রবিবার ● ২৪ মে ২০২৬

খাজনামুক্ত শিয়ালকাঠী পশুর হাটে স্বস্তিতে ক্রেতা-বিক্রেতা

হোম » পিরোজপুর » খাজনামুক্ত শিয়ালকাঠী পশুর হাটে স্বস্তিতে ক্রেতা-বিক্রেতা
রবিবার ● ২৪ মে ২০২৬


খাজনামুক্ত শিয়ালকাঠী পশুর হাটে স্বস্তিতে ক্রেতা-বিক্রেতা

সাগরকন্যা প্রতিবেদক, ভাণ্ডারিয়া (পিরোজপুর)

দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী পশুর হাট পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলার শিয়ালকাঠী পশুর হাট। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে এই হাটে কোনো ধরনের খাজনা ছাড়াই পশু বেচাকেনা করে আসছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পশু ব্যবসায়ীদের কাছে লাভজনক ও নির্ভরযোগ্য হাট হিসেবে আলাদা পরিচিতি পেয়েছে এটি।

শিয়ালকাঠী মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যবাহী এই হাটটি কখনো প্রশাসনের ইজারায় দেওয়া হয়নি। নেই কোনো ইজারাদার কিংবা আনুষ্ঠানিক পরিচালনা কমিটি। গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর সুমনের নির্দেশনায় বাজারটি ইজারার বাইরে থাকায় ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হয় না। বিশেষ করে ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে খাজনামুক্ত সুবিধাই হাটটিকে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যান্য পশুর হাট থেকে ব্যতিক্রমী করে তুলেছে।

শনিবার সকালে সরেজমিনে হাটে গিয়ে দেখা যায়, স্থানীয় খামারিদের পাশাপাশি যশোর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ব্যাপারীরা বড় ও মাঝারি আকারের গরু, দেশি-বিদেশি ষাঁড়, গাভী, বলদ ও বাছুর বিক্রির জন্য সারিবদ্ধভাবে রেখেছেন। শুধু বাজারের নির্ধারিত স্থানেই নয়, বাজারসংলগ্ন সড়কের প্রায় দেড় থেকে দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়েও পশু বিক্রি করতে দেখা যায়। ঈদকে সামনে রেখে ক্রেতা-বিক্রেতাদের ব্যাপক সমাগমে পুরো এলাকা জমজমাট হয়ে উঠেছে।

হাটের একপাশে রয়েছে সড়ক যোগাযোগ এবং অন্যপাশে প্রবাহিত পোনা নদী। ফলে স্থল ও নৌ-উভয় পথেই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সহজে পশু নিয়ে আসতে পারছেন ব্যবসায়ীরা।

স্থানীয়দের ভাষ্য, দেশের অধিকাংশ পশুর হাটে প্রতি লাখ টাকার গরু বিক্রিতে এক থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত খাজনা দিতে হয়। এতে বিক্রেতাদের বাড়তি খরচ হয় এবং সেই প্রভাব গিয়ে পড়ে ক্রেতাদের ওপর। কিন্তু শিয়ালকাঠী পশুর হাটে কোনো খাজনা না থাকায় ব্যবসায়ীরা যেমন লাভবান হচ্ছেন, তেমনি ক্রেতারাও তুলনামূলক কম দামে পশু কিনতে পারছেন।

হাটের সার্বিক শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক টহল দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নজরদারি করছেন। পাশাপাশি জাল টাকা শনাক্তে বসানো হয়েছে বিশেষ মেশিন। ফলে বড় অঙ্কের লেনদেনে প্রতারণা বা জাল নোটের ঝুঁকি কমেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

যশোরের কেশবপুর থেকে আসা গরু বিক্রেতা সোহরাফ বলেন, অন্যান্য হাটে প্রতি এক লাখ টাকার গরু বিক্রিতে প্রায় এক থেকে দেড় হাজার টাকা খাজনা দিতে হয়। এখানে সেই খরচ নেই। এখান থেকে গরু কিনে অন্যত্র বিক্রি করলে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি লাভ করা যায়।

গরু কিনতে আসা মো. মনির সিকদার বলেন, খাজনা না থাকায় এখানে গরুর দাম তুলনামূলক কম। দরদামও স্বাভাবিক থাকে। তাই প্রতি বছর এখানেই গরু কিনতে আসি।

উত্তর শিয়ালকাঠী গ্রামের খামারি জামাল হাওলাদার বলেন, এ বছর গোখাদ্যের দাম অনেক বেড়েছে। ফলে গরুর দামও কিছুটা বেশি। বড় গরু দেড় থেকে দুই লাখ টাকা এবং মাঝারি গরু এক থেকে দেড় লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে শেষ দিকে বেচাকেনা আরও জমে উঠবে।

পৌরসভার জামিরতলা গ্রামের খামারি শাহ আলম হাওলাদার বলেন, খাজনা না থাকায় আমাদের লাভের সুযোগ থাকে। অন্য হাটে খাজনা দিয়ে অনেক সময় লাভ কমে যায়। এখানে সেই চিন্তা নেই।

শিয়ালকাঠী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কে এম সেলিম জানান, বিদ্যালয়ের উন্নয়নের স্বার্থে বাজারটি ইজারার বাইরে রাখা হয়েছে। হাটে গরু বিক্রির পর অনেক বিক্রেতা স্বেচ্ছায় বিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য অনুদান দেন। ওই অর্থ দিয়ে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করা হয়।

ভাণ্ডারিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, শিয়ালকাঠী পশুর হাটটি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী একটি পশুর হাট। এখানে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কোনো খাজনা আদায় করা হয় না। ফলে ক্রেতা-বিক্রেতারা স্বস্তিতে বেচাকেনা করতে পারেন। হাটের সার্বিক শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে উপজেলা প্রশাসনের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, খাজনামুক্ত এই শতবর্ষী পশুর হাটের ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি। তাদের মতে, ব্যতিক্রমী এই হাট দেশের পশু বাণিজ্যে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকতে পারে। ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই জমে উঠছে দক্ষিণাঞ্চলের এই ঐতিহ্যবাহী পশুর হাট।


এসই/এমআর

বাংলাদেশ সময়: ১১:৫৮:৫৫ ● ৩৮ বার পঠিত