বৃহস্পতিবার ● ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আলোকিত ভোরের পথে: সন্তানকে আদর্শ ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ার উপায়
হোম » মতামত » আলোকিত ভোরের পথে: সন্তানকে আদর্শ ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ার উপায়
![]()
এম জাকির হোসাইন
একজন সন্তান বংশের শেষ পরিচয়সূচক পতাকাবাহী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তবে সেই সন্তান যদি হয় একজন সুসন্তান, তাহলে সেই সন্তানের পিতামাতার গর্ব, মানসিক প্রশান্তি ও পরিতৃপ্তির কোনো শেষ থাকে না। এক্ষেত্রে সন্তানকে শৈশব থেকে আদর্শ সাহচর্যে রেখে মানবিক মানুষ, সৎচরিত্রবান ও ধর্মীয় অনুশাসনে গড়ে তুললে সভ্যতার চাহিদা পূরণে সফলতা আসবে।
পারিবারিক শিক্ষা ও ধর্মীয় অনুশাসনে সন্তানকে গড়ে তোলা
পরিবার হচ্ছে শিশুর প্রথম বিদ্যালয়। আর সেই বিদ্যালয়ের আদর্শ শিক্ষক একজন শিক্ষিত মা। শৈশব-কৈশোরে পরিচ্ছন্ন ও সুস্থ পরিবেশ থেকে যে শিক্ষা অর্জিত হয়, তা পরবর্তী জীবনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। গবেষণায় দেখা যায়, পারিবারিক শিক্ষা শিশুর অনাগত জীবনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে।
নিয়ন্ত্রণহীন জীবনে কখনো স্থিরতা আসে না। মানসিক প্রশান্তি ও পরিতৃপ্তির জন্য একমাত্র ধর্মীয় অনুশাসন কার্যকরী ভূমিকা রাখে। নিয়ন্ত্রণ ছাড়া জীবন মাঝিবিহীন নৌকার মতো। মহান আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও ভয়ের অনুভূতি মনে জাগ্রত থাকলে সেই সন্তান কখনো খারাপ কাজ করতে পারে না। এজন্য আদর্শ জীবন গঠনে ধর্মীয় পুস্তক, হাদিস ও পবিত্র কোরআন শিক্ষা এবং তা আমলের বিকল্প নেই।
কোরআন, হাদিস ও মনীষীদের দৃষ্টিতে সন্তান পালন
সূরা আল-ফুরকানের ৭৪ নম্বর আয়াতে রয়েছে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য এমন স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দান করো, যারা আমাদের চোখ জুড়িয়ে দেয় এবং আমাদের মুত্তাকিদের জন্য অনুসরণযোগ্য করে দাও।’
সূরা ইব্রাহিমের ৪০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এবং আমার সন্তানদের সালাত কায়েমকারী করো, হে আমাদের প্রতিপালক! এবং আমার দোয়া কবুল করো।’
আদর্শ সন্তান পালনে হযরত আলী (রা.) বলেন, ‘আপনার সন্তানকে আপনার নিজের মতো করার চেষ্টা করবেন না, কারণ সে আপনার থেকে ভিন্ন এক সময়ের জন্য জন্ম নিয়েছে।’
উত্তম শিক্ষা ও শিষ্টাচারের গুরুত্বারোপ করে তিরমিজি শরিফের ১৯৫২ নম্বর হাদিসে বলা হয়েছে, ‘কোনো বাবা তাঁর সন্তানকে ভালো আদব-কায়দা ও উত্তম শিক্ষার চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কোনো উপহার দিতে পারেন না।’
সন্তানদের মাঝে সমতা ও ন্যায়বিচার শেখাতে সহিহ বুখারি শরিফের ২৫৮৭ নম্বর হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সন্তানদের মাঝে দান-উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার বজায় রাখো।’
সন্তানদের সম্পর্কে লেখক, মনীষী ও চিন্তাবিদদের বাণী
নেপোলিয়ন বোনাপার্টের বহুল প্রচলিত কথা, ‘তোমরা আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি দেবো।’ এ কথার মধ্য দিয়ে একজন শিক্ষিত মাকে যেমন গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে, ঠিক তেমনি শিক্ষিত জাতি বিনির্মাণে সন্তানদের আদর্শ মানুষ হিসেবে তৈরি করাও অত্যন্ত জরুরি।
একজন আমেরিকান লেখক, শিক্ষাবিদ এবং অনুপ্রেরণাদায়ী জেস লেয়ার (Jess Lair) বলেছেন, ‘Children are not things to be molded, but are people to be unfolded.’ অর্থাৎ, সন্তানকে নিজের মতো ঢেলে সাজানোর চেষ্টা না করে তার ভেতরের মেধা ও সম্ভাবনাকে উন্মোচিত হতে দেওয়া উচিত।
মার্কিন নাগরিক অধিকার আন্দোলনকারী, রাজনীতিবিদ এবং ধর্মযাজক জেসি জ্যাকসন (Jesse Jackson) বলেন, ‘Your children need your presence more than your presents.’ অর্থাৎ, সন্তানদের দামি উপহার দেওয়ার চেয়ে আপনার মূল্যবান উপস্থিতি ও সময় তাদের জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কিশোর বয়সে ভুল পথ থেকে রক্ষার উপায়
সন্তানের সঙ্গে বাবা-মায়ের সম্পর্ক বন্ধুসুলভ হওয়া জরুরি। বাবা-মা অতিরিক্ত রাগী কিংবা কড়া শাসনে রাখলে সন্তানের সঙ্গে দূরত্ব বেড়ে যায়। এ কারণে ওদের অবচেতন মনে অপরাধজগতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে বাবা-মায়ের সঙ্গে তা বলারও আর পরিবেশ খুঁজে পায় না।
