শনিবার ● ২৭ জুন ২০২৬
জীবন রক্ষাকারী ওষুধ উৎপাদন থেকে রোগীর হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত মান রক্ষার চ্যালেঞ্জ
হোম » মতামত » জীবন রক্ষাকারী ওষুধ উৎপাদন থেকে রোগীর হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত মান রক্ষার চ্যালেঞ্জ

আসাদুজ্জামান দিদার
মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য ব্যবহৃত ওষুধের কার্যকারিতা ও গুণগত মান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবতা হলো, উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহন, সংরক্ষণ ও বিক্রির প্রতিটি ধাপেই নানা ধরনের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা ওষুধের মানকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। বিশেষ করে উষ্ণ আবহাওয়ার দেশে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা জীবন রক্ষাকারী বহু ওষুধের কার্যকারিতা হ্রাসের অন্যতম কারণ হয়ে উঠতে পারে।
দেশের বহু গ্রামীণ ফার্মেসি এখনও একচালা টিনের ঘর বা অপর্যাপ্ত অবকাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে তাপরোধক ব্যবস্থা কিংবা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের সুবিধা নেই। অনেক ক্ষেত্রে তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় থার্মোমিটারও দেখা যায় না। উদ্বেগের বিষয় হলো, একই ধরনের সমস্যা অনেক শহুরে ফার্মেসিতেও বিদ্যমান।
গ্রীষ্মকালে টিনের ছাউনির নিচে তাপমাত্রা সহজেই ৩৭ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তারও বেশি হয়ে যায়। অথচ অধিকাংশ ওষুধ ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশে অথবা সর্বোচ্চ ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সংরক্ষণের নির্দেশনা নিয়ে বাজারজাত করা হয়। দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত তাপমাত্রায় থাকলে ওষুধের রাসায়নিক গঠন পরিবর্তিত হতে পারে, কার্যকারিতা কমে যেতে পারে, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ওষুধ সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, রোগী কিংবা বিক্রেতা অনেক সময় বুঝতেই পারেন না যে ওষুধটি তার কার্যক্ষমতার একটি অংশ হারিয়ে ফেলেছে। ফলে রোগী প্রত্যাশিত চিকিৎসা-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন।
ওষুধ কারখানা থেকে ডিস্ট্রিবিউটর এবং সেখান থেকে ফার্মেসিতে পৌঁছানোর দীর্ঘ যাত্রাপথেও রয়েছে বড় ধরনের ঝুঁকি। তীব্র গরমের মধ্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাধারণ কাভার্ড ভ্যান বা ট্রাকে ওষুধ পরিবহন করা হয়। এসব যানবাহনের ভেতরে তাপমাত্রা অনেক সময় ৪৫ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এই অবস্থায় কয়েক ঘণ্টা বা পুরো দিন ধরে ওষুধ পরিবহন করা হলে তাপ-সংবেদনশীল ওষুধের মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। অ্যান্টিবায়োটিক, সাপোজিটরি এবং বিভিন্ন হরমোনজাতীয় ওষুধের ক্ষেত্রে নির্ধারিত তাপমাত্রা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদন পর্যায়ে মান ঠিক থাকলেও পরিবহন ও সংরক্ষণ পর্যায়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা সেই মানকে শেষ পর্যন্ত রোগীর কাছে পৌঁছাতে দেয় না। অর্থাৎ পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার একটি দুর্বল অংশই রোগীর চিকিৎসা-ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে।
বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুনাম অর্জন করেছে। দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিশ্বের বহু দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে। তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা এখনও রয়ে গেছে। কাঁচামালের মান, উৎপাদন পরিবেশ, যন্ত্রপাতির ক্যালিব্রেশন, ব্যাচভিত্তিক পরীক্ষা এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থার সামান্য ত্রুটিও ওষুধের গুণগত মানকে প্রভাবিত করতে পারে।
সময় সময় নিম্নমানের কাঁচামাল ব্যবহার, নথিপত্রে অসঙ্গতি কিংবা মান নিয়ন্ত্রণে গাফিলতির অভিযোগও সামনে আসে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি প্রতিরোধে নিয়মিত ও আকস্মিক পরিদর্শনের বিকল্প নেই।
দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক ক্ষেত্রে পরিদর্শন কার্যক্রম কাগজপত্র যাচাইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। বাস্তবে তাপমাত্রা কত ছিল, ওষুধ কী অবস্থায় সংরক্ষিত হয়েছে বা পরিবহনের সময় নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে কি না- এসব বিষয় নির্ভরযোগ্যভাবে যাচাই করা হয় না।
