মঙ্গলবার ● ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কলাপাড়ায় প্রাথমিক শিক্ষায় চলছে হ-য-ব-র-ল
হোম » লিড নিউজ » কলাপাড়ায় প্রাথমিক শিক্ষায় চলছে হ-য-ব-র-ল
![]()
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় নানা অনিয়ম ও সংকটের অভিযোগ উঠেছে। সরকারের বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম, শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি এবং শিক্ষা খাতে নানা বরাদ্দের পরও বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। শিক্ষা অফিসে জনবল সংকট, বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট, শিক্ষকদের কোচিং-বাণিজ্য, সরকারি বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার না হওয়া এবং অকার্যকর বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন অভিভাবক ও স্থানীয়রা।
তাদের অভিযোগ, বিদ্যালয়গুলোতে মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান তৎপরতা নেই।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কলাপাড়া পৌর শহরতলীর ১৫১ নম্বর বাদুরতলী (১) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের পতাকাদণ্ডে বিবর্ণ জাতীয় পতাকা উড়ছে। দীর্ঘদিনেও বিদ্যালয় ভবনে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।
ক্লাস চলাকালে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয় চত্বরে খেলাধুলা করতে দেখা যায়। প্রধান শিক্ষকের কক্ষ ছিল ফাঁকা। তাঁর দেখা মেলেনি বিদ্যালয়ে। শিক্ষক মিলনায়তনে জাকির নামের একজন সহকারী শিক্ষককে পাওয়া যায়। এ ছাড়া তিনজন নারী সহকারী শিক্ষিকা প্রথম শিফটের অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থীকে নিয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করছিলেন। অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে এ সময় অমনোযোগী দেখা যায়।
বিদ্যালয়ের প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিকক্ষে শিশুদের জন্য কোনো শিক্ষা উপকরণ দেখা যায়নি। খেলাধুলার সামগ্রীও নেই। দেয়ালে ইংরেজি বর্ণমালা লেখা থাকলেও বাংলা বর্ণমালার কোনো চিত্র বা অঙ্কন নেই। হাজিরা খাতায় ২১ জন শিক্ষার্থীর তথ্য থাকলেও শ্রেণিকক্ষের মেঝেতে ১০ থেকে ১২ জন শিক্ষার্থীকে বসে থাকতে দেখা যায়।
এ সময় সহকারী শিক্ষিকা মাকসুদা পারভিন প্রাক-প্রাথমিকের ক্লাস নিচ্ছিলেন। প্রতিবেদকের কাছে দাবি করা হয়, প্রাক-প্রাথমিকের শিশুদের পাঠদানের বিষয়ে তাঁর কোনো প্রশিক্ষণ নেই। এরপরও তিনিই প্রতিদিন শিশুদের ক্লাস নেন বলে জানা গেছে।
শ্রেণিকক্ষের পাশের শৌচাগারটি তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখা যায়। বিশুদ্ধ পানির জন্য স্থাপিত নলকূপটিও প্রায় দেড় বছর ধরে বিকল বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। বিদ্যালয় চত্বরে নির্মিত ওয়াশ ব্লকের ট্যাংকে মাসে এক-দুবার পানি তোলা হলেও সেটি সবসময় অপরিচ্ছন্ন থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গরমের মধ্যে শিক্ষার্থীদের বিশুদ্ধ পানি পানেরও কোনো ব্যবস্থা নেই। অনেক সময় বিদ্যালয়সংলগ্ন প্রতিবেশীদের বাড়ি থেকে পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে শিশুদের গালমন্দ শুনতে হয় বলে অভিযোগ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের।
অভিভাবকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একই বিদ্যালয়ে কর্মরত প্রধান শিক্ষিকা সুমাইয়া নাসরিনের কাছে বিশুদ্ধ পানি ও অন্যান্য সমস্যার কথা জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনি স্থানীয় একটি প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলতে অনেকে ভয় পান বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে মুঠোফোনে প্রধান শিক্ষিকা সুমাইয়া নাসরিনের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, ‘নজরুল বর্ষের অনুষ্ঠানে’ শিক্ষার্থীদের নিয়ে অংশগ্রহণের জন্য তিনি উপজেলা পরিষদে রয়েছেন। বিদ্যালয়ের উন্নয়ন বরাদ্দের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শিক্ষা অফিস থেকে যখন যা দেওয়া হয়, তা পাওয়ার কথা। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের কাছ থেকে নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
কলাপাড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় ১৭১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ১০৮টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। সহকারী শিক্ষকের ৪২টি পদও শূন্য রয়েছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসেও পাঁচটি পদ শূন্য রয়েছে।
শিক্ষা অফিস সূত্র আরও জানায়, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া দেশের বাইরে যাওয়ায় রসুলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. আরিফুর রহমান, চরচান্দুপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা নাহিদ আক্তার সুমি এবং মাঝেরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা মিমি রাখাইনকে চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।
কর্মস্থলে অনুমোদনহীন অনুপস্থিতির অভিযোগে ইটবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মাহমুদ আলম পলাশের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে। এ ছাড়া ফৌজদারি মামলার অভিযোগে লতাচাপলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. জাকির হোসেন, তাহেরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এমা ওয়েন ও আবুল হোসেন এবং সুলতানগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আতিকুর রহমান খলিলকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে শিক্ষা অফিস।
কলাপাড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোসা. সাহিদা বেগম বলেন, ‘অফিসের জনবল সংকট এবং বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এ ছাড়া প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ পূরণের জন্য সহকারী শিক্ষকদের কাছ থেকে আবেদন নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে কাজ করছি।’
বাংলাদেশ সময়: ১৬:২৪:৫০ ● ৩৭ বার পঠিত
