রবিবার ● ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বর্ষায় ভাঙনে অস্তিত্ব সংকটে কুয়াকাটা সৈকত
হোম » কুয়াকাটা » বর্ষায় ভাঙনে অস্তিত্ব সংকটে কুয়াকাটা সৈকত
![]()
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)
ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বর্ষা মৌসুমে উত্তাল সাগরের আগ্রাসী ঢেউয়ে ক্রমেই ভাঙছে দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটা সৈকত। বছরের পর বছর অব্যাহত ভাঙনে সংকুচিত হচ্ছে সৈকতের প্রস্থ, বিলীন হচ্ছে বনাঞ্চল, স্থাপনা ও বসতভিটা। জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চললেও স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় কুয়াকাটার অস্তিত্ব ও পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ সরকার কুয়াকাটাকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করে। তখন লেম্বুরবন থেকে গঙ্গামতির পয়েন্ট পর্যন্ত সৈকতের দৈর্ঘ্য ছিল ১৮ কিলোমিটার। সময়ের ব্যবধানে পশ্চিমে তিন নদীর মোহনা থেকে পূর্বে রামনাবাদ মোহনা পর্যন্ত সৈকতের বিস্তৃতি বেড়ে প্রায় ২৯ কিলোমিটারে পৌঁছালেও বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে এর প্রস্থে। প্রতিবছর ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও প্রবল ঢেউয়ের আঘাতে বালু ক্ষয়ে ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে সৈকত।
স্থানীয়দের দাবি, গত চার থেকে পাঁচ দশকে সমুদ্র প্রায় দেড় থেকে দুই কিলোমিটার লোকালয়ের দিকে এগিয়ে এসেছে। অব্যাহত ভাঙনে গত এক দশকে বিলীন হয়েছে নারিকেল বাগান, এলজিইডির ডাকবাংলো, ডিসি পার্কের একাংশ, পূর্বের জাউবাগান, ভূমি অফিসের গেস্ট হাউস, হোটেল-মোটেলসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। হারিয়ে গেছে বহু মানুষের বসতভিটাও।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় কুয়াকাটা সৈকতে বড় বড় বালুর টেক ও বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল ছিল। সমুদ্র দেখতে লোকালয় থেকে দুই থেকে তিন কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হতো। এখন সেই সমুদ্র লোকালয়ের একেবারে কাছে চলে এসেছে। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের মৌসুম এলেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
কুয়াকাটায় বেড়াতে আসা পর্যটক নাদিম ও রবিন বলেন, দূর-দূরান্ত থেকে কুয়াকাটায় এসে সৈকতের বর্তমান অবস্থা দেখে তারা হতাশ হয়েছেন। দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্রটির সৌন্দর্য ও অস্তিত্ব রক্ষায় দ্রুত কার্যকর ও স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও স্থানীয় সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন আনু বলেন, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। বালু ক্ষয়ের কারণে বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এ বছরও ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, ট্যুরিস্ট বক্স, মসজিদ, মন্দির ও মেরিন ড্রাইভসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থাপনা হুমকির মুখে রয়েছে। এসব রক্ষায় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
সিকদার রিসোর্ট অ্যান্ড ভিলাসের মহাব্যবস্থাপক আল আমিন হাওলাদার বলেন, আবহাওয়াজনিত কারণে যেভাবে কুয়াকাটা ভাঙছে, তা অব্যাহত থাকলে পর্যটক ও ব্যবসায়ীরা মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। সৈকত রক্ষায় সংশ্লিষ্টদের পরিকল্পিত ও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
গণমাধ্যমকর্মী ও পরিবেশকর্মী মেজবাহ উদ্দিন মাননু বলেন, গত দুই দশক ধরে কুয়াকাটা সৈকতের ১৮ কিলোমিটার এলাকা রক্ষায় স্থায়ী প্রতিরক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা শোনা গেলেও তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। আধুনিক পর্যটন নগরী হিসেবে কুয়াকাটাকে গড়ে তুলতে হলে দ্রুত সৈকত রক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। ম্যানগ্রোভ ও নন-ম্যানগ্রোভ উভয় ধরনের বনাঞ্চলই এখন হুমকির মুখে রয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ বনাঞ্চল বিলীন হয়ে গেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কলাপাড়া কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহ আলম বলেন, কুয়াকাটা সৈকতের ১১ দশমিক ৭ কিলোমিটার অংশের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সুরক্ষার জন্য ২০২৪ সালে ৭৫৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা হয়েছে। প্রকল্পটি বর্তমানে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। আপাতত জরুরি রক্ষণাবেক্ষণের অংশ হিসেবে জিও টিউব ব্যবহার করে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চলছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ও টেকসই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে দেশের অন্যতম প্রধান এই পর্যটন কেন্দ্রের সৈকত, বনাঞ্চল ও পর্যটন অবকাঠামোর বড় অংশ ভবিষ্যতে সাগরে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
বাংলাদেশ সময়: ১৯:১৯:০৩ ● ৩২ বার পঠিত
