শুক্রবার ● ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
দরকার মিঠা পানির নিশ্চয়তা কলাপাড়ায় সবজির গ্রাম কুমিরমারা: সুলতান গাজীর হাত ধরে সবুজ বিপ্লব
হোম পেজ » বিশেষ প্রতিবেদন » দরকার মিঠা পানির নিশ্চয়তা কলাপাড়ায় সবজির গ্রাম কুমিরমারা: সুলতান গাজীর হাত ধরে সবুজ বিপ্লব

মেজবাহউদ্দিন মাননু
কলাপাড়ার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের কুমিরমারা গ্রাম। আর এই গ্রামের নাম উচ্চারণ করলেই ভেসে ওঠে এক মানুষের ছবি- সুলতান গাজী। মধ্যবয়স পেরিয়ে গেলেও এখনো অদম্য তিনি। কিশোর বয়স থেকে শুরু করে যৌবনের দীর্ঘ সময়জুড়ে কৃষিকে ঘিরেই তার লড়াই। বাবার কাছ থেকে শেখা জীবনসংগ্রামের শিক্ষা বুকে ধারণ করে অনাবাদী, বছরের ছয়-সাত মাস বিবর্ণ পড়ে থাকা জমিকে রূপ দিয়েছেন সবুজের সমারোহে।
প্রয়াত আঃ আজিজ গাজীর ছেলে সুলতান গাজী এই প্রতিবেদককে জানান, জন্মের পর থেকেই কৃষিকাজের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা। একসময় অভাব-অনটনে দিন কাটতো। কাজের জন্য অন্যের দুয়ারে ধর্ণা দিতে হতো, অনেক সময় না খেয়ে থাকতে হয়েছে। ধান-চাউল তো দূরের কথা, পোশাকেরও অভাব ছিল। সেই কৃষিকাজই আজ তাদের ভাগ্য বদলে দিয়েছে।
প্রায় ২০-২৫ বছর আগে কুমিরমারা গ্রামের অর্ধেক মানুষ দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন। অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। কিন্তু সুলতান গাজীর উদ্যোগ ও নেতৃত্বে ধানের পাশাপাশি শুরু হয় সবজির চাষ। মাসুম চৌধুরী, সেলিম চৌধুরী, আবুল কালাম, ফোরকান হাওলাদার, মন্নান হাওলাদারসহ গ্রামের অনেকে একযোগে এগিয়ে আসেন। ধীরে ধীরে বদলে যায় গ্রামের চিত্র।
এখন বছরের ১২ মাসই ধান ও নানা ধরনের সবজির আবাদ হয় কুমিরমারায়। করলা, ঝিঙে, বরবটি, ঢেঁড়স, মরিচ, কুমড়া, বেগুনসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন হচ্ছে নিয়মিত। এক চিলতে জমিও অনাবাদী নেই। সেকেলে পদ্ধতির পাশাপাশি আধুনিক কৃষি প্রযুক্তিও ব্যবহার করছেন কৃষকরা। কেউ সেচ দিচ্ছেন, কেউ শীতকালীন সবজি তুলছেন, কেউ আবার গ্রীষ্মকালীন ফসলের জন্য জমি প্রস্তুত করছেন। অনেকেই কাঠ বা স্টিলের স্ট্রাকচারের ওপর মরিচ চাষ করছেন, যা বেশ লাভজনক বলে জানিয়েছেন তারা।
কৃষক সাইফুল ও ফয়সাল জানান, বর্ষাকালে কুমিরমারা গ্রাম থেকে প্রতিদিন অন্তত ১০ মেট্রিক টন বিভিন্ন ধরনের সবজি বাজারজাত করা হয়। বছরে অধিকাংশ পরিবার ২ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করছেন। এক সময়ের ধূসর ও অনাবাদী জনপদ আজ পরিচিত ‘সবজির গ্রাম’ হিসেবে।
গ্রামের প্রায় ৯০ শতাংশ পরিবার ১২ মাস সবজি চাষে সম্পৃক্ত। কৃষকরা জানান, তারা কোনো আর্থিক সহায়তা চান না। তবে পাখিমারা খালের মিঠা পানি সংরক্ষণ, খাল পুনর্খনন এবং যুগীর স্লুইস খালের ব্যবস্থাপনা প্রকৃত কৃষকদের হাতে ন্যস্ত করার দাবি জানিয়েছেন। গত বছর মিঠা পানির সংকটে বোরো আবাদে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়েছে বলে জানান তারা। এছাড়া কুমিরমারা গ্রামের মাঝখানের সড়ক পাকা করা এবং পাখিমারা খালের ওপর দ্রুত একটি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন চাষিরা।
কলাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আরাফাত হোসেন বলেন, কুমিরমারা গ্রামসহ নীলগঞ্জ এলাকার কৃষকদের প্রতি কৃষি বিভাগের বিশেষ নজর রয়েছে। তাদের সমস্যা সমাধানে আন্তরিকভাবে কাজ করা হচ্ছে।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাউছার হামিদ জানান, কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য বিপণনের সুবিধার্থে একটি শেড নির্মাণ করা হয়েছে। পাখিমারা খালের ওপর গার্ডার ব্রিজ নির্মাণের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। উপজেলা প্রশাসন কৃষকদের সমস্যা সমাধানে সচেষ্ট রয়েছে।
একসময় অভাবের প্রতীক ছিল যে গ্রাম, আজ সেটিই কৃষি উৎপাদনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সুলতান গাজী ও তার সহযোদ্ধাদের হাত ধরে কুমিরমারা এখন সত্যিই সবুজের আরেক নাম।
বাংলাদেশ সময়: ১১:৪২:১০ ● ৩৩ বার পঠিত
