রবিবার ● ১১ অক্টোবর ২০২৬

দারিদ্র্যকে হারিয়ে স্কুলমুখী কয়রার কন্যাশিশুরা

হোম » খুলনা » দারিদ্র্যকে হারিয়ে স্কুলমুখী কয়রার কন্যাশিশুরা
রবিবার ● ১১ অক্টোবর ২০২৬


 

দারিদ্র্যকে হারিয়ে স্কুলমুখী কয়রার কন্যাশিশুরা

রিয়াছাদ আলী, কয়রা (খুলনা) থেকে

 

‘গ্রামে যাচ্ছ, একজন কাজের মেয়ে নিয়ে এসো। ছোটখাটো একটা মেয়ে হলেও চলবে।’ একসময় শহর থেকে গ্রামে যাওয়ার আগে এমন আবদার শুনতে হতো অনেককে। অভাবের তাড়নায় খুলনার উপকূলীয় উপজেলা কয়রার দরিদ্র পরিবারের অনেক শিশুকে পড়াশোনার বদলে পাঠানো হতো শহরের বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করতে। তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে সেই চিত্র। এখন বই-খাতা হাতে বিদ্যালয়ে ছুটছে শিশুরা। অভাবের সংসারেও মেয়েদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন অভিভাবকেরা।

 

আজ রবিবার বিশ্ব কন্যাশিশু দিবসে কয়রার প্রত্যন্ত গ্রামের এই পরিবর্তন বিশেষভাবে নজর কাড়ছে। কারও গায়ে স্কুলের পোশাক, কারও কাঁধে বইয়ের ব্যাগ। ছোট ছোট চোখে বড় হওয়ার স্বপ্ন। কেউ হতে চায় শিক্ষক, কেউ চিকিৎসক। কেউ আবার সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে পরিবারের দুঃখ ঘোচাতে চায়।

 

কয়রা উপজেলার কয়েকটি প্রত্যন্ত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। সকাল হলেই দল বেঁধে বিদ্যালয়ে যাচ্ছে তারা। শিক্ষক-শিক্ষিকারা ব্যস্ত সময় পার করছেন পাঠদানে। সংসারে অভাব-অনটন থাকলেও সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে অনেক বাবা-মা নিজের কষ্ট আড়াল করে তাদের বিদ্যালয়ে পাঠাচ্ছেন। তাঁদের কাছে এখন সন্তানের শ্রমের চেয়ে শিক্ষা বড় সম্পদ।

 

শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারি উপবৃত্তি, বিনা মূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ, বিদ্যালয়ে খাবারের ব্যবস্থা এবং অভিভাবকদের সচেতনতা শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করতে ভূমিকা রাখছে। আগে পরিবারের বাড়তি আয়ের জন্য অনেক শিশুকে কাজে পাঠানো হলেও বর্তমানে সেই প্রবণতা কমেছে বলে তাঁদের অভিমত।

 

কলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এস এম নুরুল আমিন নাহিন বলেন, ‘এখানকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মাসে ১৫০ টাকা এবং প্রাক্-প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা ৭৫ টাকা উপবৃত্তি পায়। এ ছাড়া তারা প্রতিদিন প্রোটিন বিস্কুট পায়।’

 

৬ নম্বর কয়রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ভবেশ চন্দ্র মণ্ডল বলেন, গ্রামের মানুষ এখন শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতে পারছেন। নিজেরা হয়তো লেখাপড়ার সুযোগ পাননি, কিন্তু সন্তানদের শিক্ষিত করতে চান। সরকার বিনা মূল্যে পড়াশোনার সুযোগ দিচ্ছে। অভিভাবকেরাও সামর্থ্য অনুযায়ী সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাচ্ছেন। তাই গ্রামে গেলেই কাজের লোক পাওয়া যাবে, এমন ধারণা এখন আর বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।

 

৪ নম্বর কয়রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শেফালী খাতুন বলেন, ‘দারিদ্র্যের কারণে একসময় অনেক অভিভাবক ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার পরিবর্তে কাজে পাঠাতেন। এখন তাঁরা বুঝতে পারছেন, শিক্ষা ছাড়া সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা কঠিন। অভাবের মধ্যেও তাঁরা সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর চেষ্টা করছেন।’

 

‘ওরা যেন আমার মতো কষ্ট না করে’

 

৬ নম্বর কয়রা গ্রামের বাসিন্দা আমজাদ হাওলাদারের জীবনে অভাব দীর্ঘদিনের সঙ্গী। সংসারে অনেক সন্তান। একসময় আর্থিক সংকট সামলাতে তাঁর কয়েকজন মেয়েকে শহরে কাজের জন্য পাঠাতে হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তের কথা বলতে গিয়ে এখনো আক্ষেপ করেন তিনি।

 

