শনিবার ● ২৪ অক্টোবর ২০২৬
কুয়াকাটায় ৮৫ একর চরে নতুন বনায়ন, ফিরছে সবুজ দেয়াল
হোম » লিড নিউজ » কুয়াকাটায় ৮৫ একর চরে নতুন বনায়ন, ফিরছে সবুজ দেয়াল
![]()
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)
সাগরের উত্তাল ঢেউয়ে কুয়াকাটার বিস্তীর্ণ উপকূলীয় বনাঞ্চল বিলীন হলেও নতুন করে সবুজ দেয়াল গড়ে উঠছে গঙ্গামতি ও কাউয়ার চরে। গত আট বছরে অন্তত ৮৫ একর চরভূমিতে ঝাউ, ছইলা ও কেওড়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানো হয়েছে। পাশাপাশি গঙ্গামতির তিনটি স্থানে প্রায় ১০০ একর জমিতে বনায়ন করেছে বন বিভাগ। নতুন গাছ বেড়ে ওঠায় ধূ-ধূ বালুচরে ফিরছে সবুজের আচ্ছাদন, আশার আলো দেখছেন উপকূলের মানুষ।
তবে একদিকে নতুন বনায়ন হলেও অন্যদিকে সাগরের ভাঙন ও জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় বনাঞ্চল হারিয়ে যাচ্ছে। গত দুই দশকে কুয়াকাটা সৈকতের প্রায় ৩৪ কিলোমিটার এলাকার দুই-তৃতীয়াংশের সবুজ দেয়াল বিলীন হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে কুয়াকাটা, খাজুরা, ধুলাসার ও গঙ্গামতির সংরক্ষিত বনাঞ্চল হুমকির মুখে পড়েছে।
বন বিভাগের মহিপুর রেঞ্জের গঙ্গামতি বিট কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, আট বছর আগে কাউয়ার চরে প্রায় ৩২ একর জমিতে নতুন ঝাউবাগান করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন নদীতীরে প্রায় ৫০ একর জমিতে ছইলা ও কেওড়াসহ ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। এসব গাছ এখন বেড়ে উঠেছে।
তিনি জানান, সাত থেকে আট বছর আগে গঙ্গামতির তিনটি স্থানে প্রায় ১০০ একর জমিতে বনায়ন করা হয়। সেখানকার গাছও বড় হয়েছে। তবে ঘূর্ণিঝড় আম্পানে অনেক গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় নতুন করে চারা লাগানো হয়েছে।
এ ছাড়া কলাপাড়া ক্যাম্পের উদ্যোগে আট বছর আগে আন্ধারমানিক ও সোনাতলা নদীর তীরে জেগে ওঠা চরে পাঁচ সারিতে ছইলা, কেওড়া ও গোলগাছের চারা রোপণ করা হয়। এ কার্যক্রমে প্রায় ৮৩ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চারা লাগানো হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড়ের সময় উপকূলীয় বনাঞ্চল জলোচ্ছ্বাসের প্রাথমিক ধাক্কা মোকাবিলায় সহায়তা করে। ম্যানগ্রোভ ও ননম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছের সারি প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় হিসেবে কাজ করে। তাই বনাঞ্চল হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নতুন চরভূমিতে বনায়ন উপকূলের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিভিন্ন তথ্যসূত্রে জানা যায়, ১৯৫৭ সাল থেকে কুয়াকাটা উপকূলে বনায়ন কার্যক্রম শুরু হয়। ষাটের দশকের শুরু থেকে মাঝামাঝি সময়ে কৃষিকাজ, জনপদ ও জীবন-সম্পদকে লোনা পানির কবল থেকে রক্ষায় নদী ও সাগরের তীর ঘেঁষে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। বাঁধের ভেতরের খালের সংযোগস্থলে স্লুইসগেট নির্মাণের পাশাপাশি বাঁধের বাইরে গোলগাছসহ বিভিন্ন ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছ লাগানো হয়।
২০০৫ সাল পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, কলাপাড়ায় ১ হাজার ৯২৯ একর জমিতে ম্যানগ্রোভ এবং ৩১২ একর জমিতে ননম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছ লাগানো হয়। এ ছাড়া ৪৬ একর জমিতে সেগুন, ২১০ একরে নারিকেল, ২ হাজার ৭৯৪ একরে গোলপাতা, ৬২৭ একরে কড়ই, ৩২০ একরে গেওয়া, ৪০ একরে হোগলাপাতা এবং ১০৫ একরে সুন্দরী, পশুর ও কেওড়া প্রজাতির গাছের বাগান ছিল। পরবর্তী সময়ে সংযোগ সড়কের পাশে ও স্ট্রিপ বাঁধে অন্তত ১১৫ কিলোমিটার এলাকায় বাগান করা হয়। এরপর শত শত কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সামাজিক বনায়ন কার্যক্রমও পরিচালিত হয়েছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কলাপাড়া উপজেলায় বন বিভাগের মোট জমির পরিমাণ ১০ হাজার ১৭৭ দশমিক ১১ একর। এর মধ্যে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ৩ হাজার ৯৭৮ দশমিক ৩৩ একর। কুয়াকাটা বিটে ১৯৩ একর, কুয়াকাটা ক্যাম্পের অধীনে ১ হাজার ৮১৮ দশমিক ৯৩ একর, গঙ্গামতি ক্যাম্পের অধীনে ১ হাজার ১২৮ একর, খাজুরা ক্যাম্পের অধীনে ৩৪৬ দশমিক ৮৭ একর এবং ধুলাসার ক্যাম্পের অধীনে ৪৬১ দশমিক ৫৩ একর সংরক্ষিত বনাঞ্চল রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ফুলবুনিয়া, বালিয়াতলী ও লালুয়ায় বাগান কেন্দ্র গড়ে বনায়ন করা হয়েছে।
তবে নদীতীরে জেগে ওঠা চরভূমি বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর না করায় অনেক এলাকায় বনায়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক শ্রেণির বনদস্যু এসব বাগানের হাজার হাজার গাছ কেটে ফেলেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মধুখালী শাখা নদীর দুই তীরের প্রাচীন ম্যানগ্রোভ বনও কেটে উজাড় করা হয়েছে।
চরভূমি বন বিভাগের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া ভূমি প্রশাসনের উদাসীনতায় বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। উল্টো এসব জমি চাষযোগ্য খাসজমি হিসেবে বন্দোবস্ত দেওয়ায় বনভূমি বেদখল হয়েছে। এতে একসময়ের সবুজ বনাঞ্চলের অনেক স্থান বিরানভূমিতে পরিণত হয়েছে।
তবে কাউয়ার চর, গঙ্গামতির চর ও আন্ধারমানিক নদীতীরে নতুন করে ম্যানগ্রোভ প্রজাতির বনায়ন উপকূলবাসীর মনে আশার সঞ্চার করেছে। সাগরের ভাঙন ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকির মধ্যেও নতুন গাছের বিস্তারকে উপকূলের প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় পুনর্গঠনের সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন তাঁরা।
বাংলাদেশ সময়: ১৯:৩০:৪৫ ● ২১ বার পঠিত
