রবিবার ● ১১ অক্টোবর ২০২৬
পবিপ্রবিতে শিক্ষক নিয়োগে তিন কর্মকর্তা, যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন
হোম » শিক্ষা » পবিপ্রবিতে শিক্ষক নিয়োগে তিন কর্মকর্তা, যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন
![]()
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, পটুয়াখালী
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা নেই, এমন তিন কর্মকর্তাকে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পবিপ্রবি) সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগের জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে। তাঁদের মধ্যে দুজনের নিয়োগের বিষয়সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেই। অন্যজন বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান রেজিস্ট্রারের স্ত্রী। তাঁদের নিয়োগের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অভিন্ন নীতিমালা অনুসরণ না করার অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, নিজস্ব নিয়োগবিধি অনুযায়ী পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের সহকারী অধ্যাপক পদে আবেদনের সুযোগ রয়েছে। তবে ইউজিসির চেয়ারম্যান বলেছেন, কর্মকর্তা থেকে সহকারী অধ্যাপক হওয়ার সুযোগ নেই। পবিপ্রবিতে এ ধরনের নিয়োগের বিষয়টি কমিশনের নজরে এলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১২ অক্টোবর উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ এবং ২৫ অক্টোবর কৃষিতত্ত্ব ও মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগে সহকারী অধ্যাপক নিয়োগের বাছাই বোর্ড বসার কথা।
২০২১ সালে প্রণীত ইউজিসির অভিন্ন নীতিমালায় সহকারী অধ্যাপক পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উভয় পরীক্ষায় ন্যূনতম সিজিপিএ ৩ দশমিক ৫ রাখার শর্ত রয়েছে। পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের অন্তত এক বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এমফিল ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের জন্য শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার শর্ত যথাক্রমে দুই ও তিন বছর। পাশাপাশি স্বীকৃত জার্নালে অন্তত তিনটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হতে হবে, যার অন্তত একটির প্রথম লেখক হতে হবে প্রার্থীকে।
কিন্তু পবিপ্রবির গত ২২ জুন ও ১৬ আগস্ট প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ন্যূনতম সিজিপিএ ৩ চাওয়া হয়েছে। পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা ছাড়াই আবেদনের সুযোগ রাখা হয়েছে। বিকল্প যোগ্যতা হিসেবে স্নাতকোত্তর বা এমফিল ডিগ্রির সঙ্গে দুই বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা ও দুটি গবেষণাপত্র প্রকাশের শর্তও রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বিধিতে পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের জন্য শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক নয়। গবেষণাপত্রে প্রথম লেখক হওয়ার শর্তও নেই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, প্রশাসনের পছন্দের কর্মকর্তাদের শিক্ষক পদে নিয়োগের সুযোগ তৈরি করতেই যোগ্যতার শর্ত শিথিল করা হয়েছে।
কৃষিতত্ত্বে প্রার্থী জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক
কৃষিতত্ত্ব বিভাগে সহকারী অধ্যাপক পদে প্রার্থী হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ ও প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক রাহাত মাহ্মুদ। তাঁর কৃষিতত্ত্ব বিষয়ে পিএইচডি, অ্যাগ্রিকালচারাল-বোটানি বিষয়ে স্নাতকোত্তর এবং কৃষিতে স্নাতক ডিগ্রি রয়েছে। স্নাতকে তাঁর সিজিপিএ ৩ দশমিক ২৭ এবং স্নাতকোত্তরে ৩ দশমিক ৭১। অর্থাৎ স্নাতকের ফল ইউজিসির অভিন্ন নীতিমালায় নির্ধারিত ন্যূনতম মানের চেয়ে কম। তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতাও নেই। নিয়োগের বিষয় কৃষিতত্ত্ব হলেও এ বিষয়ে তাঁর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেই।
২০০৭ সালে সহকারী খামার তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন রাহাত। পরে পদোন্নতি পেয়ে তিনি উপ-খামার তত্ত্বাবধায়ক হন।
গত ৯ অক্টোবর গণমাধ্যমকে রাহাত মাহ্মুদ বলেন, তিনি নিয়োগ বোর্ডে অংশ নেওয়ার কার্ড পেয়েছেন। তাঁর অনার্স, মাস্টার্স ও পিএইচডি ডিগ্রি রয়েছে উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, পবিপ্রবিতে পিএইচডি থাকলেই সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগ পাওয়া যায়।
কৃষিতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান গোপাল সাহা বলেন, মৌখিক পরীক্ষার জন্য কারা যোগ্য হয়েছেন, সে তথ্য তিনি তখনো পাননি। তবে ইউজিসির বিধান মেনে চলা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
উদ্ভিদ রোগতত্ত্বে প্রার্থী রেজিস্ট্রারের স্ত্রী
উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগে প্রার্থী হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার জিনাত নাসরিন সুলতানা। তাঁর উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিষয়ে পিএইচডি ও স্নাতকোত্তর এবং কৃষিতে স্নাতক ডিগ্রি রয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা নেই তাঁর।
