রবিবার ● ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পুলক চ্যাটার্জি একজন বর্ষীয়ান সাংবাদিকের করুণ মৃত্যু

হোম » গণমাধ্যম » পুলক চ্যাটার্জি একজন বর্ষীয়ান সাংবাদিকের করুণ মৃত্যু
রবিবার ● ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬


 

পুলক চ্যাটার্জি

এম মজিবুল হক কিসলু

 

যে মানুষটি জীবিত থাকতে হয়তো একটি ফোনকলের অপেক্ষায় ছিলেন, মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে কত ফোন আসে। যে মানুষটির পাশে বসার সময় কারও ছিল না, চলে যাওয়ার পর তাঁকে নিয়ে কত স্মৃতিচারণ হয়।

 

যে মানুষটির আর্থিক কষ্টের খবর কেউ নিতে চায়নি, অথচ মৃত্যুর পর তাঁর ছবিতে ভরে যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।

 

‘পুলক ভাই খুব ভালো মানুষ ছিলেন।’

 

‘পুলক ভাই একজন ভালো সাংবাদিক ছিলেন।’

 

‘তাঁর মতো মানুষ আর হবে না।’

 

কিন্তু বুকের ভেতর থেকে একটি প্রশ্ন উঠছে। তাই কিছু লিখতে হচ্ছে।

 

পুলক ভাই, আপনি যখন বেঁচে ছিলেন, তখন আমরা কোথায় ছিলাম?

 

বরিশালে দৈনিক সমকাল এর সাবেক ব্যুরো প্রধান সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু শুধু একটি মৃত্যুসংবাদ নয়। এটি আমাদের সাংবাদিক সমাজের জন্য একটি কঠিন আয়না। সেই আয়নায় তাকালে হয়তো আমরা নিজেদেরই দেখতে পাব।

 

শুক্রবার সন্ধ্যার পর বরিশাল প্যারারা রোডের সমকাল কার্যালয় থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে তাঁর হাতে লেখা পাঁচটি চিরকুট উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে পুলিশ। তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তদন্তাধীন। ময়নাতদন্ত ও তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও উচিত নয়। কিন্তু তদন্তের বাইরেও যে প্রশ্নটি রয়ে যায়, সেটি আরও গভীর।

 

দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের পর একজন মানুষ যখন তাঁর কর্মক্ষেত্র হারান, তখন তাঁর জীবনে কী ঘটে?

 

পুলক চ্যাটার্জি সমকালের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বরিশাল ব্যুরো প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বছরের পর বছর মাঠে ঘুরেছেন। সংবাদ সংগ্রহ করেছেন ও মানুষের সুখ-দুঃখের কথা লিখেছেন। বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। সংগঠনটির কার্যনির্বাহী কমিটির সিনিয়র সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। জাতীয় দৈনিকগুলোর ব্যুরো প্রধানদের সংগঠনের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। তিনি সাংবাদিকতায় একদিনের মানুষ ছিলেন না।

 

তাঁর জীবনের একটি বড় অংশই ছিল সেই সংবাদকক্ষ, সেই চেয়ার, সেই টেবিল আর সেই ব্যস্ত টেলিফোনের সঙ্গে জড়িয়ে।

 

২০২৩ সালের মে মাসে সমকাল তাঁকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়। তারপরও একটি আশ্চর্য বিষয় ঘটে।

 

চাকরি নেই, তিনি জানেন। কিন্তু তাঁর কাছে থেকে যায় বরিশাল ব্যুরো অফিসের একটি চাবি। আর তিনি কী করতেন? মাঝে মধ্যেই অফিস খুলতেন। চাকরি নেই। বেতন নেই। পদ নেই। অথচ পুরোনো অভ্যাসে, পুরোনো টানে, পুরোনো স্মৃতির কাছে তিনি সেই অফিসে গিয়ে বসতেন।

 

হয়তো দরজা খুলে তাঁর মনে হতো, এই তো তাঁর জায়গা। হয়তো পুরোনো চেয়ারটি দেখলে মনে পড়ত কত সংবাদ পাঠিয়েছেন। কত রাত পর্যন্ত কাজ করেছেন। কত মানুষ এসেছেন ও গেছেন। কত গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ তাঁর হাত দিয়ে বেরিয়েছে।

