বুধবার ● ১৯ আগস্ট ২০২৬

মস্তিষ্কের চিন্তায় চলছে কম্পিউটার, বদলে যাচ্ছে প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ

হোম » প্রযুক্তি » মস্তিষ্কের চিন্তায় চলছে কম্পিউটার, বদলে যাচ্ছে প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ
বুধবার ● ১৯ আগস্ট ২০২৬


 

মস্তিষ্কের চিন্তায় চলছে কম্পিউটার, বদলে যাচ্ছে প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ

সাগরকন্যা আইটি ডেস্ক

 

চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছেন। দুই হাত পকেটে। সামনে ল্যাপটপের পর্দায় খোলা অনলাইন দাবার বোর্ড। আপনি মাউস ধরলেন না, কি-বোর্ডেও হাত দিলেন না। শুধু মনে মনে ভাবলেন, ‘ঘোড়াটাকে এবার ই৪ ঘরে নিয়ে যাই।’ কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই পর্দার ঘোড়াটি চলে গেল নির্দিষ্ট ঘরে।

 

শুনতে সায়েন্স ফিকশনের গল্পের মতো মনে হলেও, এমন দৃশ্য এখন আর পুরোপুরি কল্পকাহিনি নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্নায়ুবিজ্ঞান ও কম্পিউটার প্রকৌশলের সমন্বয়ে এমন প্রযুক্তি তৈরি হয়েছে, যা মানুষের মস্তিষ্কের সংকেত বিশ্লেষণ করে কম্পিউটারকে নির্দেশ দিতে পারে। এই প্রযুক্তির নাম ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস বা বিসিআই।

 

সহজ ভাষায়, বিসিআই হলো মস্তিষ্ক ও বাইরের কোনো যন্ত্রের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের ব্যবস্থা। এখানে ব্যবহারকারীকে সব সময় হাত দিয়ে মাউস, কি-বোর্ড কিংবা অন্য কোনো নিয়ন্ত্রণযন্ত্র ব্যবহার করতে হয় না। মস্তিষ্কের স্নায়বিক কর্মকাণ্ড থেকে পাওয়া সংকেত সংগ্রহ করে তা কম্পিউটার বুঝতে পারে এমন নির্দেশে রূপান্তর করাই এর মূল কাজ।

 

মস্তিষ্কের সংকেত কীভাবে ধরা হয়

 

মানুষের মস্তিষ্কে প্রায় ৮৬ বিলিয়ন নিউরন রয়েছে। এসব নিউরনের পারস্পরিক যোগাযোগের সঙ্গে বৈদ্যুতিক ও রাসায়নিক সংকেত জড়িত। আমরা যখন হাত নাড়ানোর কথা ভাবি, কোনো শব্দ উচ্চারণের চেষ্টা করি কিংবা কোনো নির্দিষ্ট নড়াচড়ার পরিকল্পনা করি, তখন মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশে স্নায়বিক কর্মকাণ্ডের ধরন বদলে যায়।

 

বিজ্ঞানীরা সেই কর্মকাণ্ডের বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করে কম্পিউটারের জন্য ব্যবহারযোগ্য তথ্য তৈরি করেন। বিষয়টি অনেকটা এমন- মস্তিষ্কের ভেতরে অসংখ্য নিউরন একই সময়ে সক্রিয় থাকলেও নির্দিষ্ট কাজের সঙ্গে যুক্ত সংকেতের ধরন আলাদা হতে পারে। প্রশিক্ষিত অ্যালগরিদম সেই পার্থক্য শনাক্ত করতে শেখে।

 

বিসিআইয়ে মস্তিষ্কের সংকেত সংগ্রহের পদ্ধতি মোটামুটি দুই ধরনের- নন-ইনভেসিভ ও ইনভেসিভ।

 

নন-ইনভেসিভ পদ্ধতিতে মাথার ত্বকের ওপর ইলেকট্রোডযুক্ত ক্যাপ বা হেডব্যান্ড ব্যবহার করা হয়। এতে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয় না এবং তুলনামূলকভাবে ঝুঁকিও কম। তবে মাথার খুলি ও অন্যান্য টিস্যুর কারণে মস্তিষ্কের গভীর বা নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে খুব সূক্ষ্ম সংকেত আলাদা করে শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে।

 