২০০৭ সালে সেকশন অফিসার হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন জিনাত নাসরিন। তিনি বর্তমান রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মো. জামাল হোসেনের স্ত্রী।
জিনাত নাসরিন বলেন, তিনি নিয়োগ বোর্ডে অংশ নেওয়ার কার্ড পেয়েছেন। কর্তৃপক্ষ তাঁকে যোগ্য মনে করলে নিয়োগ দেবে, না মনে করলে দেবে না। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব কর্তৃপক্ষের।
উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান মো. রুবেল মাহমুদ মনে করেন, পিএইচডি ডিগ্রি থাকলে যেকোনো প্রার্থীকে সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে।
মৃত্তিকাবিজ্ঞানে প্রার্থী আরেক কর্মকর্তা
মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগে সহকারী অধ্যাপক পদে প্রার্থী হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার ও অফিস অব দ্য ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) হাচিব মোহাম্মদ তুষার। তাঁর মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিষয়ে পিএইচডি, কীটতত্ত্ব বিষয়ে স্নাতকোত্তর এবং কৃষিতে স্নাতক ডিগ্রি রয়েছে। তবে নিয়োগের বিষয় মৃত্তিকাবিজ্ঞানে তাঁর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেই। দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতাও নেই তাঁর।
২০০৭ সালে সেকশন অফিসার হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন হাচিব মোহাম্মদ তুষার। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনে বিভিন্ন ডিগ্রি অর্জন করে সহকারী অধ্যাপক হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন। তবে এখনো নিয়োগ বোর্ডে অংশ নেওয়ার কার্ড পাননি।
মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মো. কামাল হোসেন বলেন, ‘নিয়োগের আইন তো আর আমরা জানি না। নিয়োগের তো সার্কুলারেই দেওয়া থাকে। কী দেওয়া আছে, আমি তা ভালো বলতে পারব না।’
নিজস্ব বিধির কথা বলছে প্রশাসন
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মো. জামাল হোসেন গত ৮ অক্টোবর গণমাধ্যমকে বলেন, পবিপ্রবির নিজস্ব নিয়োগবিধি অনুযায়ী পিএইচডি ও প্রকাশনা থাকলে সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগে বাধা নেই। তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসির অভিন্ন নীতিমালা অনুসরণ করা হয় না। প্রকাশনা না থাকলেও পিএইচডি ডিগ্রিকে প্রকাশনা হিসেবে ধরা হয় বলে দাবি করেন তিনি।
নিজের স্ত্রীর প্রার্থিতার বিষয়ে জামাল হোসেন বলেন, যোগ্যতা থাকলে যে কেউ আবেদন করতে পারেন। তাঁর স্ত্রীর ফলাফল ভালো বলেও দাবি করেন তিনি। নিয়োগে কোনো অনিয়ম বা বিধির ব্যত্যয় হয়েছে কি না, তা যাচাই করে দেখতে বলেন তিনি। নিয়োগ বোর্ডের সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত নন বলেও জানান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ওই কর্মকর্তারা তাঁদের বর্তমান পদ থেকে শিক্ষক পদে আবেদন করেননি; পিএইচডি ডিগ্রিধারী হিসেবে সহকারী অধ্যাপক পদের বিজ্ঞপ্তিতে আবেদন করেছেন। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত যোগ্যতা পূরণ করায় তাঁরা কার্ড পেয়েছেন। কর্মকর্তা থেকে শিক্ষক হওয়ার বিষয়টি এখানে বিবেচ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, ইউজিসির অভিন্ন নীতিমালার পরিবর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত দেখতে হবে।
উপাচার্য অধ্যাপক হেমায়েত জাহান বলেন, ‘আমাদের তো নিয়োগ নীতিমালা, নিয়োগবিধি আলাদা। ইউজিসি ইউনিফাইড রুলস করেছে। সেটা কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাডপ্ট করেছে, কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় এখনো করেনি। আশা করছি, হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আমাদের ইউনিফাইড রুল অ্যাডপ্ট করতে হবে এবং করব।’
ইউজিসি কী বলছে
কর্মকর্তা থেকে সহকারী অধ্যাপক হওয়ার সুযোগ আছে কি না, জানতে চাইলে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ গত ৮ অক্টোবর গণমাধ্যমকে বলেন, এ ধরনের কোনো সুযোগ নেই। পবিপ্রবিতে সহকারী অধ্যাপক নিয়োগের বিষয়টি কমিশনের নজরে এলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সব বিশ্ববিদ্যালয়কে কমিশনের নীতিমালা অনুসরণ করে শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। এর ব্যত্যয়ের প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইউজিসির সাবেক সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ইমেরিটাস অধ্যাপক আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগের জন্য শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। এভাবে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ইউজিসির শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। উপাচার্যরা অখুশি হবেন বা দলীয়ভাবে হেনস্তার চেষ্টা করবেন, এমন আশঙ্কায় ইউজিসি পদক্ষেপ না নিলে কমিশনের বিরুদ্ধেও জনমত গড়ে তোলা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশ সময়: ১৫:৪০:১০ ● ৩৪ বার পঠিত
