শনিবার ● ২৯ আগস্ট ২০২৬
ভ্রমণের ক্যানভাসে বিনোদন, ইতিহাস, বিজ্ঞান ও সাহিত্য
হোম » ফিচার » ভ্রমণের ক্যানভাসে বিনোদন, ইতিহাস, বিজ্ঞান ও সাহিত্য
![]()
এম জাকির হোসাইন
মানবসভ্যতার বিকাশের সঙ্গে ভ্রমণের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। খাদ্যের সন্ধান, ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার, নতুন ভূখণ্ডের অনুসন্ধান, অজানাকে জানা কিংবা জ্ঞানার্জন- সব ক্ষেত্রেই ভ্রমণ মানুষের জীবন ও সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়েছে। সীমিত পরিসরে আবদ্ধ থাকলে মানুষের চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতার পরিধিও সীমিত হয়ে পড়ে। তাই পরিচিত গণ্ডি পেরিয়ে অচেনাকে চেনা এবং পৃথিবীকে নতুন করে দেখার আকাঙ্ক্ষা মানুষের চিরন্তন প্রবৃত্তি।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কালজয়ী ‘সংকল্প’ কবিতায় এই মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকেই শক্তিশালীভাবে প্রকাশ করেছেন। বদ্ধ ঘরের সীমাবদ্ধতা ভেঙে বিশ্বকে নিজের চোখে দেখার যে অদম্য আকাঙ্ক্ষা কবিতাটিতে ফুটে উঠেছে, তা আজও ভ্রমণপিপাসু মানুষের হৃদয়ে অনুরণন তোলে।
ভ্রমণের সঙ্গে সভ্যতার দীর্ঘ সম্পর্ক
প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ নতুন ভূখণ্ড, সংস্কৃতি ও জনপদ সম্পর্কে জানার জন্য দূরদূরান্তে পাড়ি দিয়েছে। প্রাচীন গ্রিসের ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস বিভিন্ন দেশ ও জনপদে ভ্রমণ করে সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি লিপিবদ্ধ করেছিলেন। এ কারণে তাঁকে ইতিহাসচর্চার পাশাপাশি প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভ্রমণবৃত্তান্তকার হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।
পরবর্তী সময়ে মার্কো পোলো, ইবনে বতুতা, ঝাং হি, ক্রিস্টোফার কলম্বাস, ভাস্কো দা গামা, ফার্দিনান্দ ম্যাগেলান ও জেমস কুকের মতো অভিযাত্রী ও নাবিকদের ভ্রমণ পৃথিবীর বিভিন্ন ভূখণ্ড, সমুদ্রপথ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে মানুষের জ্ঞানকে বিস্তৃত করেছে। তাঁদের অভিযান পরবর্তী সময়ে বিশ্ব-অনুসন্ধানের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে।
ভ্রমণ তাই শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া নয়; এটি মানুষের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্প্রসারণেরও একটি মাধ্যম। সেন্ট অগাস্টিনের বহুল উদ্ধৃত বাণী- ‘The world is a book and those who do not travel read only one page.’ অর্থাৎ পৃথিবী যেন একটি বিশাল বই, আর ভ্রমণ না করলে তার অল্প একটি অংশই জানা সম্ভব।
বাংলাদেশের পর্যটনভুবন
প্রকৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বিচিত্র সমন্বয়ে বাংলাদেশও ভ্রমণপিপাসু মানুষের জন্য আকর্ষণীয় একটি দেশ। বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত হিসেবে পরিচিত কক্সবাজার, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, রাঙামাটির সাজেক, সিলেটের চা-বাগান, রাতারগুল, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর এবং বান্দরবানের পাহাড়-ঝরনা বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্রকে বৈচিত্র্যময় করেছে।