অন্যদিকে, ইনভেসিভ বিসিআইয়ের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ইলেকট্রোড বা অন্য ধরনের নিউরাল সেন্সর মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অঞ্চলের কাছাকাছি বা ভেতরে স্থাপন করা হয়। এতে সংকেত তুলনামূলকভাবে বেশি নির্দিষ্টভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব হলেও অস্ত্রোপচার ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের সঙ্গে বাড়তি চিকিৎসাগত ঝুঁকি রয়েছে।

 

এরপর কাজ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

 

মস্তিষ্ক থেকে সংকেত পাওয়া গেলেই কম্পিউটার মানুষের চিন্তা পড়ে ফেলতে পারে- বিষয়টি এতটা সরল নয়। সংকেতগুলো অত্যন্ত জটিল এবং ব্যক্তিভেদে তাদের ধরনও আলাদা হতে পারে।

 

এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং। ব্যবহারকারী যখন নির্দিষ্ট কোনো কাজ করার চেষ্টা করেন, তখন মস্তিষ্কের সংকেতের সঙ্গে সেই কাজের সম্পর্কের একটি মডেল তৈরি করা হয়। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের পর অ্যালগরিদম নতুন সংকেত বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য নির্দেশ শনাক্ত করতে পারে।

 

অর্থাৎ, বিসিআই এখনো মানুষের মনের প্রতিটি গোপন চিন্তা শব্দে শব্দে পড়ে ফেলছে না। বরং নির্দিষ্ট কাজ বা উদ্দেশ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত স্নায়বিক সংকেত শনাক্ত করে তা কম্পিউটার কমান্ডে রূপান্তর করছে। এই পার্থক্যটি বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষের জন্য নতুন সম্ভাবনা

 

বিসিআইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগগুলোর একটি চিকিৎসাক্ষেত্রে। মেরুদণ্ডের গুরুতর আঘাত, পক্ষাঘাত বা অন্যান্য স্নায়বিক সমস্যার কারণে যাঁরা হাত-পা নড়াতে পারেন না, তাঁদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের সংকেত ব্যবহার করে কম্পিউটার বা সহায়ক যন্ত্র নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে দীর্ঘদিন ধরে।

 

গবেষণায় কিছু পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তি মস্তিষ্কের সংকেত ব্যবহার করে কম্পিউটারের কার্সর নিয়ন্ত্রণ, বিভিন্ন ডিজিটাল কাজ সম্পাদন কিংবা রোবোটিক অঙ্গ পরিচালনা করতে পেরেছেন। ফলে যে মানুষ নিজের হাত দিয়ে কম্পিউটারের মাউস ধরতে পারেন না, তিনিও বিশেষ বিসিআই ব্যবস্থার সাহায্যে ডিজিটাল পরিবেশে কাজ করার সুযোগ পেতে পারেন।

 

এখানে একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ নোল্যান্ড আরবগ। ২০১৬ সালে দুর্ঘটনায় ঘাড়ের নিচ থেকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়ার পর ২০২৪ সালে তিনি নিউরালিংকের প্রথম মানব পরীক্ষায় অংশ নেন। মস্তিষ্কে ইমপ্ল্যান্ট করা ব্যবস্থার সাহায্যে তিনি কম্পিউটারের কার্সর নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হন এবং দাবাও খেলেন।

 

এই ঘটনা প্রযুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে। তবে এটিকে এখনই সাধারণ মানুষের জন্য প্রস্তুত প্রযুক্তি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বিসিআইয়ের অনেক ব্যবস্থাই এখনো গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে।

 

হারানো কণ্ঠ ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা

 

বিসিআইয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো যোগাযোগের সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা। কথা বলার ক্ষমতা হারানো মানুষের মস্তিষ্কের ভাষা ও বক্তৃতাসংক্রান্ত সংকেত শনাক্ত করে সেগুলোকে কৃত্রিম কণ্ঠে রূপান্তরের ওপর গবেষণা চলছে।

 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গবেষকেরা মস্তিষ্কের সংকেতকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ভাষা ও বক্তৃতা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তিদের যোগাযোগের গতি ও স্বাভাবিকতা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। এর ফলে ভবিষ্যতে কথা বলতে না পারা মানুষ নিজের মস্তিষ্কের সংকেত ব্যবহার করে কম্পিউটার বা কৃত্রিম কণ্ঠের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারবেন- এমন সম্ভাবনা আরও শক্তিশালী হচ্ছে।

 

তাহলে কি মনের গোপন কথাও পড়ে ফেলবে কম্পিউটার?

