মঙ্গলবার ● ২৮ জুলাই ২০২৬
ভিক্ষা করেই কেটেছে ৫০ বছর, আজও মাথা গোঁজার স্থায়ী ঠিকানা নেই প্রতিবন্ধী ইউসুফের
হোম » বরগুনা » ভিক্ষা করেই কেটেছে ৫০ বছর, আজও মাথা গোঁজার স্থায়ী ঠিকানা নেই প্রতিবন্ধী ইউসুফের
![]()
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, বরগুনা
একটু মানবিক সহায়তা কি ফিরিয়ে দিতে পারে ইউসুফের হারিয়ে যাওয়া হাসি? প্রায় ৬০ বছর বয়সী শারীরিক প্রতিবন্ধী ইউসুফ জীবনের প্রায় ৫০ বছর কাটিয়েছেন মানুষের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করে। অথচ আজও তাঁর নিজের বলতে নেই এক টুকরো জমি, নেই মাথা গোঁজার মতো একটি স্থায়ী আশ্রয়।
জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর নিত্যসঙ্গী। দুটি হাত ছোট ও বাঁকা, দুটি পা স্বাভাবিক নয়, কোমরও বাঁকা। ঠিকমতো হাঁটাচলা করাও তাঁর জন্য কষ্টকর। তবুও জীবন-সংগ্রাম থেমে থাকেনি। প্রতিদিন ভোরে কাঁধে ভিক্ষার ঝুলি তুলে বেরিয়ে পড়েন মানুষের দুয়ারে দুয়ারে।
দিন শেষে মানুষের দয়া-দাক্ষিণ্যে যে সামান্য অর্থ জোটে, তা দিয়েই কোনোমতে চলে আট সদস্যের সংসার। তবে ক্ষুধা কিছুটা মিটলেও মেটে না দীর্ঘদিনের অপমান, অসহায়ত্ব আর অনিশ্চয়তার যন্ত্রণা।
সবচেয়ে বড় কষ্ট, দিন শেষে ফেরার মতো নিজের কোনো ঘর নেই। বৃষ্টি এলে ভিজতে হয়, শীতে কাঁপতে হয়, প্রচণ্ড রোদে পুড়তে হয়। অনিশ্চয়তা আর দারিদ্র্য যেন তাঁর জীবনের স্থায়ী সঙ্গী।
মানুষ যখন নিশ্চিন্তে নিজের ঘরে ঘুমিয়ে পড়ে, তখন ইউসুফ ভাবেন পরদিনের কথা- সংসার কীভাবে চলবে, মাস শেষে ঘরভাড়া দিতে পারবেন কি না, পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে পারবেন কি না।
ইউসুফের বাড়ি পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার দক্ষিণ গুলিশাখালী গ্রামে। তিনি আবুল হোসেনের ছেলে। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর প্রায় ১০ বছর আগে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বরগুনা সদর উপজেলার নিশানবাড়িয়া গ্রামে চলে আসেন। সেখানেই শুরু হয় নতুন করে টিকে থাকার সংগ্রাম।
পরিবারে রয়েছেন স্ত্রী রচনা বেগম, পাঁচ মেয়ে- ফাতেমা, রেখা, ময়না, সুমাইয়া ও জান্নাতি এবং একমাত্র ছেলে রুবেল। ছেলে বিয়ে করে স্ত্রীকে নিয়ে চট্টগ্রামে আলাদা বসবাস করায় স্ত্রী ও মেয়েদের দায়িত্ব এখনও ইউসুফের কাঁধেই।
বর্তমানে নিশানবাড়িয়া গ্রামের রাসেলদের বাড়ির একটি জরাজীর্ণ কক্ষে মাসে ১ হাজার ৪০০ টাকা ভাড়া দিয়ে থাকেন তিনি। যেদিন ভিক্ষা করতে পারেন, সেদিন সংসারের চুলা জ্বলে। অসুস্থতার কারণে বাইরে বের হতে না পারলে সেদিন অনাহারেই কাটে পরিবারটির সময়।
কথা বলতে বলতে আবেগাপ্লুত হয়ে ইউসুফ বলেন, ‘একটা ছোট্ট ঘর হলে শান্তিতে মরতে পারতাম।’
তিনি বলেন, ‘জন্ম থেকেই আমার দুই হাত-পা স্বাভাবিক না। ছোটবেলা থেকেই মানুষের কাছে হাত পেতে চলতে হচ্ছে। বয়স বাড়ছে, শরীরও আর আগের মতো নেই। এখন বেশি হাঁটতেও পারি না। নিজের কোনো জমি নেই, ঘরও নেই। শুধু থাকার মতো একটু জায়গা আর একটা ছোট ঘর যদি হতো, তাহলে জীবনের বাকি সময়টা শান্তিতে কাটাতে পারতাম।’
ইউসুফ জানান, নিজ জেলা ছেড়ে বরগুনায় চলে আসার পর থেকে নিয়মিত সরকারি সহায়তাও পান না। বয়সের ভারে ভিক্ষা করাও দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি, দানশীল মানুষ এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি সহায়তার আবেদন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বেঁচে থাকার জন্য আমার খুব বেশি কিছু দরকার নেই। শুধু পরিবার নিয়ে মাথা গোঁজার মতো একটা ছোট ঘর চাই। কেউ যদি একটু এগিয়ে আসে, তাহলে হয়তো আমার ৫০ বছরের কষ্টের জীবনে নতুন একটি অধ্যায় শুরু হবে।’
বাংলাদেশ সময়: ১৫:৪৭:৩২ ● ২৮ বার পঠিত
