মঙ্গলবার ● ৪ আগস্ট ২০২৬

প্রাথমিক শিক্ষার বাতিঘর কলাপাড়ার মঙ্গল সুখ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

হোম » শিক্ষা » প্রাথমিক শিক্ষার বাতিঘর কলাপাড়ার মঙ্গল সুখ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
মঙ্গলবার ● ৪ আগস্ট ২০২৬


 

প্রাথমিক শিক্ষার বাতিঘর কলাপাড়ার মঙ্গল সুখ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

সাগরকন্যা প্রতিবেদক, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)

 

পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রাথমিক শিক্ষার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে মঙ্গল সুখ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান, শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিক্ষা পদ্ধতি, সহশিক্ষা কার্যক্রম এবং ধারাবাহিক সাফল্যের কারণে বিদ্যালয়টি এখন দেশের প্রাথমিক শিক্ষার অন্যতম মডেল হিসেবে পরিচিত।

 

সরেজমিনে বিদ্যালয় ঘুরে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের আকর্ষণীয় পরিবেশে পাঠদানের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক অবকাঠামো। বিদ্যালয়ের দেয়ালে ভাষা আন্দোলন থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, শহীদ বুদ্ধিজীবী এবং বিভিন্ন জাতীয় ব্যক্তিত্বের চিত্র অঙ্কিত রয়েছে। পাশাপাশি শিশুদের জন্য মীনা-রাজুর কার্টুন, শিক্ষামূলক ছবি ও দেয়ালজুড়ে পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু তুলে ধরা হয়েছে।

 

প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিকক্ষে রয়েছে খেলাধুলার উপকরণ, দেয়ালজুড়ে শিক্ষাসামগ্রী এবং জাতীয় ফুল-ফলসহ বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক মডেল। শিশুদের বিনোদনের জন্য রয়েছে দোলনা, স্লিপার, ঘোড়া, হাতি, সিংহ, জিরাফসহ নানা ধরনের খেলনা ও স্থাপনা, যা পুরো পরিবেশকে একটি শিশুতোষ পার্কে রূপ দিয়েছে।

 

সকালে জাতীয় সংগীত ও সমাবেশ শেষে ঘণ্টা বাজতেই শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে। তৃতীয় শ্রেণির একটি ক্লাসে দেখা যায়, শিক্ষক মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের মাধ্যমে প্রাথমিক বিজ্ঞান বইয়ের ‘প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয়’ অধ্যায়ের ভিডিও প্রদর্শন করছেন। ভিডিও শেষে দলগত আলোচনা, প্রশ্নোত্তর এবং ল্যাপটপের মাধ্যমে মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে পাঠদান পরিচালিত হয়। পাশের শ্রেণিকক্ষে প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ইংরেজি বর্ণমালা শেখানো হচ্ছিল আনন্দঘন পরিবেশে।

 

বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, উন্নত ও আধুনিক শিক্ষাদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪ ও ২০২৬ সালে বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয় হিসেবে প্রথম স্থান অর্জন করেছে। পাশাপাশি সরকারের ভিত্তিমূলক শিখন (Foundational Literacy and Numeracy-FLN) কার্যক্রম বাস্তবায়নেও বিদ্যালয়টি উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে।

 

সরেজমিনে দেখা যায়, বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত তিন বছরে এফএলএন কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বাংলায় প্রায় শতভাগ দক্ষতার পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত গণিতে প্রায় ৯৫ শতাংশ অগ্রগতি বজায় রয়েছে।

 

শিক্ষকরা নিয়মিত শিখন মূল্যায়ন, পাঠভিত্তিক কার্যক্রম এবং শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিক্ষণ পদ্ধতি অনুসরণ করায় শিক্ষার্থীদের পাঠ, লিখন ও গণনাভিত্তিক দক্ষতায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

 

জানা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষা আধুনিকায়নের লক্ষ্যে প্রথম ধাপে দেশের তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে বিশেষ কর্মসূচির আওতায় আনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে রয়েছে কলাপাড়ার মঙ্গল সুখ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পাবনার ভাঙ্গুড়ার বোয়ালমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং গাজীপুরের কালিয়াকৈরের উত্তর দারিয়াপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

 

পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমেও বিদ্যালয়টির রয়েছে ঈর্ষণীয় সাফল্য। ২০২৩ সালে জাতীয় পর্যায়ে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অর্জনের পাশাপাশি ২০২২ সালে শতভাগ বৃত্তি লাভ করে বিদ্যালয়টি। প্রতিবছর উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় শীর্ষস্থান ধরে রাখছে প্রতিষ্ঠানটি। সম্প্রতি ২০২৬ সালের বিভাগীয় বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে বিদ্যালয়টি, যা পটুয়াখালীর মধ্যে সর্বোচ্চ সাফল্য।

 

শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক বিকাশে বিদ্যালয়ে রয়েছে পিয়ানো, হারমোনিয়ামসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র এবং সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার। এছাড়া কাব স্কাউট কার্যক্রমেও বিদ্যালয়টির সাফল্য উল্লেখযোগ্য। গত ১০ বছরে শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ডসহ জাতীয় পর্যায়ে ১০৪টি পুরস্কার অর্জন করেছে বিদ্যালয়ের কাব স্কাউট সদস্যরা। গত পাঁচ বছরেই অর্জিত হয়েছে ১২২টি শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ড।

 

প্রধান শিক্ষক মোসা. নাজমুস সাকিব খান কনা বলেন, ‘বিদ্যালয়টি ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৫ সালে আদর্শ বিদ্যালয় এবং ২০০৫ সালে মডেল বিদ্যালয়ের স্বীকৃতি লাভ করে। বর্তমানে প্রধান শিক্ষকসহ ১৬ জন শিক্ষক কর্মরত আছেন। শিক্ষার্থী রয়েছে ৭৬৮ জন। এর মধ্যে বালক ৩৪৫ জন এবং বালিকা ৪২৩ জন। ভিত্তিমূলক শিখন নিশ্চিত করতে শিক্ষকরা আন্তরিকভাবে কাজ করছেন। নিয়মিত মূল্যায়ন ও অভিভাবকদের সহযোগিতার কারণে শিক্ষার্থীরা দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করছে। ভবিষ্যতেও এ ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আমরা বদ্ধপরিকর।’

 

কলাপাড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোসা. শাহিদা বেগম বলেন, ‘এফএলএন কার্যক্রমসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে মঙ্গল সুখ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সফলভাবে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আমাদের প্রত্যাশা, এ বিদ্যালয়ের সাফল্য দেশের আধুনিক প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে।’

বাংলাদেশ সময়: ১৪:৩৬:০১ ● ৩৫ বার পঠিত