শুক্রবার ● ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিশু জিসানকে ‘রক্তের নাতি’ দাবি করলেন কলাপাড়ার সেই বিএনপি নেতা
হোম » পটুয়াখালী » শিশু জিসানকে ‘রক্তের নাতি’ দাবি করলেন কলাপাড়ার সেই বিএনপি নেতা
![]()
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)
‘আমার রক্তের নাতি, চুরি থেকে ফেরাতে অধিকার নিয়ে শাসন করেছি’- পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ১৩ বছরের শিশু জিসানকে মারধরের ঘটনায় নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এমন দাবি করেছেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হাফিজুর রহমান চুন্নু তালুকদার। তবে রাগের মাথায় শিশুটিকে মারধর করা ভুল হয়েছে বলেও স্বীকার করেছেন তিনি।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে চাকামইয়া ইউনিয়নের উপজেলা বিএনপির সদস্য আব্দুল হাই তালুকদারের বাড়ি থেকে একটি মানিব্যাগ চুরির অভিযোগ ওঠে জিসানের বিরুদ্ধে। পরে আব্দুল হাই জিসানকে তাঁর বাড়িতে ডেকে আনেন। খবর পেয়ে জিসানের মা নাজমা বেগমও সেখানে যান।
মানিব্যাগ চুরির বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে পাশের ঘর থেকে সেখানে যান চুন্নু তালুকদার। পরে পুলিশকে ফোন করা হলেও পুলিশ না আসায় বাঁশের কঞ্চি দিয়ে জিসানকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। এ সময় জিসানের মা গোপনে মোবাইল ফোনে ঘটনাটি ধারণ করেন। পরে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ফরিদা বেগম বলেন, চুন্নু তালুকদার শুকনো বাঁশের কঞ্চি দিয়ে জিসানকে ছয়-সাতটি আঘাত করেন। পরে তাঁর স্ত্রী নাজমুন নাহার কঞ্চিটি টেনে ধরেন। তবে জিসানের বিরুদ্ধে এর আগেও এলাকায় একাধিক চুরির অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ফরিদা বেগমের ভাষ্য, স্থানীয় কয়েকটি দোকান ও এক প্রবাসীর বাড়িতে চুরির ঘটনার পর জিসানকে তাঁর মা মাঝেমধ্যে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতেন। সুযোগ পেলেই সে চুরির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ত বলেও দাবি করেন তিনি।
চুন্নু তালুকদারের স্ত্রী নাজমুন নাহার বলেন, জিসানের পরিবারের পাশে তাঁরা সব সময় ছিলেন। তাঁর ভাষ্য, জিসান তাঁর নারিকেলবাগান থেকে একাধিকবার নারিকেল, কাঁঠাল, শসা এবং পুকুর থেকে মাছ চুরি করেছে। সেদিন তাঁর স্বামী শহর থেকে বাড়িতে এসে হাই তালুকদারের মানিব্যাগ চুরির খবর শুনে সেখানে যান।
নাজমুনের দাবি, প্রথমে জিসানকে পুলিশে দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও পুলিশ তাকে নেয়নি। পরে তাঁর স্বামী বিড়াল-মুরগি তাড়ানোর লাঠি দিয়ে কয়েকটি আঘাত করেন। তিনি আর মারতে দেননি। জিসানের মা নিজেই তাঁকে শাসন করতে বলেছিলেন বলেও দাবি করেন নাজমুন।
তিনি বলেন, ‘জিসান আমার ভাগ্নে বউয়ের ছেলে, নাতি। ঘরের সবাই তাকে এতিম শিশু হিসেবে আদর করে, ভালোবাসে। শুধু চুরি থেকে ফেরাতেই তাকে শাসন করা হয়েছে।’
জিসানের চুরির অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় দোকানি রাসেল বলেন, তাঁর স্ত্রী মারা যাওয়ার দিন জানাজার সময় তাঁর দোকান থেকে বিস্কুটসহ বিভিন্ন জিনিস জিসান চুরি করে নিয়ে গেছে।
