শুক্রবার ● ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পরিকল্পিত কুয়াকাটার জন্য সরকারি খাসজমি কতটা সুরক্ষিত?

হোম » কুয়াকাটা » পরিকল্পিত কুয়াকাটার জন্য সরকারি খাসজমি কতটা সুরক্ষিত?
শুক্রবার ● ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬


 

পরিকল্পিত কুয়াকাটার জন্য সরকারি খাসজমি কতটা সুরক্ষিত?

মেজবাহউদ্দিন মাননু

 

সমুদ্রসৈকত, ম্যানগ্রোভ বন, খাল, জলাভূমি ও পর্যটন অবকাঠামোকে ঘিরে কুয়াকাটাকে পরিকল্পিত পর্যটননগর হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ চলছে। কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই সরকারি খাসজমি, জলাভূমি, খাল, প্লাবনভূমি ও পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল ভূমি সঠিকভাবে চিহ্নিত ও সুরক্ষিত করা না গেলে ভবিষ্যতের উন্নয়নই জমির সংকটে আটকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

 

কারণ একটি পরিকল্পিত নগর গড়ে তুলতে শুধু হোটেল-রিসোর্টের জায়গা হলেই হয় না। প্রয়োজন সড়ক, ড্রেনেজ, জলাধার, পার্ক, উন্মুক্ত স্থান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পর্যটন সুবিধা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার অবকাঠামোর জন্য পর্যাপ্ত জমি। তাই কুয়াকাটার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় এখনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে- প্রয়োজনীয় সরকারি জমি আদৌ সুরক্ষিত আছে কি না।

 

কুয়াকাটাকে ঘিরে পায়রা-কুয়াকাটা সমন্বিত পরিকল্পনায় ভূমি ব্যবহারের বিভিন্ন শ্রেণি নির্ধারণের কাঠামো রয়েছে। পর্যটন, আবাসিক এলাকা, পরিবহন, জলাশয়, উপকূলীয় এলাকা এবং পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল ভূমিকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা করা হয়েছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের কুয়াকাটা কোথায় স্থাপনা হবে, তার পাশাপাশি কোথায় স্থাপনা হবে না- সেটিও পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

 

খাসজমির হিসাবই বড় চ্যালেঞ্জ

 

মাঠপর্যায়ে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বড় চ্যালেঞ্জ সরকারি খাসজমির সঠিক হিসাব ও দখল পরিস্থিতি। ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রতিবেদনে কুয়াকাটার সরকারি খাসজমি নিয়ে গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে।

 

কলাপাড়া ভূমি কার্যালয়ের সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাউয়ারচর মৌজায় ৩০০ একরের বেশি সরকারি খাসজমি রয়েছে। ওই প্রতিবেদনে সরকারি খাসজমিতে বিভিন্ন আবাসন প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড স্থাপনের কথাও উঠে এসেছে।

 

অন্য একটি প্রতিবেদনে কুয়াকাটায় প্রায় ২ হাজার একর খাসজমি ব্যক্তির নামে রেকর্ড হওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে। ভূমি জরিপের বিভিন্ন ধাপ, পুরোনো বন্দোবস্ত, কথিত ‘লুজ খতিয়ান’, ভূমি উন্নয়ন করের রশিদ এবং দখল-বিক্রির মাধ্যমে সরকারি জমি ব্যক্তি মালিকানায় চলে যাওয়ার অভিযোগও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

তবে এসব বিষয় অভিযোগের পর্যায়ে থাকায় সংশ্লিষ্ট নথি, রেকর্ড ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যাচাই করে চূড়ান্ত ভূমি-রেকর্ড নির্ধারণ করা জরুরি।

 

পরিকল্পনার জমি হারালে সংকুচিত হবে উন্নয়ন

 

এই বাস্তবতা কুয়াকাটার ভূমি ব্যবস্থাপনা ও ল্যান্ড জোনিংয়ের জন্য বড় সতর্কবার্তা। যে জমি ভবিষ্যতে সরকারি সড়ক, পর্যটন পার্ক, ড্রেনেজ, জলাধার কিংবা উন্মুক্ত স্থান হিসেবে প্রয়োজন হতে পারে, সেটি যদি এরই মধ্যে দখল বা বিতর্কিত মালিকানায় চলে যায়, তাহলে পরিকল্পনা কাগজেই আটকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

 

সরকারি নিয়মেও পৌর এলাকার খাসজমির তালিকা তৈরি করে জমির ব্যবহারযোগ্যতা অনুযায়ী আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প বা অন্য কাজে ব্যবহারের সম্ভাবনা উল্লেখ করার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে সরকারি ও জনকল্যাণমূলক কাজে প্রয়োজন হতে পারে- এমন জমি চিহ্নিত করার বিষয়ও রয়েছে।