পরিবার থেকে পাওয়া অতিরিক্ত শাসন, দুর্ব্যবহার, অনাদর ও অবহেলা সন্তানকে আস্থাহীন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেয়। এ ক্ষেত্রে বাবা-মাকে অধিক সচেতন ও উদারপন্থা অবলম্বন করতে হবে। পরিবার থেকে পর্যাপ্ত ভালোবাসা, সময় ও গুরুত্ব পেলে বাইরের কারও কাছ থেকে সাময়িক বা কৃত্রিম মনোযোগ খোঁজার প্রবণতা অনেক কমে যায়।
পড়াশোনা, ক্যারিয়ার বা নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা জরুরি। জীবনের একটি বড় উদ্দেশ্য থাকলে ক্ষণস্থায়ী আবেগ বা আকর্ষণে পথ হারানোর সম্ভাবনা থাকে না। খেলাধুলা, ছবি আঁকা, বই পড়া, গান শেখা, বিতর্ক বা স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের মতো ইতিবাচক কাজে যুক্ত থাকলে মানসিক শক্তি গঠনমূলক খাতে ব্যয় হয়।
আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে উৎসাহ প্রদান
কৈশোর থেকেই সন্তানকে ছোট ছোট সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত। যেমন খাবার পছন্দ করা, বই পড়া, পোশাক বাছাইয়ের মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণে সন্তানের কাছে পরামর্শ চাওয়া কিংবা সিদ্ধান্ত চাইলে সন্তানরা বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবার সুযোগ পাবে। ফলে বুদ্ধির বিকাশ ও আত্মবিশ্বাস বেড়ে যাবে।
এ ছাড়া বন্ধুদের প্রভাব জীবনের এই পর্যায়ে খুব বেশি থাকে। যারা মূল্যবোধ চর্চা করে এবং পড়াশোনায় মনোযোগ দেয়, তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব বাড়ানো উচিত। এছাড়া জিপিএ বা ভালো নম্বরের ওপর অতিরিক্ত চাপ না নিয়ে শেখার আনন্দ এবং বিষয়বস্তু বোঝার ওপর জোর দিতে হবে।
ভুল বা ব্যর্থতা যে শেখার একটি অংশ, তা সন্তানকে বোঝানো জরুরি। ব্যর্থতায় বকাঝকা না করে নতুন করে চেষ্টা করতে উৎসাহিত করা সঠিক কাজ। সন্তানের ছোট ছোট অর্জন বা ভালো কাজের প্রশংসা করতে হবে। এতে তার আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়বে।
ভার্চুয়াল জগতে সচেতনতা ও পিতামাতার ভূমিকা বাড়ানো
সিনেমা বা নাটকের কাল্পনিক চরিত্রের মাধ্যমে যে রোমান্টিক দৃশ্যপট তৈরি করা হয়, তা বাস্তব জীবনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা সচেতন সন্তানের কাজ নয়। এ কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউব ব্যবহারে যথেষ্ট সচেতন থাকা জরুরি। এছাড়া উঠতি বয়সের কারণে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করা একটি স্বাভাবিক জৈবিক ও মানসিক প্রক্রিয়া। এ সময় বাবা-মাকে আরও আন্তরিক হয়ে বন্ধুসুলভ আচরণের মাধ্যমে সন্তানকে বিভিন্ন ইসলামি যৌক্তিক উদাহরণ টেনে আত্মনিয়ন্ত্রণের শিক্ষা দিতে হবে। তরুণ বয়সের এই সাময়িক আকর্ষণই যেন জীবনের স্থায়ী সিদ্ধান্তের ভিত্তি না হয়।
যথাসময়ে সঠিকভাবে ‘না’ বলতে শেখানো
জীবনের এমন একটি পরিস্থিতি এসে চারদিক দিয়ে ঘিরে ধরবে, তখন মাথা ঠান্ডা রেখে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ মেধাবী ও দূরদর্শী সন্তানদের কাজ। অনেক ক্ষেত্রেই বন্ধু বা নিকটজনের চাপে পড়ে কোনো অনুপযুক্ত সময়ে গৃহীত সিদ্ধান্তে ‘হ্যাঁ’ বলতে বাধ্য করে। এ সময় সন্তানকে জড়তা কাটিয়ে স্পষ্ট ভাষায় ‘না’ বলার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। এতে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সহজ হবে।
শেষ কথা
সন্তান কেবল একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ নয়, বরং পুরো জাতির এক সম্ভাবনাময় কাণ্ডারি। আজকের সন্তানকে যেভাবে পারিবারিক স্নেহ, মানবিক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় অনুশাসনে বড় করে তোলা হবে, আগামী দিনের পৃথিবী ঠিক সেভাবেই রূপ নেবে।
কেবল উপাদানভিত্তিক উপহার দিয়ে কিংবা কঠোর শাসনের বেড়াজালে আটকে রেখে আদর্শ মানুষ তৈরি করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন পিতামাতার সক্রিয় উপস্থিতি, ভালোবাসা এবং মুক্ত চিন্তার সুযোগ প্রদান। তাই আসুন, সন্তানদের নিজের মতো করে না গড়ে তাদের সুপ্ত মেধা ও চরিত্রকে বিকশিত হতে দিই, যেন তারা সৎ, আত্মবিশ্বাসী ও আলোকিত মানুষ হিসেবে সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।
লেখক:
সহকারী অধ্যাপক (ইংরেজি)
কুয়াকাটা খানাবাদ ডিগ্রি কলেজ
বাংলাদেশ সময়: ১৫:৫৯:৩৬ ● ৩৬ বার পঠিত
