মঙ্গলবার ● ১৬ জুন ২০২৬
বিবেকবর্জিত মানুষের ছড়াছড়ি: আমরা কোন সমাজের দিকে এগোচ্ছি?
হোম » মতামত » বিবেকবর্জিত মানুষের ছড়াছড়ি: আমরা কোন সমাজের দিকে এগোচ্ছি?
আসাদুজ্জামান দিদার
কোনো সমাজের প্রকৃত পরিচয় তার অট্টালিকা, উন্নয়ন প্রকল্প কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়; বরং সংকটের মুহূর্তে সেই সমাজ কতটা মানবিক, কতটা সংযমী এবং কতটা ন্যায়বোধসম্পন্ন আচরণ করে- তার মধ্যেই নিহিত থাকে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের চারপাশের অনেক ঘটনাই এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে, যেখানে মনে হয়- বিবেকবর্জিত মানুষের ছড়াছড়ি ক্রমেই বাড়ছে।
রংপুর মেডিকেল কলেজে এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যে ঘটনাগুলো আলোচনায় এসেছে, সেগুলো শুধু একটি হাসপাতালের ভেতরের সংকট নয়; বরং পুরো সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন। জানা গেছে, রোগীর ছেলে মায়ের অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর ক্ষোভে চিকিৎসকের ওপর হামলা চালিয়েছেন। পরে চিকিৎসকদের একটি অংশ মৃত মায়ের ছেলেকে কান ধরিয়ে ওঠবস করিয়ে পরে লাশ হস্তান্তর করেছেন। ঘটনার বাস্তবতা যাই হোক না কেন, এই দুই ধরনের আচরণই সভ্যতা, মানবিকতা এবং আইনের শাসনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
একজন মানুষ যখন প্রিয়জনকে হারান, তখন তার মানসিক অবস্থা স্বাভাবিক থাকে না। শোক, ক্ষোভ, অসহায়ত্ব এবং হতাশা তাকে আবেগপ্রবণ করে তুলতে পারে। কিন্তু সেই আবেগ কখনোই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বৈধতা দেয় না। চিকিৎসকের ওপর হামলা শুধু একজন ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়; এটি পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেয়। এতে চিকিৎসাসেবার পরিবেশ নষ্ট হয় এবং এর ফলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষই।
একইভাবে, যদি কোনো চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মী অপমানজনক শাস্তির মাধ্যমে প্রতিশোধ নেওয়ার পথ বেছে নেন, তবে সেটিও পেশাগত নৈতিকতার গুরুতর লঙ্ঘন। চিকিৎসা পেশার মূল ভিত্তি মানবিকতা। একজন চিকিৎসক শুধু রোগের চিকিৎসক নন, তিনি সমাজে সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধেরও প্রতীক। তাই অপমানের জবাবে অপমান কোনো সমাধান হতে পারে না।
আজ আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্তেজনা, গুজব এবং তাৎক্ষণিক আবেগ অনেক সময় বিচার-বিবেচনাকে হার মানিয়ে দেয়। সত্য উদ্ঘাটনের আগেই রায় ঘোষণা হয়ে যায়। আদালতের আগেই সামাজিক বিচারের আসর বসে যায়। মানুষ যুক্তির চেয়ে উত্তেজনাকে বেশি মূল্য দিতে শুরু করেছে।
এটি শুধু হাসপাতালের সমস্যা নয়। রাস্তার ঝগড়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহিংসতা, রাজনৈতিক সংঘর্ষ, পারিবারিক বিরোধ- সবখানেই যেন সহনশীলতার সংকট প্রকট হয়ে উঠছে। সামান্য মতবিরোধও দ্রুত সংঘাতে রূপ নিচ্ছে। ক্ষমা, ধৈর্য এবং সংলাপের জায়গা দখল করে নিচ্ছে প্রতিশোধ, অপমান এবং শক্তির প্রদর্শন।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সমাজের একটি অংশ অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজেরাও অন্যায়ের আশ্রয় নিচ্ছে। যেন অন্যায়ের প্রতিকার আরেকটি অন্যায় দিয়েই সম্ভব। অথচ ইতিহাস বলে, প্রতিশোধ কখনো ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় আইনের মাধ্যমে, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এবং জবাবদিহির মাধ্যমে।
এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব যেমন রয়েছে, তেমনি দায়িত্ব রয়েছে প্রতিটি নাগরিকেরও। হাসপাতালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ শোনার কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে ক্ষোভ সহিংসতায় রূপ না নেয়। কোনো অনিয়ম হলে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। দায়ী ব্যক্তি যে-ই হোন, তার জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়া উচিত।
আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং সামাজিক পরিসরেও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। সন্তানকে শুধু ভালো ছাত্র বা সফল পেশাজীবী বানালেই হবে না; তাকে ভালো মানুষও বানাতে হবে। সহমর্মিতা, সংযম, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং অন্যের মর্যাদাকে সম্মান করার শিক্ষা না থাকলে উন্নয়নের বাহ্যিক চিত্র একসময় ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। আমার মনে হয়, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্তব্য, সংযম, মানবিকতা, সহিষ্ণুতা বিষয়ে পড়ানো উচিত।
রংপুর মেডিকেল কলেজের ঘটনাটি তাই একটি বিচ্ছিন্ন সংবাদ নয়। এটি আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন রেখে যায়- আমরা কি এমন এক সমাজ গড়ে তুলছি, যেখানে ক্রোধ যুক্তিকে পরাজিত করছে, প্রতিশোধ মানবিকতাকে গ্রাস করছে এবং বিবেক ক্রমশ নির্বাসিত হচ্ছে?
একটি সুস্থ সমাজের জন্য প্রয়োজন আইন, ন্যায়বিচার এবং মানবিকতার সমন্বয়। সেখানে অপরাধের বিচার হবে আদালতে, অপমানের প্রতিশোধ নয়; সেখানে চিকিৎসক নিরাপদ থাকবেন, রোগীও মর্যাদা পাবেন; সেখানে শোক থাকবে, কিন্তু শোক থেকে সহিংসতার জন্ম হবে না।
আজ সবচেয়ে বড় সংকট অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকও নয়- সবচেয়ে বড় সংকট বিবেকের। আর বিবেক হারিয়ে গেলে কোনো উন্নয়ন, কোনো অর্জন, কোনো সাফল্যই একটি জাতিকে প্রকৃত অর্থে সভ্য করে তুলতে পারে না।
লেখক: গ্রাম ডাক্তার কল্যাণ সমিতি, মহিপুর (পটুয়াখালী) থানা শাখার আহ্বায়ক।
বাংলাদেশ সময়: ১৭:০১:০০ ● ৪২ বার পঠিত
