বৃহস্পতিবার ● ১৫ জানুয়ারী ২০২৬

ভাষা আন্দোলন থেকে সংসদ মহিউদ্দিন আহমেদ: এক আপসহীন জাতীয় নেতার জন্মশতবর্ষোত্তর স্মরণ

হোম পেজ » মুক্তমত » ভাষা আন্দোলন থেকে সংসদ মহিউদ্দিন আহমেদ: এক আপসহীন জাতীয় নেতার জন্মশতবর্ষোত্তর স্মরণ
বৃহস্পতিবার ● ১৫ জানুয়ারী ২০২৬


 

প্রয়াত মহিউদ্দিন আহমেদ। ছবি- সংগৃহীত

মো. রোকনুজ্জামান শরীফ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যেসব নেতার জীবন সংগ্রাম, ত্যাগ ও আদর্শে উজ্জ্বল- মহিউদ্দিন আহমেদ তাঁদের অন্যতম। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং স্বাধীন বাংলাদেশে সংসদীয় রাজনীতিতে তাঁর সক্রিয় ও বলিষ্ঠ ভূমিকা তাঁকে একটি অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছে। আজ ১৫ জানুয়ারি ২০২৫ খ্রিঃ তাঁর ১০১তম জন্মবার্ষিকীতে আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি এই ভাষাসৈনিক, পার্লামেন্টারিয়ান ও জাতীয় নেতাকে।

 

জন্ম ও শৈশব:

মহিউদ্দিন আহমেদ জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি, বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার গুলিসাখালী গ্রামে। তাঁর পিতা আজাহার উদ্দিন আহমেদ ছিলেন তৎকালীন একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সাবেক এমএলসি (১৯২০-১৯২৬)। রাজনৈতিকভাবে সচেতন পরিবেশেই তাঁর শৈশব ও কৈশোর গড়ে ওঠে, যা পরবর্তী জীবনে তাঁকে সংগ্রামী রাজনীতির পথে অগ্রসর হতে অনুপ্রাণিত করে।

 

রাজনৈতিক জীবন ও সংগ্রাম:

ছাত্রজীবন থেকেই মহিউদ্দিন আহমেদ ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হন। পরবর্তীতে মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তিনি ভাষা আন্দোলনের একজন সক্রিয় সংগঠক হিসেবে ভূমিকা পালন করেন। পাকিস্তান আমলের শুরুতে মুসলিম লীগের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও গণমানুষের রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন।

১৯৫৪ সালে ঐতিহাসিক যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে তিনি মঠবাড়িয়া থেকে এমএলএ নির্বাচিত হন। এটি ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এরপর পূর্ব পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশে সংঘটিত প্রায় সব গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংগ্রামে তিনি প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেন।

 

সংসদীয় রাজনীতি:

স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি বিলুপ্ত বাকেরগঞ্জ-১৮ আসন থেকে ১৯৭৩ সালের প্রথম, বাকেরগঞ্জ-১৭ আসন থেকে ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় এবং পিরোজপুর-৩ আসন থেকে ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ও নেতৃত্বের প্রমাণ দেন।

 

সংসদে তিনি ছিলেন স্পষ্টভাষী, নীতিনিষ্ঠ ও জনগণের স্বার্থে আপসহীন এক প্রতিনিধি। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবেও তিনি দলীয় নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

 

ব্যক্তিজীবন ও মৃত্যু:

ব্যক্তিজীবনে মহিউদ্দিন আহমেদ ছিলেন সাদাসিধে ও জনঘনিষ্ঠ। তাঁর ডাকনাম ছিল ‘পান্না মিয়া’। তিনি বিবাহিত ছিলেন রেবেকা মহিউদ্দিনের সঙ্গে। তাঁদের সংসারে দুই ছেলে ও এক মেয়ে।

১৯৯৭ সালের ১২ এপ্রিল তিনি ৭২ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। ঢাকার মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

 

রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি:

ভাষা আন্দোলন ও সমাজসেবায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার ২০০০ সালে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করে- যা তাঁর জীবনের সংগ্রাম ও অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।

 

শেষ কথা:

মহিউদ্দিন আহমেদ ছিলেন এমন এক রাজনীতিবিদ, যিনি ক্ষমতার জন্য নয়- নীতি, আদর্শ ও জনগণের অধিকারের জন্য রাজনীতি করেছেন। আজ তাঁর ১০১তম জন্মবার্ষিকীতে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত তাঁর সততা, ত্যাগ ও দেশপ্রেমের আদর্শকে ধারণ করে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা।

 

মহিউদ্দিন আহমেদ স্মরণে-

এক সংগ্রামী জীবনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

 

গ্রন্থনা:

সাধারণ সম্পাদক

মঠবাড়িয়া প্রেসক্লাব

পিরোজপুর

বাংলাদেশ সময়: ১২:২০:০৬ ● ৫০ বার পঠিত