রবিবার ● ২ আগস্ট ২০২৬

এআই কি এখন গণিত অলিম্পিয়াডের প্রশ্ন সমাধান করতে পারে?

হোম » প্রযুক্তি » এআই কি এখন গণিত অলিম্পিয়াডের প্রশ্ন সমাধান করতে পারে?
রবিবার ● ২ আগস্ট ২০২৬


 

এআই কি এখন গণিত অলিম্পিয়াডের প্রশ্ন সমাধান করতে পারে

সাগরকন্যা ডেস্ক

 

জুলাইয়ের এক দুপুর। পৃথিবীর ১০৮টি দেশের শত শত তরুণ গণিতবিদ বসেছেন আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড (আইএমও) পরীক্ষার হলে। সামনে ছয়টি প্রশ্ন- দুই দিনে তিনটি করে। প্রতিদিন সাড়ে চার ঘণ্টা, মোট নয় ঘণ্টা সময়। লক্ষ্য একটাই, বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ গণিত প্রতিযোগিতায় নিজের সেরাটা দিয়ে পদক জয়।

 

১৯৫৯ সাল থেকে অনুষ্ঠিত হয়ে আসা এই প্রতিযোগিতা বিশ্বের অসংখ্য কিংবদন্তি গণিতবিদের যাত্রার সূচনা করেছে। ফিল্ডস মেডেলজয়ী অনেক গণিতবিদও একসময় এই মঞ্চে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রতিযোগিতাকে ঘিরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে আরেক প্রতিযোগী- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)।

 

যখন এআই রৌপ্যপদকের সমমানের ফল করল

 

২০২৪ সালে গুগল ডিপমাইন্ডের তৈরি দুটি বিশেষায়িত এআই সিস্টেম- AlphaProof ও AlphaGeometry 2- আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের ছয়টি প্রশ্নের মধ্যে চারটির পূর্ণাঙ্গ সমাধান দিতে সক্ষম হয়। তারা মোট ৪২ নম্বরের মধ্যে ২৮ নম্বর অর্জন করে।

 

সেই বছর রৌপ্যপদকের কাট-অফ ছিল ২২ নম্বর এবং স্বর্ণপদকের কাট-অফ ছিল ২৯ নম্বর। অর্থাৎ, এআইয়ের অর্জিত নম্বর রৌপ্যপদকের সীমা সহজেই অতিক্রম করেছিল এবং স্বর্ণপদকের থেকে মাত্র এক নম্বর পিছিয়ে ছিল।

 

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় ছিল, প্রতিযোগিতার সবচেয়ে কঠিন ষষ্ঠ প্রশ্নটির সম্পূর্ণ সমাধান করে AlphaProof। ওই বছর ৬০৯ জন প্রতিযোগীর মধ্যে মাত্র পাঁচজন মানব প্রতিযোগী প্রশ্নটির পূর্ণ সমাধান করতে পেরেছিলেন। অন্যদিকে জ্যামিতির চতুর্থ প্রশ্নটির সমাধান দেয় AlphaGeometry 2।

 

এই গবেষণার ফলাফল পরবর্তীতে বিজ্ঞান সাময়িকী Nature-এ পিয়ার-রিভিউ শেষে প্রকাশিত হয়।

 

আলফাপ্রুফ কীভাবে কাজ করে?

 

AlphaProof সাধারণ ভাষাভিত্তিক কোনো চ্যাটবট নয়। এটি ChatGPT-এর মতো ভাষার সম্ভাবনা অনুমান করে উত্তর তৈরি করে না। বরং এটি গাণিতিক প্রমাণ নির্মাণের জন্য বিশেষভাবে তৈরি একটি এআই ব্যবস্থা।

 

এর মূল ভিত্তি রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং- যে পদ্ধতিতে ডিপমাইন্ডের AlphaZero দাবা ও অন্যান্য বোর্ড গেমে বিশ্বসেরা মানব খেলোয়াড়দের হারানোর সক্ষমতা অর্জন করেছিল।

 

AlphaProof-এর সঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে Lean নামের একটি ফরমাল থিওরেম-প্রুভিং সিস্টেম। এটি এমন একটি কম্পিউটার ব্যবস্থা, যেখানে গাণিতিক প্রমাণের প্রতিটি ধাপ স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই করা হয়। কোনো যুক্তিগত ভুল বা বাদ পড়া ধাপ থাকলে সেটি সঙ্গে সঙ্গে শনাক্ত হয়।

 

সিস্টেমটিকে প্রশিক্ষণ দিতে গবেষকেরা প্রায় ১০ লাখ গাণিতিক সমস্যাকে ফরমাল ভাষায় রূপান্তর করেন। এরপর সেখান থেকে প্রায় ১০ কোটি নতুন সমস্যা তৈরি করে এআইকে আরও জটিল গাণিতিক প্রমাণ নির্মাণের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

 

কোনো অলিম্পিয়াডের প্রশ্ন সামনে এলে AlphaProof সম্ভাব্য অসংখ্য সমাধান অনুসন্ধান করে। প্রতিটি ধাপ Lean-এর মাধ্যমে যাচাই হয়। ভুল পথ বাদ দিয়ে এবং সফল প্রমাণ থেকে শিক্ষা নিয়ে শেষ পর্যন্ত এটি একটি যুক্তিসংগত ও নির্ভুল প্রমাণে পৌঁছানোর চেষ্টা করে।

