বুধবার ● ৬ মে ২০২৬
নাব্যতা সংকটে মাদার ভেসেল অনুপস্থিত রাবনাবাদ চ্যানেলে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার ড্রেজিংয়ে প্রশ্ন
হোম » পায়রা বন্দর » নাব্যতা সংকটে মাদার ভেসেল অনুপস্থিত রাবনাবাদ চ্যানেলে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার ড্রেজিংয়ে প্রশ্ন

মেজবাহউদ্দিন মাননু, সাগরকন্যা প্রতিবেদন
দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন উদ্যোগ হিসেবে পায়রা বন্দর নির্মাণ ও এর সঙ্গে রাবনাবাদ চ্যানেলের ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পকে ঘিরে যে অগ্রগতির স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তা এখন নাব্যতা সংকট ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
২০১৬ সাল থেকে শুরু হওয়া পায়রা বন্দর প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৭ হাজার একর কৃষিজমি অধিগ্রহণের পর প্রশাসনিক অবকাঠামো নির্মাণ এবং বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজ এগিয়ে নেয়া হয়। তবে এখনো বন্দরের প্রথম টার্মিনালগামী সড়ক ও সেতুর কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি।
সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগ ছিল প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে রাবনাবাদ চ্যানেলের ক্যাপিটাল ড্রেজিং। বেলজিয়ামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জান-ডি-নুলের মাধ্যমে ৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই চ্যানেলের নাব্যতা ১০.৫ মিটার পর্যন্ত উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। ২০২১ সালে শুরু হয়ে ২০২৩ সালে কাজ শেষ ঘোষণা করা হয়।
কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে চ্যানেলে দ্রুত পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়ায় প্রকল্পটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমানে অবস্থানভেদে নাব্যতা ৫.৫ থেকে ৬.৫ মিটারের মধ্যে ওঠানামা করছে বলে বিভিন্ন সূত্র ও স্থানীয়দের দাবি।
ফলে বড় আকারের মাদার ভেসেল চলাচল প্রায় বন্ধ রয়েছে। একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে পায়রা বন্দরে নিয়মিতভাবে কোনো পণ্যবাহী বা কয়লাবাহী মাদার ভেসেল ভিড়তে পারেনি। সর্বশেষ কয়লাবাহী একটি জাহাজ চট্টগ্রামে নোঙর করে লাইটারিংয়ের মাধ্যমে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা পৌঁছানো হয়।
স্থানীয় জেলে ও নৌপরিচালকদের ভাষ্যমতে, বর্ষা মৌসুমে কিছু সময় নাব্যতা বাড়লেও বর্তমানে চ্যানেলে বড় জাহাজ চলাচলের মতো গভীরতা নেই। জোয়ারের ওপর নির্ভর করেই সীমিত আকারে নৌযান চলাচল করছে।
এদিকে পায়রা বন্দরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, চ্যানেলের গড় নাব্যতা বর্তমানে প্রায় ৫.৪ থেকে ৫.৯ মিটারের মধ্যে ওঠানামা করছে।
স্থানীয়দের একাংশ ও সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, বিপুল ব্যয়ে করা এই ক্যাপিটাল ড্রেজিং দীর্ঘস্থায়ী সুফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের অভিযোগ, পরিকল্পনায় ত্রুটি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে চ্যানেলটি দ্রুতই আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে।
তবে বন্দর কর্তৃপক্ষের সূত্র বলছে, রাবনাবাদ চ্যানেলটি প্রাকৃতিকভাবেই উচ্চ পলি প্রবণ। বছরে প্রায় ৪০ কোটি ঘনমিটার পলি প্রবাহের কারণে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিং ছাড়া নাব্যতা ধরে রাখা কঠিন।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ১২ লাখ ঘনমিটার রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্যতা ৯ মিটার পর্যন্ত উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাবনাবাদ চ্যানেলের ভৌগোলিক অবস্থান ও পলি প্রবাহের কারণে এটি একটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথ, যেখানে এককালীন ড্রেজিংয়ের চেয়ে ধারাবাহিক রক্ষণাবেক্ষণ অপরিহার্য।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় জাহাজ না আসায় পণ্য পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বন্দরের পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার ব্যাহত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। পাশাপাশি স্থানীয় জেলে ও নদীকেন্দ্রিক জীবিকাও প্রভাবিত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সব মিলিয়ে, বিপুল ব্যয়ের রাবনাবাদ চ্যানেল ড্রেজিং প্রকল্প এখন নাব্যতা সংকট, রক্ষণাবেক্ষণ চ্যালেঞ্জ ও কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
বাংলাদেশ সময়: ২২:৫৮:১৭ ● ৩৭ বার পঠিত