 

পটুয়াখালী জেলা প্রশাসনের দায়িত্বের মধ্যেও খাস ও অন্যান্য সরকারি সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা, সরকারি স্বার্থসংশ্লিষ্ট ভূমি থেকে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ এবং খাসজমি পুনরুদ্ধারের বিষয়টি রয়েছে। উপজেলা ভূমি প্রশাসনের দায়িত্বের মধ্যেও খাসজমি চিহ্নিতকরণ, উদ্ধার, সীমানা নির্ধারণ ও খাস তালিকা হালনাগাদের বিষয় উল্লেখ আছে।

 

খাল-জলাশয় হারালে বাড়বে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি

 

খাসজমি হারানোর দ্বিতীয় বড় প্রভাব পড়তে পারে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায়।

 

কুয়াকাটা নিম্নাঞ্চল ও জোয়ার-ভাটাপ্রবণ হওয়ায় খাল, জলাশয় ও প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ দখল বা ভরাট হয়ে গেলে ভবিষ্যৎ নগরায়ণের সঙ্গে জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও বাড়বে। পরিকল্পিত সড়ক ও স্থাপনা নির্মাণ করা হলেও পানি প্রবাহের প্রাকৃতিক পথ যদি না থাকে, তাহলে উন্নয়ন মানুষের দুর্ভোগ কমানোর বদলে নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।

 

অন্যদিকে প্রয়োজনীয় সরকারি জমি এখনই সুরক্ষিত করা না হলে ভবিষ্যতে সরকারকে নিজের প্রয়োজনের জমিই কিনতে হতে পারে। আজ যে জমি সরকারি মালিকানায় রয়েছে, তা দখল, অবৈধ বন্দোবস্ত বা বিতর্কিত রেকর্ডের কারণে বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে পরে রাস্তা, পার্ক, ড্রেনেজ কিংবা পর্যটন সুবিধা নির্মাণে অধিগ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে। এতে প্রকল্প ব্যয় বাড়বে। একই সঙ্গে মামলা-মোকদ্দমার কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়ার ঝুঁকিও থাকবে।

 

পরিবেশ রক্ষাও ভূমি পরিকল্পনার অংশ

 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কুয়াকাটার পর্যটন অর্থনীতি তার প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। গঙ্গামতির ম্যানগ্রোভ বন, সৈকতসংলগ্ন বাফার এলাকা, খাল, জলাভূমি ও উন্মুক্ত ভূমি কমে গেলে পর্যটননগরীর পরিবেশগত ভারসাম্যও নষ্ট হতে পারে।

 

তাই এখনই কুয়াকাটার সরকারি খাসজমি, বনভূমি, জলাভূমি ও অন্যান্য পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল ভূমিকে একই মানচিত্রে এনে সীমানা নির্ধারণ করা জরুরি।

 

শুধু ল্যান্ড জোনিং করলেই হবে না। প্রয়োজন ‘জোনিং ম্যাপের সঙ্গে খাসজমির দাগ-খতিয়ান মিলিয়ে মাঠে সীমানা দৃশ্যমান করা’। কোন জমি সরকারের, কোনটি ব্যক্তিমালিকানাধীন, কোনটি বনভূমি, কোনটি জলাশয় এবং কোন এলাকায় ভবিষ্যতে নির্মাণ করা যাবে না- এসব তথ্য একীভূত করা গেলে দখল ও মালিকানা নিয়ে বিরোধও কমানো সম্ভব।

 

কুয়াকাটার সামনে তাই এখন মৌলিক প্রশ্ন- কোথায় উন্নয়ন হবে, তার আগে কোথায় সরকারি জমি আছে, তা কি নিশ্চিত করা হয়েছে?

 

খাসজমি দ্রুত চিহ্নিত করা, রেকর্ড যাচাই, সীমানা নির্ধারণ এবং অবৈধ দখলমুক্ত করা না গেলে ভবিষ্যতের পরিকল্পিত কুয়াকাটা প্রয়োজনীয় জমির অভাবে সংকুচিত হতে পারে। তখন পরিকল্পনা থাকবে, বিনিয়োগও থাকবে; কিন্তু সড়ক, ড্রেনেজ, পার্ক, পর্যটন সুবিধা ও পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

 

কুয়াকাটার ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় জমি তাই আজই সুরক্ষিত করা জরুরি।

বাংলাদেশ সময়: ১৯:৫৯:৫৭ ● ২২ বার পঠিত