বান্দরবানের নীলাচল, নীলগিরি, থানচি ও দেবতাখুমের পাহাড়ি সৌন্দর্য পর্যটকদের আকর্ষণ করে। একই সমুদ্রসৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার বিরল সুযোগের কারণে পটুয়াখালীর কুয়াকাটাও দেশের অন্যতম পরিচিত পর্যটনকেন্দ্র। সমুদ্র, প্রকৃতি ও স্থানীয় সংস্কৃতির সমন্বয়ে কুয়াকাটার স্বাতন্ত্র্য আলাদা।
অন্যদিকে বাংলাদেশের ইতিহাস ও প্রত্নঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ, বগুড়ার মহাস্থানগড়, নওগাঁর পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, ঢাকার লালবাগ কেল্লা ও আহসান মঞ্জিল। এসব স্থানে ভ্রমণ বিনোদনের পাশাপাশি দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার সুযোগও তৈরি করে।
দেশের সীমানা পেরিয়ে
বাংলাদেশের বাইরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তেও রয়েছে অসংখ্য আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র। ভারতের তাজমহল তার স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক তাৎপর্যের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। ফ্রান্সের আইফেল টাওয়ার ও ল্যুভর জাদুঘর, চীনের গ্রেট ওয়াল, গ্রিসের সান্তোরিনি, সুইজারল্যান্ডের আল্পস, মিসরের পিরামিড এবং পেরুর মাচু পিচু পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের নাম।
সমুদ্রসৈকতের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার বন্ডাই বিচ, থাইল্যান্ডের পাতায়া ও মায়া বে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নান্দনিক সৈকতও পর্যটকদের আকর্ষণ করে। প্রতিটি স্থান তার প্রকৃতি, ইতিহাস, স্থাপত্য, সংস্কৃতি কিংবা ভূপ্রকৃতির স্বাতন্ত্র্যের কারণে মানুষের ভ্রমণতৃষ্ণা বাড়িয়ে দেয়।
কেন ভ্রমণে ভালো লাগে?
ভ্রমণের প্রতি মানুষের আকর্ষণের পেছনে শুধু মানসিক আনন্দ নয়, রয়েছে মনস্তাত্ত্বিক ও স্নায়ুবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও। নতুন ও মনোরম কোনো দৃশ্য চোখে পড়লে চোখের রেটিনা সেই আলোক সংকেত অপটিক নার্ভের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পাঠায়। মস্তিষ্কের ভিজ্যুয়াল কর্টেক্স সেই দৃশ্য বিশ্লেষণ করে। এরপর আবেগ ও আনন্দের সঙ্গে সম্পর্কিত মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ সক্রিয় হতে পারে।
প্রকৃতির সবুজ, পাহাড়, নদী কিংবা সমুদ্রের মতো মনোরম পরিবেশ অনেক মানুষের মধ্যে প্রশান্তি ও ইতিবাচক অনুভূতি সৃষ্টি করে। আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেম সক্রিয় হয় এবং ডোপামিনসহ বিভিন্ন নিউরোকেমিক্যালের কার্যক্রমে পরিবর্তন ঘটে। এর সঙ্গে ভালো লাগা, আগ্রহ ও তৃপ্তির অনুভূতি তৈরি হতে পারে।
প্রাকৃতিক পরিবেশে সময় কাটানো এবং দৈনন্দিন চাপ থেকে সাময়িক দূরে থাকা মানসিক চাপ কমাতেও সহায়ক হতে পারে। তবে ভ্রমণের সঙ্গে নির্দিষ্ট হরমোন বা রাসায়নিক পদার্থের পরিবর্তনকে সরাসরি সব মানুষের ক্ষেত্রে একই ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; ব্যক্তিভেদে এর প্রতিক্রিয়া ভিন্ন হতে পারে।
শরীর ও মনের জন্য ভ্রমণ
ভ্রমণ মানেই সবসময় গাড়ি, বাস বা বিমানে বসে থাকা নয়। নতুন জায়গা ঘুরে দেখা, হাঁটা, পাহাড়ে ওঠা কিংবা প্রকৃতির মধ্যে চলাফেরা শারীরিক সক্রিয়তা বাড়ায়। নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম হৃদ্স্বাস্থ্য, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং সামগ্রিক সুস্থতার জন্য উপকারী।