 

অফিসটি হয়তো তখন আর তাঁর কর্মস্থল ছিল না। কিন্তু তাঁর কাছে সেটিই ছিল তাঁর সবচেয়ে পরিচিত পৃথিবী। শেষ পর্যন্ত সেই স্মৃতিবিজড়িত অফিস থেকেই তাঁর মরদেহ উদ্ধার হলো। এই জায়গাটিতেই এসে বুকটা ভার হয়ে যায়। একজন মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। এটি একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হতে পারে।

 

কিন্তু একজন মানুষ তাঁর জীবনের দীর্ঘদিনের কর্মপরিচয় হারিয়েছেন।

 

এটি কি শুধু প্রশাসনিক বিষয়?

 

চাকরি চলে যেতে পারে।

 

পদ চলে যেতে পারে।

 

বেতন বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

 

কিন্তু মানুষটির অভিজ্ঞতা তো চলে যায় না।

 

তাঁর কয়েক দশকের সাংবাদিকতা তো মুছে যায় না। তাহলে তাঁকে অন্য কোনোভাবে ধরে রাখা যেত না?

 

ব্যুরো প্রধানের চেয়ার না থাকলেও কি একজন ‘সিনিয়র সাংবাদিক’ হিসেবে তাঁর জন্য একটি চেয়ার রাখা যেত না?

 

একজন পরামর্শক হিসেবে?

 

একজন বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে?

 

একজন অভিজ্ঞ সহকর্মী হিসেবে?

 

অথবা অন্তত এমনভাবে, যাতে তিনি অনুভব করতে পারেন, এই প্রতিষ্ঠান আমাকে পুরোপুরি ভুলে যায়নি।

 

কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের পেছনে নিশ্চয়ই তাদের নিজস্ব কারণ থাকতে পারে। প্রতিষ্ঠান পরিচালনারও বাস্তবতা আছে। কিন্তু বাস্তবতার পাশাপাশি একটু মানবিকতার জায়গা কি রাখা যেত না? এই প্রশ্নের উত্তর আজ হয়তো আর পুলক চ্যাটার্জি নিতে পারবেন না। কিন্তু আমারা চাই।

 

কারণ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন ক্ষমতা বদলায়, সরকার বদলায়, প্রতিষ্ঠান বদলায়। এমনকি সাংবাদিকের কর্মস্থলও বদলে যায়।

 

সাংবাদিক তো কর্মচারী নন। কোনো দলের কর্মীও নন। তাঁর পরিচয় তাঁর কাজ, তাঁর কলম, তাঁর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা।

 

লেখতে গেলে বলতে হয়। বরগুনার সাংবাদিক চিত্তরঞ্জন শীলের কথা মনে পড়ে। প্রায় ৪০ বছর ধরে তিনি দৈনিক সংবাদ-এ কাজ করছেন। ‘সংবাদ’ কর্তৃপক্ষ তাঁকে আজও রেখেছেন। দীর্ঘ অভিজ্ঞতার একজন সাংবাদিককে ধরে রাখার এই সংস্কৃতি আমাদের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে।

 

কারণ একজন প্রবীণ সাংবাদিকের বয়স বাড়ে, কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতার মূল্য কমে না। বরং অনেক সময় বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কাছে জমা হয় এমন এক সম্পদ, যার নাম অভিজ্ঞতা।

 

পুলক চ্যাটার্জিরও সেই সম্পদ ছিল।

 

কিন্তু চাকরি হারানোর পর তাঁর জীবনের আর্থিক কষ্টের খবর কতজন নিয়েছেন? কেউ কি নিয়মিত ফোন করে বলেছেন, ‘পুলক দা, কেমন আছেন?’ কেউ কি জিজ্ঞেস করেছেন, ‘সংসার চলছে তো?’ কেউ কি বলেছেন, ‘আপনার জন্য কিছু একটা করা দরকার।’

 

আমরা জানি না।

 