বর্তমানে ঔষধ প্রশাসনের তদারকি কার্যক্রম চালু থাকলেও দেশের হাজার হাজার ফার্মেসি, গুদাম ও পরিবহন ব্যবস্থাকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এখনও পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক জেলায় মাত্র একজন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেন। কোথাও কোথাও একজন কর্মকর্তাকে একাধিক জেলার দায়িত্বও সামলাতে হয়। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, মাঠপর্যায়ে আকস্মিক পরিদর্শনের জন্য প্রয়োজনীয় যানবাহন সুবিধাও অনেক ক্ষেত্রে নেই।
আবার আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রায়ই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতির প্রয়োজন হয়। সরকার চাইলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ঔষধ প্রশাসনের কর্মকর্তাদেরও সীমিত ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রদান করার বিষয় বিবেচনা করতে পারে। এতে মনিটরিং ও আইন প্রয়োগ কার্যক্রম আরও গতিশীল ও কার্যকর হতে পারে।
কার্যকর মনিটরিংয়ের জন্য করণীয়-
১. কোল্ড-চেইন ও তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ বাধ্যতামূলক করা
তাপ-সংবেদনশীল ওষুধ পরিবহন ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ডিজিটাল তাপমাত্রা রেকর্ডার বাধ্যতামূলক করতে হবে। নির্ধারিত সীমার বাইরে তাপমাত্রা চলে গেলে তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
২. পরিবহনে বিশেষায়িত যানবাহন ব্যবহার
ওষুধ পরিবহনের জন্য তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত বা ইনসুলেটেড যানবাহনের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। শুধু কাভার্ড ভ্যান ব্যবহার করে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না।
৩. ফার্মেসি লাইসেন্স নবায়নে মানদণ্ড কঠোর করা
গ্রামাঞ্চলসহ সব ফার্মেসিতে ন্যূনতম সংরক্ষণ মানদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে। সরেজমিন পরিদর্শন ছাড়া লাইসেন্স নবায়ন না করার নীতি বিবেচনা করা যেতে পারে।
৪. আকস্মিক পরিদর্শন বৃদ্ধি
নিয়মিত পরিদর্শনের পাশাপাশি আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করতে হবে। শুধু নথিপত্র নয়, বাস্তব সংরক্ষণ পরিস্থিতিও যাচাই করতে হবে।
৫. উৎপাদন পর্যায়ে স্বাধীন অডিট
ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত স্বাধীন মান নিরীক্ষা (অডিট) চালু করা প্রয়োজন, যাতে সম্ভাব্য অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত করা যায়।
৬. ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু
কারখানা থেকে ফার্মেসি পর্যন্ত ওষুধের পুরো যাত্রাপথ ডিজিটালভাবে ট্র্যাক করার ব্যবস্থা চালু করা হলে কোথায় তাপমাত্রা লঙ্ঘিত হয়েছে বা কোথায় সংরক্ষণে ত্রুটি ঘটেছে তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ফিজিশিয়ান স্যাম্পলের অপব্যবহার। বহু ওষুধ কোম্পানি সম্পূর্ণ স্ট্রিপ বা পাতা কেটে এক বা দুটি ট্যাবলেট চিকিৎসক ও কেমিস্টদের মধ্যে নমুনা হিসেবে বিতরণ করে। আইন অনুযায়ী এসব নমুনা বিক্রি নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে সেগুলোর একটি অংশ বাজারে বিক্রি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সরকার চাইলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বর্তমান পদ্ধতিতে ফিজিশিয়ান স্যাম্পল বিতরণ বন্ধ অথবা আরও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত করতে পারে। এতে ওষুধ বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে।
পরিশেষে বলা যায়, ওষুধ শুধু একটি পণ্য নয়; এটি মানুষের জীবন ও মৃত্যুর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি সংবেদনশীল উপাদান। উৎপাদন পর্যায়ে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে মানসম্পন্ন ওষুধ তৈরি করলেও যদি পরিবহন ও সংরক্ষণের দুর্বলতায় সেই মান নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে পুরো ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। তাই ওষুধের গুণগত মান নিশ্চিত করতে উৎপাদন, পরিবহন, সংরক্ষণ ও বিক্রির প্রতিটি স্তরে কঠোর নজরদারি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জবাবদিহিমূলক মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। মানুষের জীবন রক্ষার প্রশ্নে কোনো ধরনের আপসের সুযোগ নেই।
লেখক: গ্রাম ডাক্তার কল্যাণ সমিতি, মহিপুর (পটুয়াখালী) থানা শাখার আহ্বায়ক।
বাংলাদেশ সময়: ২২:২০:১৫ ● ২৪ বার পঠিত
