মঙ্গলবার ● ২৪ মার্চ ২০২৬
প্রান্তিক জীবনের দীর্ঘশ্বাস জুতা মেরামতকারী দলিত সম্প্রদায়ের বেঁচে থাকার সংগ্রাম
হোম পেজ » মুক্তমত » প্রান্তিক জীবনের দীর্ঘশ্বাস জুতা মেরামতকারী দলিত সম্প্রদায়ের বেঁচে থাকার সংগ্রাম

মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ
বাংলাদেশের সমাজ কাঠামোর গভীরে এমন কিছু জনগোষ্ঠী রয়েছে, যারা যুগের পর যুগ এই দেশের মাটিতে বসবাস করলেও এখনো মূলধারার নাগরিক জীবনের পূর্ণ স্বীকৃতি পায়নি। তাদের মধ্যে অন্যতম জুতা মেরামতকারী দলিত বা মুচি সম্প্রদায়। একসময় সমাজের অপরিহার্য সেবাদানকারী হিসেবে পরিচিত এই জনগোষ্ঠী আজ সময়ের পরিবর্তন, অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক বৈষম্য এবং পেশাগত অনিশ্চয়তার চাপে ধীরে ধীরে প্রান্তিকতার আরও গভীরে ঠেলে পড়েছে।
একসময় নির্দিষ্ট পল্লী বা ‘মুচিবাড়ি’ ছিল তাদের স্থায়ী আবাসস্থল। পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া সেই বসতভিটা ছিল তাদের পরিচয়, নিরাপত্তা এবং সামাজিক বন্ধনের কেন্দ্র। কিন্তু নানা সামাজিক চাপ, অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং প্রভাবশালী মহলের চাপে অনেক পরিবার বাধ্য হয়েছে নিজেদের বাড়িঘর বিক্রি করতে। ফলে তারা আজ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসবাস করছে সরকারি বেরিবাঁধ, সড়কের পাশ কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ খাসজমিতে। স্থায়ী ঠিকানা হারিয়ে তাদের জীবন যেন অনিশ্চয়তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক দীর্ঘ অপেক্ষা।
এই সম্প্রদায়ের মানুষ জন্মগত ও পেশাগত পরিচয়ের কারণে দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক বৈষম্যের শিকার। সমাজের একটি অংশ এখনো তাদের ‘নিচু জাত’ হিসেবে দেখে, যা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মানবিক মূল্যবোধের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হোটেল-রেস্তোরাঁ কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে তারা প্রায়ই অপমানজনক আচরণের মুখোমুখি হয়। বিভিন্ন গবেষণায়ও এ ধরনের বৈষম্যের চিত্র উঠে এসেছে। এই অদৃশ্য দেয়াল তাদের আত্মসম্মানবোধকে প্রতিনিয়ত আঘাত করে।
বাসস্থান সংকট তাদের জীবনের অন্যতম বড় বাস্তবতা। অধিকাংশ পরিবার ঘিঞ্জি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করে, যেখানে সুপেয় পানি, স্যানিটেশন কিংবা পয়ঃনিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। ভূমিহীনতার কারণে উচ্ছেদের ভয় তাদের প্রতিদিনের সঙ্গী। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ এলেই তাদের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে দুর্যোগের সময় তারা চরম দুর্বিষহ অবস্থায় দিন কাটায়, অথচ রাষ্ট্রীয়ভাবে স্থায়ী আবাসনের কোনো সুসংগঠিত উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই সম্প্রদায় গভীর সংকটে রয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে জুতা মেরামত ছিল তাদের প্রধান পেশা ও আয়ের উৎস। কিন্তু আধুনিক যুগে প্লাস্টিক ও সিন্থেটিক জুতোর ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় এই পেশার চাহিদা কমে গেছে। ফলে সারাদিন পরিশ্রম করেও তাদের আয় দিয়ে পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকেই পেশা পরিবর্তনের চেষ্টা করলেও দক্ষতা ও সুযোগের অভাবে সফল হতে পারছেন না।
শিক্ষাক্ষেত্রে অগ্রগতির স্বপ্নও প্রায়ই থেমে যায় মাঝপথে। দলিত শিশুদের অনেকেই বিদ্যালয়ে বৈষম্য, উপহাস কিংবা বুলিংয়ের শিকার হয়। এতে তাদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে পড়ে। ঝরে পড়ার হারও বাড়ে। দরিদ্রতার কারণে পড়াশোনার খরচ চালানো সম্ভব না হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী অল্প বয়সেই শ্রমজীবনে যুক্ত হতে বাধ্য হয়। কিছু তরুণ-তরুণী কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা অর্জন করলেও চাকরির ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ তাদের হতাশ করে তোলে। শিক্ষিত হওয়ার পরও কর্মসংস্থানের সুযোগ না পাওয়া তাদের মধ্যে গভীর বঞ্চনার অনুভূতি তৈরি করছে।
