
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, গলাচিপা (পটুয়াখালী)
পটুয়াখালীর গলাচিপায় মা ইলিশ সংরক্ষণে সরকারি নিষেধাজ্ঞা চললেও বন্ধ হয়নি ইলিশ শিকার ও কেনাবেচা। স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী চক্রের সহযোগিতায় উপজেলার বিভিন্ন নদ-নদী ও উপকূলীয় এলাকায় অবৈধভাবে ইলিশ আহরণ ও বিক্রি চলছে। প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান সত্ত্বেও দালাল ও নির্ধারিত ক্রেতাদের মাধ্যমে অন্তত ১০ থেকে ১৫টি গোপন পয়েন্টে ইলিশ বেচাকেনা হচ্ছে।
পরিচয় নিশ্চিত করে চলছে ইলিশ বিক্রি
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিষেধাজ্ঞার সময় অপরিচিত ক্রেতার কাছে সরাসরি মাছ বিক্রি করছেন না সংশ্লিষ্ট জেলেরা। অনাকাঙ্ক্ষিত ঝামেলা এড়াতে ক্রেতার পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর মাছ সরবরাহের চুক্তি করা হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট স্থানে টাকা জমা রেখে মাছ সংগ্রহের ব্যবস্থাও চালু রয়েছে।
চরবিশ্বাস ইউনিয়নের জেলে মো. মন্নানের সঙ্গে ক্রেতা সেজে যোগাযোগ করা হলে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর দুপুর ২টার দিকে চরআগস্তি বাজারে অপেক্ষা করতে বলা হয়। সেখানে ইলিশ সরবরাহের আশ্বাস দেন তিনি।
একই এলাকার জেলে মো. মিজান জানান, এক কেজি ওজনের ইলিশ ১ হাজার ৫০০ টাকা, এক কেজির কম ওজনের ইলিশ ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা এবং ছোট ইলিশ ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে সরাসরি মাছ না দিয়ে চরকাজল এলাকার একটি ওয়ার্কশপে টাকা রেখে এলে চাহিদা অনুযায়ী ইলিশ পৌঁছে দেওয়ার কথা জানান তিনি।
অভিযানে বাধা দেওয়ার অভিযোগ
মা ইলিশ রক্ষায় প্রশাসনের অভিযানেও বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। চরবিশ্বাস ইউনিয়নের দুর্গম নমোর স্লুইস এলাকায় অভিযান চালানোর সময় স্থানীয় একদল প্রভাবশালী জেলে প্রশাসনের ট্রলার ধাওয়া করেন এবং হামলার চেষ্টা চালান বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
নদ-নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে শিকারের অভিযোগ
স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, পৌর এলাকা-সংলগ্ন রামনাবাদ নদী, চিকনিকান্দির দয়াময়ী মন্দির ও বদনাতলীর তেঁতুলিয়া পয়েন্ট এবং পানপট্টি লঞ্চঘাটের আগুনমুখা মোহনায় রাতের আঁধারে ইলিশ শিকার চলছে। প্রশাসনের টহল ট্রলার দেখলে জেলেরা পাশের বন বিভাগের সংরক্ষিত বনে আশ্রয় নিয়ে আত্মগোপন করেন বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া চরকাজল ইউনিয়নের লঞ্চঘাট, চরশিবা, চরবিশ্বাসের চরআগস্তি, জিমতলা, নমোর স্লুইসগেট, আমড়াগাছিয়া ও চরবাংলা; রতনদী তালতলীর বন্যাতলী ও পাতাবুনিয়া স্লুইসগেট এবং সদর ইউনিয়নের চরকারফারমা, বোয়ালিয়া ও পক্ষিয়া স্লুইসগেটসহ বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে ইলিশ আহরণ ও কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে।
ভয়ে মুখ খুলছেন না স্থানীয়রা
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, প্রভাবশালী চক্রটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস তাঁদের নেই। মাছ ধরতে যাওয়া কিংবা বিক্রির স্থানে নৌকায় মুঠোফোন বহন না করার ব্যাপারেও চক্রটির কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে বলে তাঁরা অভিযোগ করেন।
১১ দিনে ২৮৫ কেজি ইলিশ জব্দ
গলাচিপা উপজেলা মৎস্য কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১১ দিনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ২৮৫ কেজি ইলিশ ও বিপুল পরিমাণ জাল জব্দ করা হয়েছে। এ সময় ১২টি মামলায় ছয় জেলেকে সাজা দেওয়ার পাশাপাশি ২০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
গলাচিপা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ভিক্টর বাইন বলেন, ‘মৎস্য বিভাগসহ বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয়ে দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকায় প্রতিদিন একাধিক যৌথ অভিযান চালানো হচ্ছে।’
নমোর স্লুইস এলাকায় অভিযানে বাধা দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অঞ্চলটি অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় সংঘবদ্ধ একটি চক্র ডাক-চিৎকার করে হামলার চেষ্টা করেছিল। তবে তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।’