শনিবার ● ২৩ মে ২০২৬

বিচারের দীর্ঘ অপেক্ষায় আস্থা হারাচ্ছে মানুষ, নীরব পথেই রামিসার বাবা

হোম » মতামত » বিচারের দীর্ঘ অপেক্ষায় আস্থা হারাচ্ছে মানুষ, নীরব পথেই রামিসার বাবা
শনিবার ● ২৩ মে ২০২৬


 

আসাদুজ্জামান দিদার

আসাদুজ্জামান দিদার

বাংলাদেশের বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, নাগরিক অধিকার রক্ষা করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা বিচার বিভাগের মূল দায়িত্ব। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ আদালতে মামলা নিষ্পত্তিতে অস্বাভাবিক বিলম্ব, কজলিস্ট তৈরিতে অনিয়ম ও প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপের অভিযোগ এবং চূড়ান্ত রায় পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিচার বিভাগের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।

 

মামলা জট ও দীর্ঘসূত্রিতা

 

বাংলাদেশের উচ্চ আদালত, বিশেষ করে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে বিপুলসংখ্যক মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে একটি মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে ১০ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। এর ফলে ভুক্তভোগী ব্যক্তি মানসিক, আর্থিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।

 

আইনজীবীদের মতে, মামলা জট বৃদ্ধির প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে-

 

বিচারকের স্বল্পতা

 

ঘন ঘন সময় প্রার্থনা

 

অপ্রয়োজনীয় মুলতবি

 

প্রশাসনিক দুর্বলতা

 

রাজনৈতিক সংবেদনশীল মামলায় ধীরগতি

 

পুরোনো বিচার ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি

 

 

একজন সাধারণ নাগরিক যখন ন্যায়বিচারের আশায় আদালতের দ্বারস্থ হন, তখন তিনি দ্রুত প্রতিকার প্রত্যাশা করেন। কিন্তু বছরের পর বছর আদালতে ঘুরেও যখন চূড়ান্ত রায় পাওয়া যায় না, তখন বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে হতাশা জন্ম নেয়।

 

কজলিস্ট তৈরিতে অনিয়মের অভিযোগ

 

উচ্চ আদালতের কজলিস্ট বা মামলার শুনানির তালিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। অনেক আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থী অভিযোগ করেন যে, প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক বিবেচনা বা অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে কিছু মামলা দ্রুত শুনানির তালিকায় আসে, আবার কিছু গুরুত্বপূর্ণ মামলা দীর্ঘদিন তালিকার নিচে পড়ে থাকে।

 

এই অভিযোগগুলো প্রমাণ করা কঠিন হলেও বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, “যোগাযোগ” ও “প্রভাব” ছাড়া দ্রুত শুনানি পাওয়া কঠিন। এতে আদালতের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, কজলিস্ট প্রণয়নে যদি স্বচ্ছ ডিজিটাল পদ্ধতি, নির্দিষ্ট নীতিমালা ও স্বয়ংক্রিয় অগ্রাধিকার ব্যবস্থা চালু করা যায়, তাহলে অনিয়ম অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

 

“রামিসা” ঘটনার সামাজিক প্রতিফলন

 

সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত “রামিসা” হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তার বাবার বিচার না চাওয়ার বক্তব্য সামাজিকভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অনেকেই বিষয়টিকে শুধু আবেগগত প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলেও আমি মনে করি, এর পেছনে বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা ও অনিশ্চয়তার প্রশ্নও জড়িত থাকতে পারে।

 

একজন অসহায় পিতা যখন মনে করেন যে মামলা চালাতে বছরের পর বছর আদালতে ঘুরতে হবে, আর্থিক চাপ নিতে হবে, সামাজিক হয়রানি সহ্য করতে হবে এবং শেষ পর্যন্তও নিশ্চিত বিচার পাওয়া অনিশ্চিত- তখন অনেক পরিবার বিচার প্রক্রিয়া থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিতে চায়। উচ্চ আদালতে ভালভাবে মামলা চালাতে হলে একজন আইনজীবী কে কয়েক লক্ষ টাকা দিতে হয়, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব হয় না। শুধু একারণেই আশি শতাংশ মামলা তদবিরের অভাবে  খারিজ হয়ে যায়।