স্বাস্থ্য ও পুষ্টির ক্ষেত্রেও তারা পিছিয়ে রয়েছে। চিকিৎসাসেবায় বৈষম্যমূলক আচরণ, সচেতনতার অভাব এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পান না। অপুষ্টি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাপন তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা এই সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী।
এই সম্প্রদায়ের নারীদের জীবন সংগ্রাম আরও কঠিন। লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, বাল্যবিবাহ এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা তাদের প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে রাখে। অনেক নারী পরিবার চালাতে শ্রমে যুক্ত হলেও সামাজিক মর্যাদা বা নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। শিশুদের ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তায় আবদ্ধ থাকে, কারণ দারিদ্র্য ও বৈষম্যের চক্র তাদের শৈশব থেকেই সীমাবদ্ধ করে দেয়।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ক্ষেত্রেও অনেক পরিবার পিছিয়ে। বিভিন্ন সরকারি সহায়তা কর্মসূচি থাকলেও তথ্যের অভাব, সামাজিক প্রান্তিকতা কিংবা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তারা সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে রাষ্ট্রের নাগরিক হয়েও তারা প্রায়ই রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বলয়ের বাইরে থেকে যায়।
এই সম্প্রদায়ের মানুষেরা বলছেন, তাদের আয়ের প্রধান উৎস জুতা মেরামত। কিন্তু দিনশেষে সেই আয় দিয়ে সংসার চালানো সম্ভব হয় না। সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন অর্থনৈতিক বাস্তবতার কাছে হার মানে। তারা দাবি করছেন- যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরির সুযোগ, নিরাপদ বাসস্থান এবং বৈষম্যহীন সামাজিক আচরণ নিশ্চিত করা হোক। কারণ তারা এই দেশেরই নাগরিক; তাদেরও রয়েছে সমান মর্যাদায় বাঁচার অধিকার।
সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই জনগোষ্ঠীকে করুণা নয়, প্রয়োজন সম্মান ও সমান সুযোগ। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক সচেতনতা এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। স্থানীয় প্রশাসন, নাগরিক সমাজ এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো সম্মিলিতভাবে কাজ করলে তাদের জীবনমান উন্নয়নের পথ তৈরি হতে পারে।
একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে উন্নত হয়, যখন তার সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা মানুষগুলোর জীবনমান উন্নত হয়। জুতা মেরামতকারী দলিত সম্প্রদায়ের গল্প শুধু দারিদ্র্যের গল্প নয়; এটি সংগ্রাম, অবহেলা এবং স্বীকৃতির অপেক্ষায় থাকা মানুষের গল্প। তাদের চোখে এখনো স্বপ্ন আছে- সন্তানরা শিক্ষিত হবে, সমাজে সম্মান পাবে, নিরাপদ ঘরে বসবাস করবে।
এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি পুরো সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। বৈষম্যের দেয়াল ভেঙে সহমর্মিতা ও মানবিকতার আলো ছড়িয়ে দিতে পারলেই একদিন এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দীর্ঘশ্বাস বদলে যাবে আশার হাসিতে। তখন তারা আর প্রান্তিক থাকবে না; সমান অধিকার নিয়ে যুক্ত হবে বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের মূল স্রোতে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সাধারণ সম্পাদক, মঠবাড়িয়া প্রেসক্লাব, পিরোজপুর।
বাংলাদেশ সময়: ১০:২৬:৫৯ ● ৩১ বার পঠিত
