মঙ্গলবার ● ৯ জুন ২০২৬
অস্বস্তির স্তূপে স্বস্তির বিচার : কিছু কথামালা
হোম » মতামত » অস্বস্তির স্তূপে স্বস্তির বিচার : কিছু কথামালা
মো. বেল্লাল হাওলাদার
আলোচিত রামিসা হত্যা মামলায় মাত্র ১৬ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করে দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। একই সঙ্গে একজনকে ৫ লাখ টাকা এবং অন্যজনকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ডও করা হয়েছে। একটি নিষ্পাপ শিশুর ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দ্রুত বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক এই রায় শুধু রামিসার পরিবারকেই নয়, সমগ্র দেশবাসীকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মানুষের মনে একটি প্রশ্ন ছিল- অপরাধের বিচার দ্রুত ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন হোক। এই রায় সেই প্রশ্নের একটি ইতিবাচক উত্তর দিয়েছে বৈকি।
তবে এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে। রাষ্ট্র ও বিচার বিভাগের সমন্বয় দ্রুত বিচার ও অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করতে পারে, কিন্তু সমাজ থেকে অপরাধপ্রবণতা, সহিংসতা ও অমানবিকতা কি শুধু বিচার দিয়েই দূর করা সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের চারপাশের বাস্তবতার দিকে তাকানো সময়ের দাবি।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, বর্তমানে দেশজুড়ে চলছে তীব্র তাপদাহ, যা প্রকৃতিপ্রদত্ত। প্রখর রোদ ও অসহনীয় গরমে মানুষের জীবন যখন অতিষ্ঠ, ঠিক তখনই গত পরশু রাতে অনুভূত হয়েছে হালকা ভূমিকম্প। এমনকি মাঝেমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি হয়, আকাশ গর্জে ওঠে, বজ্রপাতে ঘটে মানুষের মৃত্যু। প্রকৃতির এই অস্থিরতার মাঝেই সমাজের ভেতরেও যেন আরেক ধরনের অস্থিরতা ক্রমশ প্রকট আকার ধারণ করেছে।
প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে চোখ রাখলেই সামনে আসে খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, আত্মহত্যা, চুরি, ছিনতাই এবং নারী-শিশু নির্যাতনের খবর। এসব ঘটনা কেবল পরিসংখ্যান নয়; এর প্রতিটির পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, এক বা একাধিক মানুষের কান্না এবং অপূরণীয় ক্ষতির গল্প। ফলে প্রশ্ন জাগে, আমরা কোথায় যাচ্ছি? কেন আমাদের সমাজে সহমর্মিতা, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে?
আমি মনে করি, প্রকৃতির এই সতর্ক সংকেতগুলোর মধ্যেও লুকিয়ে আছে গভীর এক বার্তা। মানুষের লোভ, হিংসা, অন্যায় ও নৈতিক অবক্ষয়ে আজ সমাজ যেমন বিপর্যস্ত, তেমনি প্রকৃতিও যেন তার অস্থির রূপে বারবার আমাদের সতর্ক করছে। স্বয়ং মহান সৃষ্টিকর্তা মানুষের সীমাহীন অন্যায় ও অসভ্য কর্মকাণ্ডে অসন্তুষ্ট। প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্য দিয়ে সেই বার্তাই যেন আমাদের সামনে প্রতিফলিত হচ্ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা সেই সতর্ক সংকেতগুলো উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হচ্ছি।
অথচ এসব ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি সুন্দর ও নিরাপদ সমাজ গড়তে শুধু উন্নয়ন নয়, নৈতিকতা, মানবিকতা এবং মানুষের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতার চর্চাও সমানভাবে প্রয়োজন।
সমাজবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, কোনো অপরাধ বা সামাজিক বিপর্যয় হঠাৎ করে সৃষ্টি হয় না। এর পেছনে থাকে সময়ের প্রেক্ষাপট, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মানসিক চাপ, সামাজিক বৈষম্য, পারিবারিক অস্থিরতা এবং মূল্যবোধের অবক্ষয়। এর সঙ্গে বর্তমান সময়ে দ্রব্যমূল্যের অবর্ণনীয় ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, কর্মক্ষেত্র থেকে ছাঁটাই, ঋণের চাপ এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় অনেক মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। সবাই এই চাপ সামলাতে পারছে না। অনেকেই হতাশ হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, আবার কেউ জীবনের প্রতিই আস্থা হারিয়ে ফেলছে।
সম্প্রতি আমার পার্শ্ববর্তী বরগুনা জেলায় এক মায়ের দুই সন্তান নিয়ে আত্মহত্যার ঘটনা দেশবাসীর হৃদয় গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। একজন মা, যিনি সাধারণত সন্তানের জন্য নিজের জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকেন, তিনিও যখন মৃত্যুকে একমাত্র মুক্তির পথ হিসেবে বেছে নেন, তখন বুঝতে হবে সংকট কেবল ব্যক্তিগত নয়; এর শিকড় সমাজের আরও গভীরে গেঁথে গেছে।
