সোমবার ● ১০ আগস্ট ২০২৬
ঘুন পোকার গুঁড়ো যেভাবে পুলিশকে নিয়ে গেল খুনির ঘর পর্যন্ত
হোম » পিরোজপুর » ঘুন পোকার গুঁড়ো যেভাবে পুলিশকে নিয়ে গেল খুনির ঘর পর্যন্ত![]()
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, পিরোজপুর
একটি মরদেহ পড়ে ছিল নদীর বেড়িবাঁধের পাশে। শরীরে ছিল রক্তের দাগ, মাথা ও কানের পাশে লেগে ছিল কাঠখেকো ঘুন পোকার গুঁড়ো। ঘটনাস্থল দেখে প্রথমে মনে হতে পারে, সেখানেই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। কিন্তু তদন্তকারীদের চোখ আটকে যায় অতি ক্ষুদ্র ওই গুঁড়োর দিকে। সেই সামান্য আলামতই শেষ পর্যন্ত বদলে দেয় পুরো তদন্তের গতিপথ।
মাত্র ১৬ ঘণ্টার অনুসন্ধানে পুলিশ জানতে পারে, বেড়িবাঁধে নয়, পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলার তেলিখালী ইউনিয়নের হরিণপালা এলাকায় ইসমাইল শরীফ (৬০) হত্যার ঘটনা ঘটেছে তার নিজের বসতঘরে। পরে হত্যার আলামত আড়াল করতে মরদেহটি নিয়ে বেড়িবাঁধের পাশে ফেলে রাখা হয় বলে পুলিশের দাবি।
এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী শেফালী বেগম এবং তিন ছেলে রুবেল শরীফ, রুমান শরীফ ও রাসেল শরীফকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। উদ্ধার করা হয়েছে হত্যায় ব্যবহৃত রক্তমাখা কুঠার।
লাশ যেখানে, খুন সেখানে নয়
রবিবার সকাল ৬টার দিকে তেলিখালী ইউনিয়নের বেরিবাঁধসংলগ্ন এলাকায় রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয়রা। খবর পেয়ে ভাণ্ডারিয়া থানা পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে। পরে পরিচয় মেলে ইসমাইল শরীফের।
মরদেহের অবস্থান ও রক্তের চিহ্ন দেখে ঘটনাটি প্রথমে বেড়িবাঁধকেন্দ্রিক হত্যাকাণ্ড বলেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু সুরতহাল ও মরদেহের ছবি বিশ্লেষণের সময় তদন্তকারীরা এমন একটি আলামত দেখতে পান, যা ঘটনাস্থলের সঙ্গে পুরোপুরি মেলেনি।
মাথা ও কানের পাশে লেগে থাকা কাঠখেকো ঘুন পোকার গুঁড়ো।
ছোট আলামত, বড় প্রশ্ন
তদন্তকারীদের কাছে প্রশ্ন ওঠে- বেড়িবাঁধের পাশে পড়ে থাকা মরদেহে কাঠের ঘুন পোকার গুঁড়ো এল কীভাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তদন্তের দিক পরিবর্তন করে পুলিশ। ধারণা করা হয়, মরদেহটি হত্যার আগে বা হত্যার পর কোনো কাঠের ঘর কিংবা কাঠের তৈরি স্থাপনার সংস্পর্শে ছিল।
এরপর নিহতের বসতঘর ও আশপাশের এলাকা খতিয়ে দেখতে শুরু করেন তদন্তকারীরা।
সেখানেই একের পর এক আলামত সামনে আসে।
ঘরের মেঝেতে মিলল দ্বিতীয় সূত্র
নিহতের ঘরের বারান্দার চালার বাঁশ ও কাঠে পাওয়া যায় ঘুন পোকার গুঁড়ো। মাটির মেঝেতে দেখা যায় ধস্তাধস্তির চিহ্ন। এর সঙ্গে মেলে রক্তের দাগও।
মরদেহের মাথা ও কানের পাশে থাকা ঘুন পোকার গুঁড়ো এবং ঘরের কাঠের অংশে থাকা গুঁড়োর উপস্থিতি তদন্তকারীদের সন্দেহ আরও জোরালো করে।
তখন পুলিশের কাছে পরিষ্কার হতে থাকে- বেড়িবাঁধ সম্ভবত হত্যার ঘটনাস্থল নয়; বরং মরদেহ সরিয়ে সেখানে ফেলে রাখা হয়েছে।
খাটের নিচে মিলল কুঠার
ঘরের ভেতরের আলামত পাওয়ার পর নিহতের স্ত্রী ও তিন ছেলেকে জিজ্ঞাসাবাদ আরও গভীর করে পুলিশ। শুরুতে তারা হত্যার সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেন।
তবে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে নিহতের ছোট ছেলে রাসেল শরীফ হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তথ্য দেন বলে জানায় পুলিশ। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বারান্দার খাটের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় রক্তমাখা একটি কুঠার।
এই কুঠারই তদন্তে আরও গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে সামনে আসে।
পরে রাতে সিআইডির ক্রাইম সিন টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে রক্তমাখা মাটি, ঘুন পোকার গুঁড়োসহ বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। নিহতের স্ত্রী শেফালী বেগমের শরীরেও রক্তের চিহ্ন পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। এসব আলামত ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
পারিবারিক কলহের সূত্র
তদন্তে এখন পর্যন্ত দীর্ঘদিনের পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহের বিষয়টি সামনে এসেছে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদ ও মারামারি হতো বলে প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছে পুলিশ।
তবে ঠিক কী কারণে ইসমাইল শরীফকে হত্যা করা হয়েছে এবং হত্যাকাণ্ডে স্ত্রী ও তিন ছেলের কার কী ভূমিকা ছিল, তা এখনো তদন্তাধীন। ডিএনএ পরীক্ষার ফল ও অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণের পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হতে পারে।
১৬ ঘণ্টার তদন্তে বদলে গেল ঘটনাস্থল
একটি মরদেহ, একটি বেরিবাঁধ এবং মাথার পাশে লেগে থাকা সামান্য ঘুন পোকার গুঁড়ো- এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে বিশ্লেষণ করেই তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেয় পুলিশ।
যেখানে হত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রথমে ধারণা করা হচ্ছিল, তদন্ত শেষে সেটি পরিণত হয় মরদেহ ফেলার স্থান হিসেবে। আর হত্যার মূল ঘটনাস্থল হিসেবে সামনে আসে নিহতের নিজের ঘর।
ভাণ্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দেওয়ান জগলুল হাসান বলেন, ‘ঘটনাস্থলের অতিক্ষুদ্র আলামত ও তথ্যপ্রযুক্তির দক্ষ ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র ১৬ ঘণ্টার মধ্যে ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডটির রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়েছে। গ্রেফতার চারজনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষা ও অধিকতর তদন্ত শেষে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হবে।’
উল্লেখ্য, শনিবার (৮ আগস্ট) বিকেলে স্ত্রীর সঙ্গে মনোমালিন্যের পর ইসমাইল শরীফ (৬৫) বাড়ি থেকে বের হন বলে জানানো হয়। পরদিন সকালে ভাণ্ডারিয়ার তেলিখালী ইউনিয়নের হরিণপালা এলাকার বেড়িবাঁধের ঢাল থেকে তার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে, বেড়িবাঁধে নয়, নিজের বসতঘরেই তাকে হত্যা করা হয়েছিল। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী ও তিন ছেলেকে গ্রেফতার করল পুলিশ।
বাংলাদেশ সময়: ১৭:৫৬:২৭ ● ২৭ বার পঠিত
