রবিবার ● ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সম্পত্তি বিক্রি করে তিন যুগ ধরে সড়কের পাশে গাছ লাগাচ্ছেন মসজিদের ইমাম
হোম » ভোলা » সম্পত্তি বিক্রি করে তিন যুগ ধরে সড়কের পাশে গাছ লাগাচ্ছেন মসজিদের ইমাম
![]()
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, ভোলা
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবুজ, নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তুলতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন ভোলার চরফ্যাশনের এক মসজিদের ইমাম। প্রায় তিন যুগ ধরে নিজের পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে গাছের নার্সারি গড়ে তুলেছেন তিনি। সেই নার্সারি থেকে বিভিন্ন সড়কের পাশে লাগিয়েছেন হাজার হাজার তাল, ফলদ, ঔষধি ও অন্যান্য প্রজাতির গাছ।
স্থানীয়রা বলছেন, তাঁর লাগানো সারি সারি তালগাছ বদলে দিয়েছে গ্রামের সড়কের চিত্র। গাছের ছায়া ও সবুজের সমারোহে এখন এসব সড়ক আকর্ষণ করছে স্থানীয়দের পাশাপাশি দূর-দূরান্তের মানুষকেও।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চরফ্যাশন উপজেলার ওমরপুর ইউনিয়নের ওমরপুর গ্রামের বাসিন্দা রেজাউল কিবরিয়া বাবুলের বয়স ৬০ বছর। তিনি স্থানীয় জনতা বাজার-সংলগ্ন কালাপানিয়া বাইতুল মামুর জামে মসজিদের ইমাম। প্রায় দুই যুগ ধরে ওই মসজিদে ইমামতি করছেন তিনি। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে তাঁর সংসার।
রেজাউল কিবরিয়া বাবুলের বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমের শুরু ১৯৯৩-৯৪ সালে। ওই সময় প্রায় আট লাখ টাকায় পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে স্থানীয় ভূইয়ারহাটে একটি নার্সারি স্থাপন করেন তিনি। পরে মাইকিং করে মানুষকে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা বিতরণ করেন এবং বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করতে থাকেন।
দীর্ঘ এই সময়ে তিনি প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার গাছের চারা লাগিয়েছেন বলে জানান। এর মধ্যে তালগাছের বীজ ও চারা রয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার। নানা কারণে সব গাছ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। তবে গাছ লাগানো ও পরিচর্যার কাজ এখনো অব্যাহত রেখেছেন তিনি।
ওমরপুর ইউনিয়নের বাউল সড়কের দুই পাশে সারি সারি তালগাছ লাগিয়ে ইতোমধ্যে সড়কটির চেহারা বদলে দিয়েছেন রেজাউল কিবরিয়া। শুধু এই সড়ক নয়, গ্রামের আরও চারটি সড়কের দুই পাশেও তিনি গাছ লাগাচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তালগাছের পাশাপাশি বিভিন্ন ফলদ ও ঔষধি গাছও লাগিয়েছেন তিনি। দীর্ঘদিনের পরিচর্যায় অনেক গাছ এখন বড় হয়ে সড়কের পাশে সবুজ ছায়া তৈরি করেছে। পথচারী ও কৃষকেরা এসব গাছের ছায়ায় স্বস্তি পাচ্ছেন। স্থানীয়দের মতে, তালগাছ বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতেও ভূমিকা রাখছে।
তালগাছের পাতা ও অন্যান্য অংশ স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার হচ্ছে। আবার কাঁচা ও পাকা তালও স্থানীয় মানুষের বাড়তি আনন্দের কারণ হয়ে উঠেছে। ফলে গাছগুলো শুধু পরিবেশ ও সৌন্দর্যই বাড়াচ্ছে না, মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও ভূমিকা রাখছে।
বাউল সড়কের সৌন্দর্য দেখতে এখন দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ আসেন। কেউ গাছের ছায়ায় বসে সময় কাটান, কেউ স্বজনদের সঙ্গে আড্ডা দেন। অনেকে আবার মনোরম পরিবেশের ছবি ও ভিডিও ধারণ করে নিয়ে যান।
