
অপূর্ব লাল সরকার, আগৈলঝাড়া (বরিশাল) থেকে
বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার পূর্ব বাগধা দাসপাড়া গ্রামে একই মাঠের দুই প্রান্তে মসজিদ ও মন্দির। এক পাশে জামাতে নামাজ আদায় করছেন মুসল্লিরা, অন্য পাশে চলছে শারদীয় দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা। মাঝের মাঠে হিন্দু-মুসলিম শিশু-কিশোরদের একসঙ্গে খেলাধুলা। দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার মধ্য দিয়ে ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রেখেছেন গ্রামের বাসিন্দারা।
সোমবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, বাগধা দাসপাড়া এসইএসডিপি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠের পশ্চিম প্রান্তে বাগধা ইউনিয়ন পরিষদসংলগ্ন বাইতুল আমান জামে মসজিদ। মাঠের পূর্ব প্রান্তে রয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সার্বজনীন দুর্গামন্দির। আসরের আজানের আগে মন্দিরের মাইক ও বাদ্যযন্ত্র বন্ধ রাখা হয়। আজান ও জামাতে নামাজ শেষে আবার শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় মন্দিরের মাইক ও বাদ্যযন্ত্র বন্ধ রাখার নির্দেশনা টাঙিয়েছে পূজা উদ্যাপন কমিটি। অন্যদিকে, দুর্গাপূজার আয়োজনেও সহযোগিতা করেন মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। দুই সম্প্রদায়ের বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি বসবাস করছেন।
মন্দিরে পূজা, ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি ও আরতির পাশাপাশি চলছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে নারী-পুরুষ ও শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ অংশ নিচ্ছেন। দূরদূরান্ত থেকেও পরিবার নিয়ে আসছেন দর্শনার্থীরা। মাঠে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলায়ও নেই ধর্মীয় বিভাজন।
বাগধা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম বাবুল ভাট্টি বলেন, একই মাঠের দুই প্রান্তে মসজিদ ও মন্দির রয়েছে। এ ছাড়া সেখানে বিদ্যালয়, ইউনিয়ন পরিষদ ও একটি নিবন্ধিত ক্লাবও আছে। তাঁর ২৪ বছরের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনকালে এসব স্থাপনার অধিকাংশ নির্মিত হয়েছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রেখে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করা এলাকার মানুষের জন্য গর্বের বিষয়।
মসজিদের মুসল্লি মো. খলিল মিয়া বলেন, ‘আমরা হিন্দু-মুসলিম সবাই পাশাপাশি বাড়িতে মিলেমিশে বসবাস করি। একই মাঠে মসজিদ ও মন্দির থাকলেও ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনে কখনো কোনো সমস্যা হয়নি।’
পূর্ব বাগধা দাসপাড়া সার্বজনীন দুর্গামন্দির কমিটির যুগ্ম সম্পাদক উজ্জ্বল দাস জানান, ১৯৯০ সালে মাঠের পূর্ব পাশে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরে ২০০৭ সালে মাঠের পশ্চিম প্রান্তে নির্মিত হয় জামে মসজিদ। এরপর থেকে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ নিজ নিজ ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করে আসছেন।
মসজিদ, মন্দির, বিদ্যালয় ও ইউনিয়ন পরিষদের ভূমিদাতা বিমল দাস বলেন, তাঁর বাবা নীলকান্ত দাস, কাকা রাখাল চন্দ্র দাস ও ভাই কালিপদ দাস এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য জমি দান করেছেন। তাঁদের পরিবার বাপ-দাদার আমল থেকেই হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি ও সুসম্পর্ক বজায় রেখে বসবাস করছে।
স্থানীয় মুসল্লি মো. আলী আজগর হাওলাদার বলেন, ‘নামাজের সময় মন্দিরের মাইক ও বাদ্যযন্ত্র বন্ধ রাখা হয়। একইভাবে পূজা-অর্চনার সময় আমরাও সহযোগিতা করি। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতাই আমাদের সহাবস্থানের মূল ভিত্তি।’
ধর্মীয় আচার পালনে পারস্পরিক সম্মান, সহনশীলতা ও সহযোগিতার মধ্য দিয়ে পূর্ব বাগধা দাসপাড়া গ্রামে গড়ে উঠেছে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির পরিবেশ। একই মাঠে মসজিদ-মন্দিরের অবস্থান আর দুই সম্প্রদায়ের মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতা হয়ে উঠেছে সেই সহাবস্থানের দৃশ্যমান দৃষ্টান্ত।