 

এখানেই বিসিআইয়ের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত প্রশ্নের পাশাপাশি উঠে আসে নৈতিক প্রশ্ন।

 

আমরা ইন্টারনেটে কী খুঁজি, কোথায় যাই কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কী লিখি- এসব তথ্যের বড় অংশ ইতিমধ্যে ডিজিটাল ডেটায় পরিণত হয়েছে। ভবিষ্যতে যদি মস্তিষ্কের সংকেতও ব্যাপকভাবে সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে সেই তথ্যের মালিক কে হবে? কে তা সংরক্ষণ করবে? কোন কাজে ব্যবহার করা যাবে? ব্যবহারকারীর অনুমতি ছাড়া তা বিশ্লেষণ করা হলে কী হবে?

 

বর্তমান বিসিআই প্রযুক্তি মানুষের সব চিন্তা পড়ে ফেলতে পারে- এমন ধারণা বাস্তবতার চেয়ে অনেক বেশি কল্পনাপ্রসূত। কিন্তু মস্তিষ্কের তথ্য যত বেশি নির্ভুলভাবে সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে, ততই মানসিক গোপনীয়তা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সম্মতির প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। নিউরোটেকনোলজি নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা ইতিমধ্যে মানসিক গোপনীয়তা, স্বাধীন চিন্তা, ব্যক্তিসত্তা ও স্বনির্ধারণের মতো অধিকার রক্ষার বিষয়ে সতর্ক করছেন।

 

এ কারণে ‘নিউরো-রাইটস’ বা মস্তিষ্ক-সম্পর্কিত অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা বাড়ছে। ভবিষ্যতে মস্তিষ্ক থেকে সংগৃহীত তথ্য কীভাবে ব্যবহার করা যাবে, সেই বিষয়ে আইন ও নীতিমালা তৈরির প্রয়োজনীয়তাও সামনে আসছে।

 

সামনে কত দূর?

 

বিসিআই এখনো শুরুর পর্যায়ে থাকা একটি দ্রুত বিকাশমান প্রযুক্তি। এর সামনে রয়েছে চিকিৎসাক্ষেত্রে বিপুল সম্ভাবনা, আবার রয়েছে প্রযুক্তিগত, চিকিৎসাগত ও নৈতিক নানা চ্যালেঞ্জ।

 

একদিন হয়তো কম্পিউটার চালাতে আমাদের মাউস বা কি-বোর্ডের ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমে যাবে। পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষ নিজের চিন্তার মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারবেন, কৃত্রিম অঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন কিংবা ডিজিটাল জগতে আরও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ কেবল প্রযুক্তি কতটা শক্তিশালী হবে, তার ওপর নির্ভর করবে না; নির্ভর করবে প্রযুক্তিটি কতটা নিরাপদ, সবার জন্য কতটা সহজলভ্য এবং মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মস্তিষ্কের গোপনীয়তা কতটা সুরক্ষিত রাখা যায় তার ওপরও।

 

প্রযুক্তি মানুষের চিন্তার বিকল্প নয়। বরং বিসিআইয়ের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো- মানুষের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার জন্য সেই চিন্তার সঙ্গে যন্ত্রের একটি নতুন যোগাযোগ তৈরি করা।

 

তাই মস্তিষ্ক ও কম্পিউটারের এই অভূতপূর্ব সংযোগকে ভয় কিংবা বিস্ময়ের চোখে দেখার পাশাপাশি এর পেছনের বিজ্ঞান, সম্ভাবনা এবং ঝুঁকিগুলো বোঝাও জরুরি। কারণ ভবিষ্যতের প্রযুক্তি শুধু আমাদের হাতে নয়, এক অর্থে আমাদের চিন্তার সঙ্গেও যুক্ত হতে চলেছে।

 

তথ্যসূত্র: নিউরালিংক ক্লিনিক্যাল স্টাডি আপডেট, এমআইটি টেকনোলজি রিভিউ, আইইইই স্পেকট্রাম

বাংলাদেশ সময়: ৬:১৯:৫৩ ● ৩০ বার পঠিত