রেজাউল কিবরিয়া বাবুল বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং ইহকাল ও পরকালে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যেই প্রায় তিন যুগ ধরে ইমামতির পাশাপাশি রাস্তার পাশে নানা ধরনের গাছ লাগিয়ে আসছি। শুরুটা করেছি ১৯৯৩-৯৪ সালে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে। তখন প্রায় আট লাখ টাকা দিয়ে ভূইয়ারহাটে গাছের নার্সারি স্থাপন করি।’
তিনি বলেন, ‘মাইকিং করে মানুষকে বিভিন্ন ধরনের গাছের চারা দিয়েছি এবং গাছ লাগাতে উৎসাহিত করেছি। এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার গাছের চারা লাগিয়েছি। এর মধ্যে শুধু তালগাছের বীজ রয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার। নানা কারণে সব গাছ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।’
রেজাউল কিবরিয়া বলেন, ‘ওমরপুর ইউনিয়নের বাউল সড়ক ছাড়াও আরও চারটি সড়কে গাছ লাগাচ্ছি ও পরিচর্যা করছি। বর্তমানে নিজের নার্সারিতে চারা উৎপাদনে সময় দিতে পারি না। তাই ঝালকাঠির স্বরূপকাঠি থেকে বিভিন্ন ধরনের চারা কিনে আনি।’
তালগাছ লাগানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে বজ্রপাত বেড়েছে। তাই বজ্রপাত থেকে মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তালের বীজ ও চারা লাগানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। এ বিষয়ে মাঝেমধ্যে বন বিভাগের পরামর্শও নিই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি সদকায়ে জারিয়া হিসেবে গাছ লাগাই। গাছ লাগানো এবং এর উপকারের কথা আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন। আল্লাহর রাসুলও গাছ লাগাতে উৎসাহিত করেছেন।’
নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানিয়ে রেজাউল কিবরিয়া বলেন, ‘গ্রামের প্রতিটি সড়ক ও আশপাশের এলাকা সবুজে ভরে তুলতে চাই। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর, বাসযোগ্য ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করাই আমার লক্ষ্য। গাছ মানুষের চিত্তবিনোদনের পাশাপাশি জীবনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে।’
তিনি বলেন, ‘একটি গাছ লাগানো মানেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রাকৃতিক ছায়া, সৌন্দর্য ও নিরাপদ অক্সিজেনের একটি স্থায়ী উৎস তৈরি করা। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিন আমার এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি চলবে।’
যুবসমাজের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘চিত্তবিনোদনের জন্য ফল ও ফুলের বাগান গড়ে তোলার মাধ্যমে খারাপ অভ্যাস থেকে ফিরে আসা সম্ভব। নিজেদের জীবনের কথা চিন্তা করে গাছ লাগালে ইহকাল ও পরকাল উভয়ের জন্যই ভালো হবে।’ পাশাপাশি সবাইকে বেশি করে গাছ লাগানো ও পরিচর্যার আহ্বান জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. শাহজাহান, লিটন, আলমগীর ও যুবক তুহিন বলেন, ‘রেজাউল হুজুরের লাগানো তালগাছগুলো এখন ফল দিচ্ছে। বাউল গ্রামের সড়কের দুই পাশে শত শত তালগাছ রয়েছে। এই সড়ক দিয়ে চলাচলের সময় মনে হয় যেন কোনো ফটকের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। গাছগুলোর কারণে সড়কের সৌন্দর্য অনেক বেড়েছে।’
তাঁরা বলেন, ‘আমরাও বিকেল ও সন্ধ্যার পর এখানে সময় কাটাই। দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ আসে। হুজুরের গাছ লাগানোর উদ্যোগ দেখে আমরাও নিজেদের জমিতে বেশি করে গাছ লাগানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুমানা আফরোজ গাছপ্রেমিক রেজাউল কিবরিয়ার ব্যক্তিগত উদ্যোগে চলা এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, ‘খোঁজ নিয়ে তাঁর পাশে দাঁড়াব।’
প্রায় তিন যুগ ধরে নীরবে চলা রেজাউল কিবরিয়ার এই উদ্যোগকে পরিবেশ রক্ষা, প্রকৃতিপ্রেম ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে সবুজায়নের অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
বাংলাদেশ সময়: ১৬:৩৩:৫৯ ● ২৩ বার পঠিত