স্থানীয় বৃদ্ধ মুজাফফর গাজীর অভিযোগ, সম্প্রতি রাতে তাঁর পকেট থেকে টাকা চুরির চেষ্টা করেছিল জিসান। পরে তিনি তাকে চড় মেরে দূরে সরিয়ে দেন।
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, জিসান কয়েকজন ছেলেকে নিয়ে প্রকাশ্যে দোকানে বসে ধূমপান করে। বিভিন্ন দোকান থেকে সিগারেট ও টাকা চুরির ঘটনাতেও সে একাধিকবার জড়িয়েছে বলে তাঁদের দাবি।
জিসানের বন্ধু কিশোর ইমন বলেন, চুরি না করার জন্য তিনি জিসানকে নিষেধ করেছিলেন। তখন জিসান তাকে বলেছিল, ‘চুরি না করলে খাব কী? টাকা কেউ দেবে না।’
তবে জিসান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলে, ওই রাতে হাই তালুকদারের কাজের লোক আতিকের সঙ্গে বাড়িতে গেলেও সে মানিব্যাগ চুরি করেনি। একটি খালি মানিব্যাগ পেয়েছিল, তাতে কোনো টাকা ছিল না। তাকে অন্যায়ভাবে মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ করে সে।
অভিযুক্ত আব্দুল হাই তালুকদার বলেন, জিসানকে ধরে আনার পর তার মা তাঁদের বাড়ি থেকে মানিব্যাগ ও কাগজপত্র নিয়ে যান। মানিব্যাগে পাঁচ হাজার টাকা থাকলেও তা ফেরত দেওয়া হয়নি বলে তাঁর দাবি। তিনি বলেন, জিসানের বাবা তাঁর ভাগ্নে। তিনি মারা গেছেন। মৃত্যুর আগে জমি বন্ধক রাখার জন্য ৫০ হাজার টাকা দিয়ে গেছেন। ওই জমি জিসানের মা নাজমা চাষ করছেন। জমি নিয়ে কোনো বিরোধের কারণে এ ঘটনা ঘটেনি বলেও দাবি করেন তিনি।
জিসানকে কেন মারধর করা হয়েছে জানতে চাইলে আব্দুল হাই বলেন, ‘নাতির অধিকারে শাসন করেছি, তবে ভুল হয়েছে।’ তবে জিসানের মাকে মারধরের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।
চুন্নু তালুকদার বলেন, ‘আমার নাতিকে আমি চুরি থেকে ফেরাতে অধিকার নিয়ে শাসন করেছি। ও আমার রক্তের নাতি। অধিকাংশ সময় আমার বাড়িতে কাটায়। ওর বিরুদ্ধে এতদিন যতগুলো অভিযোগ এসেছে, আমি ও আমার পরিবার তা সামাল দিয়েছি।’
তিনি দাবি করেন, জিসানের মা নিজেই তাঁকে শাসন করতে বলেছিলেন। তাঁর ভাষ্য, ঘটনার রাতে চাকামইয়া এলাকায় দায়িত্বে থাকা এএসআই মিজানকে ফোন করেছিলেন। কিন্তু শিশুটির বয়স কম হওয়ায় পুলিশ তাকে নেয়নি। তখন তাঁর কী করার ছিল- এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।
তবে এএসআই মিজান বলেন, ওই রাতে চুন্নু তালুকদার তাঁকে ফোন করেছিলেন। তিনি তখন অন্য এলাকায় দায়িত্বে ছিলেন। তাই তাঁকে থানার ডিউটি অফিসারকে জানাতে বলেন।
জিসানের মা নাজমা বেগম বলেন, ছোটখাটো চুরির ঘটনায় অতিষ্ঠ হয়ে মাঝেমধ্যে তিনি ছেলেকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতেন। চুন্নু তালুকদার তাঁদের আত্মীয়- এ কথাও তিনি স্বীকার করেন। তবে ওই রাতে চুরির অভিযোগ তুলে তাঁর ছেলে ও তাঁকে মারধর করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। কৌশলে ভিডিওটি ধারণ করেন বলেও জানান নাজমা।
নাজমার দাবি, ঘটনার পর তাঁদের ভয় দেখানো হচ্ছিল। এ কারণে তিন দিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসতে পারেননি। তিনি ঘটনার বিচার দাবি করার পাশাপাশি জমির কাগজপত্রও ফেরত চান।
এদিকে শিশু জিসান ও তার মা নাজমা বেগম কলাপাড়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
কলাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এ ঘটনা শুনেছি। তবে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বাংলাদেশ সময়: ১৫:৫৪:৪৯ ● ২৭ বার পঠিত