একইভাবে কয়েক দিন আগে নূরজাহান নামের এক বৃদ্ধার একাকী ফ্ল্যাটে মৃত্যুর ঘটনাও আমাদের বিবেককে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই দৃশ্য দেশ-বিদেশের মানুষকে ভীষণ ব্যথিত করেছে। যে মা সন্তানের সুখের জন্য নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যদি তিনি এমন নিঃসঙ্গ পরিণতির শিকার হন, তবে আমাদের সামাজিক অগ্রগতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হয়।
প্রযুক্তির এই যুগে মানুষ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সংযুক্ত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মানুষের মধ্যে মানসিক ও আবেগগত দূরত্বও অনেক বেড়েছে। হাজারো অনলাইন বন্ধুত্বের মাঝেও অনেক মানুষ ভেতরে ভেতরে ভীষণ একা। আমরা মানবতা নিয়ে প্রচুর কথা বলি, কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে তার চর্চা কতটুকু করি? সেই প্রশ্নের উত্তর খুব আশাব্যঞ্জক নয়।
মানবিকতার এই সংকটের একটি নির্মম চিত্র দেখা গেল সম্প্রতি রাজধানীর মতিঝিলে। দিনের আলোয়, ব্যস্ত সড়কে, একটি ব্যাংক থেকে ডলার নিয়ে বের হওয়া এক ব্যক্তিকে ঘিরে ধরে কয়েকজন দুর্বৃত্ত। তারা তাঁর ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। ভুক্তভোগী ব্যক্তি প্রাণপণ চেষ্টা করেও নিজের সম্পদ রক্ষা করতে পারেননি। একপর্যায়ে তাঁকে হাত ও পায়ে গুলি করে দুর্বৃত্তরা ব্যাগটি ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ঘটনাস্থলে অসংখ্য মানুষ উপস্থিত থাকলেও অধিকাংশই ছিলেন নীরব দর্শক। কেউ কেউ হয়তো আতঙ্কে এগিয়ে আসেননি, কিন্তু এই ঘটনা আমাদের সামনে আরেকটি প্রশ্ন তুলে ধরে- আমরা কি এমন এক সমাজে পরিণত হচ্ছি, যেখানে অন্যের বিপদ আর আমাদের হৃদয় স্পর্শ করে না?
এ কথা অনস্বীকার্য যে, রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। এই প্রসঙ্গে বর্তমান সরকারের প্রথম ১০০ দিনের কার্যক্রমও মূল্যায়নের দাবি রাখে। সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ডসহ কিছু জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছে, যা অবশ্যই ইতিবাচক এবং প্রশংসার দাবিদার। যদিও বলা হয়, এমন উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। কারণ একই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত হত্যা, ধর্ষণ, আত্মহত্যা, চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলোও আগের তুলনায় ঊর্ধ্বমুখী, যা মানুষের উদ্বেগকে বহুগুণ বাড়িয়েছে।
রাজধানীর কিছু গুরুত্বপূর্ণ সড়কে নজরদারি বৃদ্ধি এবং এআই-নির্ভর ব্যবস্থাপনা চালুর ফলে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও অনেক সমস্যার সমাধান এখনো হয়নি। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় যানজট, অটোরিকশার অব্যবস্থাপনা, ফুটপাত দখল এবং নাগরিক দুর্ভোগ এখনো বাস্তবতা হয়ে রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ উন্নয়নের ঘোষণার পাশাপাশি তাদের দৈনন্দিন জীবনে নিরাপত্তা ও স্বস্তির বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চায়।
একটি রাষ্ট্রের সাফল্য কেবল অবকাঠামো নির্মাণ বা নতুন কর্মসূচি ঘোষণার মাধ্যমে পরিমাপ করা যায় না। সেই রাষ্ট্র কতটা নিরাপদ, সেখানে মানুষ কতটা মর্যাদা ও ন্যায়বিচার পায়, প্রবীণরা কতটা সম্মানিত, শিশুরা কতটা সুরক্ষিত এবং হতাশাগ্রস্ত মানুষ কতটা সহায়তা পায়- এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
রামিসা হত্যা মামলার দ্রুত বিচার আমাদের আশাবাদী করেছে। এটি প্রমাণ করেছে, সদিচ্ছা থাকলে ন্যায়বিচার বিলম্বিত হওয়া অনিবার্য নয়। তবে একটি মানবিক, নিরাপদ ও সুস্থ সমাজ গড়তে বিচারব্যবস্থার পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধেরও সমান প্রয়োজন রয়েছে।
আজ আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অন্যের কষ্ট অনুভব করার ক্ষমতা, ব্যর্থ মানুষকে অবজ্ঞা না করে পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা এবং পরিবার ও সমাজে মানবিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ। কারণ আইন অপরাধীর শাস্তি দিতে পারে, কিন্তু একটি সুন্দর সমাজ গড়ে ওঠে মানুষের বিবেক, সহমর্মিতা এবং মানবিক চর্চার মাধ্যমে।
আজ তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- আমরা কি সত্যিই মানুষ হওয়ার শিক্ষা ধরে রাখতে পেরেছি?
লেখক: কবি, সাংবাদিক ও সংগঠক
বাংলাদেশ সময়: ০:৪২:৩২ ● ১৩৫ বার পঠিত