 

জ্যামিতির সমস্যাগুলোর জন্য আলাদা সিস্টেম AlphaGeometry 2 ব্যবহৃত হয়, কারণ জ্যামিতিক যুক্তির ধরন বীজগণিত বা সংখ্যাতত্ত্বের সমস্যার তুলনায় ভিন্ন।

 

এক বছরের ব্যবধানে স্বর্ণপদকের মান

 

২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড উপলক্ষে গুগল তাদের উন্নত জেমিনি-ভিত্তিক একটি এআই সিস্টেমের ফলাফল প্রকাশ করে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, মডেলটি ছয়টি প্রশ্নের মধ্যে পাঁচটির সঠিক সমাধান দিতে সক্ষম হয়, যা স্বর্ণপদকের মানের সমতুল্য।

 

একই সময় ওপেনএআইও জানায়, তাদের পরীক্ষামূলক একটি উন্নত সিস্টেমও পাঁচটি প্রশ্ন সফলভাবে সমাধান করেছে। ২০২৪ সালের তুলনায় এ ধরনের সমাধান আরও কম সময়ে সম্পন্ন হওয়াও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

২০২৬ সালে নতুন চমক

 

২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত একটি স্বাধীন গবেষণা ও উন্মুক্ত বেঞ্চমার্কে আরও ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। সেখানে কোনো বিশেষায়িত গণিত-সিস্টেম ব্যবহার না করে সাধারণ উদ্দেশ্যের (General-purpose) একাধিক এআই মডেলকে আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের প্রকৃত ছয়টি প্রশ্ন সমাধানের জন্য পরীক্ষা করা হয়।

 

পরীক্ষাগুলো পরিচালিত হয় ইন্টারনেটবিহীন পরিবেশে। মানুষের সরাসরি সহায়তা বা মূল্যায়ন ছাড়াই এআই মডেলগুলো একটি টার্মিনাল ব্যবহার করে সমাধান তৈরি করে। পরে পৃথক যাচাইকরণকারী এআই এজেন্ট প্রতিটি গাণিতিক প্রমাণ প্রতীকীভাবে পুনরায় পরীক্ষা করে, বীজগাণিতিক ধাপ যাচাই করে এবং সম্ভাব্য ভুল শনাক্ত করে।

 

গবেষকদের প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, Claude Fable 5 প্রথম রানেই ৪২-এর মধ্যে ৪২ নম্বর অর্জন করে। অন্যদিকে GPT-5.6 Sol এবং Kimi K3 যাচাইকরণ ব্যবস্থার শনাক্ত করা ত্রুটি সংশোধনের পর পূর্ণ নম্বর পায়।

 

তবে এই মূল্যায়ন আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের আনুষ্ঠানিক ফল নয়; এটি গবেষকদের পরিচালিত একটি স্বাধীন ও পুনরুত্পাদনযোগ্য বেঞ্চমার্ক, যা এআইয়ের গাণিতিক যুক্তি করার সক্ষমতা মূল্যায়নের উদ্দেশ্যে তৈরি।

 

তাহলে কি মানুষের অলিম্পিয়াডের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাচ্ছে?

 

প্রশ্নটি স্বাভাবিক। কিন্তু উত্তরটি এতটা সরল নয়।

 

বর্তমানের সবচেয়ে উন্নত এআই মডেলগুলোও একটি অলিম্পিয়াড-মানের প্রশ্ন সমাধানে বিপুল কম্পিউটিং শক্তি ব্যবহার করে। অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ প্রকৌশলগত প্রস্তুতি এবং দীর্ঘ সময়ের গণনা প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ, এগুলো এখনো মানুষের মতো সাধারণ বুদ্ধিমত্তার বিকল্প হয়ে ওঠেনি।

 

বরং প্রযুক্তিবিদদের মতে, ভবিষ্যতে এআই মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং সহযোগী হিসেবেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। যে শিক্ষার্থী আজ গাণিতিক প্রমাণ লেখা, যুক্তি বিশ্লেষণ এবং সমস্যাকে ধাপে ধাপে ভেঙে সমাধান করতে শিখছে, সে আগামী দিনের এআই-সমৃদ্ধ বিশ্বেও এগিয়ে থাকবে।

 

গণিত অলিম্পিয়াডের আসল শক্তি কখনো শুধু সঠিক উত্তর খুঁজে পাওয়ায় ছিল না; বরং ছিল কঠোর যুক্তি, বিশ্লেষণী চিন্তা এবং সৃজনশীল সমস্যা সমাধানের অভ্যাস গড়ে তোলায়। এআই সেই দক্ষতার অনেকটাই অনুকরণ করতে শিখছে, কিন্তু সেই চিন্তার ভিত্তি তৈরি করার কাজ এখনো মানুষেরই।

 

প্রযুক্তির এই দ্রুত পরিবর্তনের যুগে তাই প্রশ্নটি আর এআই মানুষকে হারাবে কি না, সেটি নয়। বরং প্রশ্ন হলো- মানুষ কীভাবে এআইকে কাজে লাগিয়ে আরও ভালো চিন্তা করতে, আরও বড় সমস্যা সমাধান করতে এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে পারবে।

বাংলাদেশ সময়: ৬:৪৩:২৪ ● ২৪ বার পঠিত