হয়তো কেউ নিয়েছেন। হয়তো কেউ পাশে ছিলেন। কিন্তু আজকের এই ঘটনার পর অন্তত আমাদের নিজেদের কাছে এই প্রশ্নটি করতেই হবে।

 

কারণ একজন মানুষ যখন বিপদে থাকেন, তখন তাঁর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় মানুষের।

 

মৃত্যুর পর ফুল নয়।

 

জীবিত অবস্থায় একটি হাত।

 

মৃত্যুর পর দীর্ঘ ফেসবুক পোস্ট নয়।

 

জীবিত অবস্থায় একটি ফোনকল।

 

মৃত্যুর পর অশ্রুসিক্ত স্মৃতিচারণ নয়।

 

জীবিত অবস্থায় একটু সম্মান।

 

পুলক চ্যাটার্জির হাতে থাকা সেই অফিসের চাবিটা আজ যেন আমাদের জন্য এক প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

চাকরি চলে গেছে, কিন্তু চাবিটা রয়ে গেছে। পদ চলে গেছে, কিন্তু অফিসের সঙ্গে সম্পর্কটা যায়নি। বেতন নেই, কিন্তু তিনি বসেছেন। হয়তো সেই ঘরটিতে তিনি শুধু একটি অফিস দেখতেন না, দেখতেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ অধ্যায়। হয়তো সেই ঘর তাঁকে মনে করিয়ে দিত, তিনি একসময় প্রয়োজনীয় ছিলেন। তিনি একসময় ব্যুরো প্রধান ছিলেন। তিনি একসময় প্রতিদিন সংবাদ পাঠাতেন। তিনি একসময় মানুষের খবর লিখতেন।

 

অথচ শেষ পর্যন্ত সেই ঘরেই তাঁর নিজের জীবনের শেষ অধ্যায় লেখা হলো। এর চেয়ে বেদনাদায়ক পরিহাস আর কী হতে পারে?

 

পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুর কারণ তদন্তেই বেরিয়ে আসুক। সত্য সামনে আসুক। তাঁর পরিবার ন্যায়বিচার পাক। এটাই প্রত্যাশা।

 

কিন্তু তাঁর চলে যাওয়া আমাদের অন্তত একটি শিক্ষা দিক।

 

মানুষকে হারানোর পর তাঁর মূল্য বুঝে লাভ নেই।

 

একজন সাংবাদিককে তাঁর মৃত্যুর পর স্মরণ করার চেয়ে, জীবিত অবস্থায় তাঁর পাশে দাঁড়ানো অনেক বড় মানবিকতা। কোনো সাংবাদিকের চাকরি চলে গেলে শুধু তাঁর চেয়ারটি খালি হয় না। অনেক সময় তাঁর ঘরের চুলাটিও অনিশ্চিত হয়ে যায়। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় একটু থামা দরকার। একটু ভাবা দরকার।

 

একটু মানবিক হওয়া দরকার।

 

কারণ একটি চাকরি একজন মানুষের কাছে কখনো কখনো শুধু চাকরি নয়।

 

একটি সংসার।

 

একটি পরিচয়।

 

একটি আত্মমর্যাদা।

 

একটি বেঁচে থাকার অবলম্বন।

 

পুলক চ্যাটার্জিকে আর কোনোদিন সেই পুরোনো অফিসে বসতে দেখা যাবে না। চাবিটি আর তাঁর হাতে থাকবে না।

 

কিন্তু তাঁর চেয়ারটি যদি আজও সেখানে থাকে, তবে সেটি যেন আমাদের একটি প্রশ্ন করে, ‘আমি যখন ছিলাম, তখন তোমরা কোথায় ছিলে?’

 

এই প্রশ্নের উত্তর যেন আমরা পরের কোনো পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুর পর না খুঁজি। মানুষটি বেঁচে থাকতেই খুঁজি।

 

কারণ মৃত্যুর পর পাশে দাঁড়ানো খুব সহজ।

 

লেখক: একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও আইনজীবী

বাংলাদেশ সময়: ১৩:১৫:৪৯ ● ৩৯ বার পঠিত