শনিবার ● ১০ অক্টোবর ২০২৬
দখল-দূষণে অস্তিত্ব সংকটে গঙ্গামতি সংরক্ষিত বন, ঝুঁকিতে ম্যানগ্রোভ
হোম » লিড নিউজ » দখল-দূষণে অস্তিত্ব সংকটে গঙ্গামতি সংরক্ষিত বন, ঝুঁকিতে ম্যানগ্রোভ
![]()
মেজবাহউদ্দিন মাননু
সাগরের অব্যাহত ভাঙনে পটুয়াখালী কলাপাড়ার গঙ্গামতি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের এক-তৃতীয়াংশ বিলীন হয়ে গেছে। অবশিষ্ট বনাঞ্চলও দখল, খাল-জলাশয়ে বাঁধ নির্মাণ এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়ার কারণে হুমকির মুখে পড়েছে। বনাঞ্চলের আশপাশের ম্যানগ্রোভ গাছপালার মধ্যে দেখা যাচ্ছে আবাসন কোম্পানির সাইনবোর্ড। সরকারি খাল, জলাশয়, বিল ও খাসজমি দখলেরও অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, বনের ভেতরে জোয়ার-ভাটার পানির প্রবাহ বন্ধ করে শাখা খালে বাঁধ দিয়ে মাছ ধরছেন প্রভাবশালীরা। এতে ছইলা ও কেওড়াসহ বিভিন্ন ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছ মরে যাচ্ছে। সহস্রাধিক একর আয়তনের পরিবেশ-সংবেদনশীল এই বনাঞ্চলটি বহুমুখী সংকটে পড়েছে। বন বিভাগের পাশাপাশি পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের নিষ্ক্রিয়তার পাশাপাশি কারও কারও যোগসাজশের অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
২০০৪ সালের এক তথ্যে গঙ্গামতি বন ক্যাম্পের আয়তন ১ হাজার ১২৮ একর উল্লেখ করা হয়েছে। এর অধিকাংশই ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, যা দীর্ঘদিন ধরে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের আঘাত থেকে উপকূলীয় জনপদকে সুরক্ষা দিয়ে আসছে। তবে সাগরের ভাঙনে বনটির আয়তন ক্রমেই কমেছে। অবশিষ্ট অংশও এখন দখল ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বনাঞ্চলের দক্ষিণ অংশ সাগরের অব্যাহত ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। বন বিভাগের কার্যালয়ের পাশের উত্তর অংশের খাল-বিল ও বনভূমিসহ বিস্তীর্ণ প্লাবনভূমিতে দুটি আবাসন কোম্পানির শত শত সাইনবোর্ড রয়েছে। কোম্পানি দুটি হলো সিভাইন ভিলেজ ও বালিয়াড়ী। একই সঙ্গে বনের ভেতরের ছোট ছোট খালে বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহ আটকে মাছ ধরা হচ্ছে। কোথাও কোথাও গাছ মরে যাচ্ছে।
গঙ্গামতি যাওয়ার পথে ধোলাই মার্কেটের আশপাশে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। সেখানকার সেতুর দক্ষিণ পাশে গঙ্গামতি সৈকতে যাওয়ার সড়কের ডান দিকে অসংখ্য ছইলা ও কেওড়াগাছের চারপাশে রিংবাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহ আটকে রাখা হয়েছে। এতে বহু পুরোনো ম্যানগ্রোভ গাছ বিবর্ণ হয়ে পড়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন জানান, গাছগুলো মরে গেলে ওই জমি দখল করা হতে পারে বলে তাঁদের আশঙ্কা।
খালে বাঁধ, মরছে গাছ:
স্থানীয় জেলেদের ভাষ্য, আগে বনের ভেতরের ও আশপাশের ছোট ছোট চ্যানেল দিয়ে ট্রলার নিয়ে তাঁরা সাগরে যাতায়াত করতেন। এখন এসব চ্যানেলের অনেক জায়গায় দখল ও বাঁধ দেওয়ার কারণে স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। তাঁদের অভিযোগ, খালে বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহ বন্ধ করার পর প্রথমে ছইলা ও কেওড়াগাছ মরে যায়। পরে জায়গাগুলো অনাবাদি ভূমিতে পরিণত হলে কোথাও চাষাবাদ করা হয়, কোথাও আবাসন কোম্পানির সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়।
জেলে আবসার আলী অভিযোগ করেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বেড়িবাঁধের মাটি কাটার জন্য খননযন্ত্র ব্যবহার করে বাইরের মাটি তোলার সময় গাছপালাও উপড়ে ফেলা হয়েছিল। এতে দখলদারদের সুবিধা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, ওই এলাকার শত শত গাছের গোড়া এখনো দেখা যায়।
আবসার আলী আরও বলেন, বর্তমানে বনাঞ্চলের ভেতরে সোতা খালে বাঁধ দিয়ে মাছ ধরা হচ্ছে। পানির স্বাভাবিক চলাচল বন্ধ থাকলে পুরোনো ছইলা ও কেওড়াগাছ মরে যায়। এ ঘটনায় স্থানীয় ছাত্র সংগঠনের এক নেতাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তবে অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কেউ কেউ সুযোগ বুঝে গাছ কেটে নিচ্ছেন। অন্যদিকে বনের চারপাশের জমিতে চাষাবাদ করায় প্রাকৃতিকভাবে নতুন গাছের চারা জন্মানোর সুযোগও কমে যাচ্ছে। এভাবে বনাঞ্চলটির প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস বন কর্মকর্তার:
স্থানীয়দের অভিযোগ, বনাঞ্চল দখল, গাছ নিধন ও খালে বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহ বন্ধ করার ঘটনা চলতে থাকলেও তা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এতে উপকূলের প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ গঙ্গামতি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
গঙ্গামতি বন বিভাগের বিট কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, তিনি এক-দুই দিনের মধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
বাংলাদেশ সময়: ২২:৪৭:০৬ ● ১৯ বার পঠিত