আমজাদ হাওলাদার বলেন, ‘অনেক ছেলে-মেয়ে হওয়ায় প্রথম দিকে কয়েকজন মেয়েকে শহরে কাজের জন্য পাঠিয়েছিলাম। তারা লেখাপড়া শিখতে পারেনি। এখন আর সেই ভুল করতে চাই না। বাকি ছেলে-মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে। সংসার চালাতে আমার অনেক কষ্ট হয়। তারপরও চাই, ওরা লেখাপড়া শিখে মানুষের মতো মানুষ হোক। আমি যে কষ্ট করেছি, ওরা যেন সেই কষ্টের মুখোমুখি না হয়।’

 

আমজাদের এই আক্ষেপ উপকূলের অসংখ্য দরিদ্র পরিবারের বাস্তবতাকে তুলে ধরে। নিজেরা যে সুযোগ পাননি, সন্তানদের সেই সুযোগ করে দিতে চান তাঁরা।

 

দিনমজুর পরেশ মণ্ডলের জীবনেও অভাব নিত্যসঙ্গী। প্রতিদিনের শ্রমে চলে সংসার। কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে সন্তানদের স্বপ্ন থেমে যাক, তা চান না তিনি।

 

পরেশ মণ্ডল বলেন, ‘দিনমজুরি করে সংসার চালাই। তারপরও আমার এক মেয়ে কলেজের গণ্ডি পেরিয়েছে, আরেকজন স্থানীয় স্কুলে পড়ে। আমি চাই, তারা লেখাপড়া শিখে প্রতিষ্ঠিত হোক। আমাদের মতো কষ্ট করে যেন তাদের জীবন কাটাতে না হয়।’

 

‘মেয়েরাই আমার সঞ্চয়’

 

সবিতা মুন্ডার সংসারেও সচ্ছলতা নেই। অন্যের বাড়িতে দিনমজুরি করে মেয়েদের মুখে খাবার তুলে দিতে হয় তাঁকে। কখনো অভাবের কারণে নিজের প্রয়োজনও মেটাতে পারেন না। তবু মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ হতে দেননি।

 

সবিতা মুন্ডা বলেন, ‘অন্যের বাড়িতে দিনমজুরি করে মেয়েদের খাবার জোগাড় করেছি। সেই খাবার খেয়েই তারা পরীক্ষা দিতে গেছে। অনেক কষ্ট হয়েছে, তবু তাদের অন্যের বাড়িতে কাজে পাঠাইনি। আল্লাহ তাদের মেধা দিয়ে পাঠিয়েছেন। আমার কোনো সঞ্চয় নেই, এই মেয়েরাই আমার সঞ্চয়।’

 

একজন মায়ের এই কথায় ফুটে ওঠে সন্তানের প্রতি ভালোবাসা, আত্মত্যাগ ও ভবিষ্যতের প্রতি গভীর আস্থা। তাঁর কাছে ব্যাংকে জমানো টাকা কিংবা জমিজমা নয়, মেয়েদের শিক্ষিত হয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্নই সবচেয়ে বড় সম্পদ।


বদলাচ্ছে দৃষ্টিভঙ্গি, বাড়ছে শিক্ষার আলো

 

একসময় উপকূলীয় এলাকার দরিদ্র পরিবারের অনেক শিশু অর্থনৈতিক সংকটের কারণে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতো। অল্প বয়সেই তাদের জড়িয়ে পড়তে হতো শ্রমের সঙ্গে। বিশেষ করে মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ করে অন্যের বাড়িতে কাজে পাঠানোর ঘটনাও ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে অভিভাবকদের মধ্যে শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বেড়েছে। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে তাঁরা এখন নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

 

কয়রা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা তপন কুমার কর্মকার বলেন, ‘সব ছেলে-মেয়েকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ কারণে আগের তুলনায় অনেক বেশি শিক্ষার্থী এখন লেখাপড়া করছে। তা ছাড়া শিক্ষকদের ভালো ব্যবহারের কারণে শিশুরা বিদ্যালয়ে যেতে আগ্রহী হচ্ছে।’

 

তবে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং দরিদ্র পরিবারের শিশুদের পড়াশোনার ব্যয় নির্বাহে সহায়তা অব্যাহত রাখাও জরুরি। শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেই শিক্ষার লক্ষ্য পূরণ হয় না। প্রয়োজন নিয়মিত পড়াশোনা ও শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ।

 

কয়রার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে এখন বই-খাতা হাতে বিদ্যালয়ে যাচ্ছে শিশুরা। তাদের সবার জীবন অবশ্য এক রকম নয়। কারও ঘরে খাবারের সংকট, কারও বাবার দিনমজুরির আয়েই চলে সংসার, আবার কারও মাকে নিজের চাওয়া-পাওয়া বিসর্জন দিতে হয় সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে।

 

তারপরও মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে, স্বপ্ন দেখছে। কারণ তাদের বাবা-মা বুঝতে শিখেছেন, দারিদ্র্য জীবনের পথ কঠিন করে তুলতে পারে, কিন্তু শিক্ষা খুলে দিতে পারে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার।

বাংলাদেশ সময়: ১৪:৪৮:১১ ● ১৮ বার পঠিত