দ্বীপের বাসিন্দা, পর্যটন ব্যবসায়ী ও জাহাজ মালিকদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।

 

জানা গেছে, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পেলেও পর্যটকবাহী সব জাহাজ এখনো নৌপরিবহন অধিদপ্তর, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও জেলা প্রশাসনের প্রয়োজনীয় অনুমোদন পায়নি। এ ছাড়া পর্যটকদের টিকিট বুকিং ও ট্রাভেল পাসের জন্য বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের সফটওয়্যার পুরোপুরি চালু না হওয়ায় জাহাজ চলাচল নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে।

 

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের গত ২৫ অক্টোবরের আন্তমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত সেন্টমার্টিনে পর্যটকেরা ভ্রমণ ও রাতযাপন করতে পারবেন। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার পর্যটক যাওয়ার সুযোগ পাবেন। প্রত্যেক পর্যটককে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিতে হবে। পাশাপাশি দ্বীপে ভ্রমণের জন্য ট্রাভেল পাস নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

 

সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (স্কোয়াব) সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পেয়েছে এমভি কর্ণফুলী এক্সপ্রেস, এমভি বার আউলিয়া ও এমভি টেকনাফ। এই তিনটি জাহাজের মোট যাত্রী ধারণক্ষমতা প্রায় ২ হাজার ৩০০। তবে শুধু পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পেলেই জাহাজ চালানো সম্ভব নয়। নৌপরিবহন অধিদপ্তরের প্রয়োজনীয় সনদ, বিআইডব্লিউটিএর রুট পারমিট এবং জেলা প্রশাসনের স্থানীয় অনুমোদনও প্রয়োজন।

 

তিনি আরও বলেন, এসব অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং ট্যুরিজম বোর্ডের ট্রাভেল পাস-সংক্রান্ত সফটওয়্যার চালু না হওয়ায় ১ নভেম্বর থেকে জাহাজ চলাচল শুরু করা যায়নি। পর্যটকদের টিকিট বুকিংয়ের জন্য ট্যুরিজম বোর্ডের সফটওয়্যার ব্যবহারের কথা থাকলেও সেটি পুরোপুরি সচল না হওয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের কার্যক্রম সমন্বিতভাবে সম্পন্ন করা গেলে পর্যটক ও জাহাজ মালিকদের ভোগান্তি কমত।

 

স্কোয়াবের এই নেতা বলেন, সেন্টমার্টিন জেটি পর্যটকবাহী জাহাজ গ্রহণের জন্য প্রস্তুত। তবে কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া জেটিঘাটে যাত্রীদের নিরাপদে ওঠানামার জন্য আরও একটি সিঁড়ি স্থাপন করা প্রয়োজন।

 

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান বলেন, সেন্টমার্টিনে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচলের জন্য সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সরকারি দপ্তরের অনুমোদন প্রয়োজন। জাহাজ মালিকেরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে জেলা প্রশাসন অনুমতি দেবে।

 

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, এবারও ট্রাভেল পাস নিয়ে পর্যটকদের সেন্টমার্টিন যেতে হবে। এ জন্য কারিগরি প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। জাহাজসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সহযোগী সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।

 

কক্সবাজার নদীবন্দরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক নয়ন শীল বলেন, নুনিয়ারছড়া জেটিঘাটের অবকাঠামোগত কাজ প্রায় শেষ। কিছু কাজ বাকি রয়েছে, যা এক-দুই দিনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। এরপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু করা সম্ভব হবে।

 

তবে জেটিঘাটের প্রস্তুতি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সেন্টমার্টিন জেটির পন্টুনের বিভিন্ন স্থানে মরিচা ধরে ক্ষয় সৃষ্টি হয়েছে। পর্যটকদের যাতায়াত শুরুর আগে প্রয়োজনীয় সংস্কার না হলে যাত্রী ওঠানামার সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।

 

সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, পর্যটক আসার খবর শুনে দ্বীপের মানুষের মধ্যে আনন্দ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু মৌসুম শুরুর দিনেও জাহাজ না যাওয়ায় সবাই হতাশ। দ্বীপের অধিকাংশ হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁর সংস্কারকাজ প্রায় শেষ। পর্যটকদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে জেটির পন্টুন মেরামতসহ প্রয়োজনীয় কাজ দ্রুত শেষ করা দরকার।

 

এদিকে পর্যটন মৌসুম সামনে রেখে দ্বীপের হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ সংস্কারে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। টেকনাফ উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, পর্যটন মৌসুমের আগে এসব প্রতিষ্ঠান সংস্কারের জন্য তিন শতাধিক আবেদন জমা পড়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে পর্যায়ক্রমে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে দ্বীপে ছোট-বড় মিলিয়ে দুই শতাধিক আবাসিক হোটেল ও পর্যটনসেবা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

 

প্রতিষ্ঠানগুলোতে রং করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সংস্কার ও নতুন সাজসজ্জার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। দীর্ঘদিন পর্যটক চলাচলে সীমাবদ্ধতা এবং রাতযাপনের বিধিনিষেধের কারণে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন ব্যবসায়ীরা। নতুন মৌসুমে সেই ক্ষতি কিছুটা কাটিয়ে ওঠার প্রত্যাশা করছেন তাঁরা।

 

সেন্টমার্টিনের একটি রিসোর্টের মালিক মোহাম্মদ তৈয়ব উল্লাহ বলেন, দীর্ঘদিন পর্যটক না থাকায় ব্যবসা প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করাই কঠিন হয়ে পড়েছিল। এখন পর্যটক আসার খবরে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।

 

স্থানীয় ব্যবসায়ী আলমগীর আকাশ বলেন, সেন্টমার্টিনের ব্যবসা মূলত দুই থেকে তিন মাসের পর্যটন মৌসুমের ওপর নির্ভরশীল। এই সময়ের আয়ের ওপর অনেক পরিবারের সারা বছরের জীবিকা নির্ভর করে। ফলে মৌসুমের শুরুতে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকলে স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

 

সেন্টমার্টিন হোটেল মালিক-ব্যবসায়ী সমিতির নেতা আব্দুর রহমান বলেন, পর্যটকদের আগমন শুরু হলে দ্বীপের ব্যবসা-বাণিজ্যে আবারও গতি ফিরবে। এতে হোটেল-রিসোর্ট ব্যবসার পাশাপাশি পর্যটননির্ভর হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকায় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

 

কক্সবাজার জেলা পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন জানান, প্রায় সাত কোটি টাকা ব্যয়ে সেন্টমার্টিন জেটির উন্নয়নকাজ চলছে। কিছু কাজ এখনো বাকি রয়েছে। তবে জাহাজ চলাচল শুরুর আগেই প্ল্যাটফর্মসহ প্রয়োজনীয় অংশ ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার চেষ্টা চলছে। নির্মাণকাজ নিয়ে ওঠা অভিযোগও খতিয়ে দেখা হবে।

 

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এবারের পর্যটন মৌসুম পরিচালনা করা হবে। হোটেল-রিসোর্ট সংস্কারের আবেদন যাচাই করে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি দ্বীপের পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সংরক্ষণে ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোস্টগার্ড, বিজিবি, নৌবাহিনী ও পুলিশ সতর্ক অবস্থানে থাকবে।

বাংলাদেশ সময়: ১১:০২:২০ ● ২১ বার পঠিত