একই সঙ্গে পরিচিত পরিবেশ ও দৈনন্দিন রুটিন থেকে কিছু সময়ের জন্য বেরিয়ে আসা মানসিক সতেজতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে। নতুন জায়গা দেখা, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন মানুষের শেখার পরিধি বাড়ায়। ফলে ভ্রমণ একদিকে বিনোদন, অন্যদিকে ব্যক্তিগত বিকাশ ও মানসিক পুনর্গঠনেরও একটি সুযোগ।
ভ্রমণের দর্শনকে সংক্ষেপে বলা যায়- এটি হৃদয়কে উন্মুক্ত করে, চিন্তার পরিধি বাড়ায় এবং জীবনে নতুন গল্প ও অভিজ্ঞতা যোগ করে।
সাহিত্যে ভ্রমণের চিরন্তন আবেদন
ভ্রমণ শুধু বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা নয়; সাহিত্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। ইংরেজি সাহিত্যের বিখ্যাত কবি রবার্ট ফ্রস্ট তাঁর ‘দ্য রোড নট টেকেন’ কবিতায় দুটি পথের প্রতীকের মাধ্যমে জীবনের সিদ্ধান্ত ও নির্বাচনের কথা তুলে ধরেছেন। কম ব্যবহৃত পথ বেছে নেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, সিদ্ধান্ত এবং জীবনের ভিন্নতর যাত্রার তাৎপর্য প্রকাশ করেছেন।
ফ্রস্টের আরেক বিখ্যাত কবিতা ‘স্টপিং বাই উডস অন আ স্নোয়ি ইভনিং’-এ প্রকৃতির গভীর সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণের পাশাপাশি দায়িত্ববোধের কথাও উঠে এসেছে। কবিতার বক্তা তুষারময় সন্ধ্যায় গভীর ও মনোরম অরণ্যের সৌন্দর্যে থমকে দাঁড়ালেও শেষ পর্যন্ত তাঁর দায়িত্ব ও প্রতিশ্রুতির কথা মনে পড়ে। সামনে তখনও অনেক পথ পাড়ি দেওয়ার বাকি।
এই উপলব্ধি ভ্রমণের দর্শনের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। প্রকৃতি আমাদের থামতে শেখায়, সৌন্দর্য উপভোগ করতে শেখায়; আবার জীবনের দায়িত্ব আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে তাগিদ দেয়।
বাংলা কবিতাতেও ভ্রমণ ও পথচলার আবেদন অত্যন্ত শক্তিশালী। জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কবিতায় দীর্ঘ পথচলা, দূরদেশ, সমুদ্র ও ইতিহাসের বিস্তৃত প্রেক্ষাপটের মধ্য দিয়ে এক ক্লান্ত মানুষের আশ্রয় অনুসন্ধানের চিত্র ফুটে উঠেছে। কবির ‘হাজার বছর ধরে’ পৃথিবীর পথে হাঁটার চিত্রটি যেন মানুষের চিরন্তন যাত্রারই প্রতীক- যেখানে পথের শেষের চেয়ে পথচলার অভিজ্ঞতাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ভ্রমণ মানেই জীবনকে নতুন করে দেখা
মানুষ জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিনিয়ত ছুটে চলে। সেই ছুটে চলার মাঝে ভ্রমণ এনে দেয় সাময়িক বিরতি, নতুন অভিজ্ঞতা এবং নতুনভাবে পৃথিবীকে দেখার সুযোগ। একটি পাহাড়, একটি নদী, একটি সমুদ্র, একটি পুরোনো স্থাপনা কিংবা অপরিচিত মানুষের জীবনযাপন- প্রতিটি অভিজ্ঞতাই আমাদের পরিচিত পৃথিবীর সীমা আরও একটু প্রসারিত করে।
তাই ভ্রমণকে কেবল বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখলে এর ব্যাপ্তি অনেকটাই সীমিত হয়ে যায়। ভ্রমণ একই সঙ্গে ইতিহাসের পাঠ, বিজ্ঞানের বিস্ময়, সাহিত্যের অনুপ্রেরণা, প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং নিজের সঙ্গে নিজের পরিচয়ের একটি পথ।
জীবনের ব্যস্ততা ও দায়িত্বের ভিড়ে মানুষকে কখনো কখনো থামতে হয়, চারপাশ দেখতে হয়, আবার নতুন উদ্যমে পথ চলতে হয়। প্রকৃতির সৌন্দর্যে কিছুক্ষণ মুগ্ধ হয়ে দাঁড়ানো যেমন প্রয়োজন, তেমনি জীবনের গন্তব্যের কথাও মনে রাখা জরুরি। কারণ পথ যতই দীর্ঘ হোক, অভিজ্ঞতার প্রতিটি বাঁকই শেষ পর্যন্ত আমাদের জীবনকেই সমৃদ্ধ করে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক (ইংরেজি), কুয়াকাটা খানাবাদ ডিগ্রি কলেজ
বাংলাদেশ সময়: ৬:২৪:৩২ ● ৩৩ বার পঠিত