 

তাই,এ ধরনের মানসিকতা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ কোনো নাগরিক যদি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে যে আদালত তাকে কার্যকর ও সময়মতো বিচার দিতে পারবে, তাহলে আইনের শাসনের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পরে এবং পরেছে।

 

বিচার বিলম্বের সামাজিক প্রভাব

 

বিচারহীনতা বা বিলম্বিত বিচার শুধু একজন ব্যক্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না; এটি পুরো সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যেমন-

 

অপরাধীরা অনেক সময় শাস্তি এড়িয়ে যায়

 

ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন

 

সাধারণ মানুষ আইনের প্রতি শ্রদ্ধা হারায়

 

বিকল্প ও অনানুষ্ঠানিক “বিচার” প্রবণতা বাড়ে

 

অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়

 

 

একটি বহুল প্রচলিত কথা হলো- “Delayed justice is denied justice” অর্থাৎ বিলম্বিত বিচার মানেই বিচার না পাওয়া। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই কথাটি ক্রমেই বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।

 

জনআস্থার সংকট

 

বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। কিন্তু যখন মানুষ দেখে যে ক্ষমতাবানদের মামলা দ্রুত এগোয় অথচ সাধারণ মানুষের মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, তখন বৈষম্যের অনুভূতি তৈরি হয়।

 

বর্তমানে অনেক মানুষ আদালতে যাওয়ার আগেই মনে করেন যে মামলা মানেই দীর্ঘ ভোগান্তি, বিপুল খরচ এবং অনিশ্চিত ফলাফল। ফলে কেউ কেউ আইনি লড়াই থেকে সরে আসেন, আবার কেউ আপস বা সামাজিক চাপে সমাধান খোঁজেন।

 

রামিসার বাবার বক্তব্যকে অনেকে এই বৃহত্তর হতাশা ও অনাস্থার প্রতীক হিসেবেও দেখছেন। বিচার পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা, মামলার ব্যয় এবং অনিশ্চয়তা সাধারণ মানুষকে মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তুলছে।

 

করণীয়

 

বিচার বিভাগের প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধারে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের ওপর জোর দেয়া-

 

১. বিচারক সংখ্যা বৃদ্ধি

 

মামলার তুলনায় বিচারক সংখ্যা কম হওয়ায় দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব হচ্ছে না। নতুন বিচারক নিয়োগ জরুরি।

 

২. ডিজিটাল কজলিস্ট ব্যবস্থা

 

স্বচ্ছ ও স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল কজলিস্ট চালু করলে মানুষের হস্তক্ষেপ ও দুর্নীতির সুযোগ কমবে।

 

৩. অপ্রয়োজনীয় মুলতবি কমানো

 

একই মামলায় বারবার সময় দেওয়ার সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় হত্যা এবং ধর্ষণ মামলায় টাইমফ্রেম করে দেয়া। নিম্ন আদালতে সাজা হলে চুড়ান্ত রায়ের আগে জামিন না দেয়া।

 

৪. জবাবদিহিতা বৃদ্ধি

 

আদালত প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও মনিটরিং জোরদার করতে হবে।

 

৫. বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি

 

ছোট ও দেওয়ানি বিরোধে মধ্যস্থতা ও সালিশি ব্যবস্থাকে কার্যকর করলে উচ্চ আদালতের চাপ কমবে।

 

উপসংহার

 

বাংলাদেশের বিচার বিভাগ এখনও দেশের মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে দীর্ঘসূত্রিতা, মামলা জট, কজলিস্ট নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ এবং বিচার পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা জনমনে হতাশা তৈরি করেছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তার কার্যকারিতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও সমান জরুরি।

 

রামিসার বাবার মতো একজন শোকাহত পিতার বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে অনাগ্রহ কেবল ব্যক্তিগত বেদনার প্রকাশ নয়; এটি বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের কমে যাওয়া আস্থারও একটি প্রতীক হিসেবে দেখা যেতে পারে। সময়োপযোগী সংস্কার, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা গেলে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব। অন্যথায় বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের হতাশা আরও গভীর হতে পারে, অপরাধ প্রবনতা দিনকে দিন বৃদ্ধি পাবে। যা রাষ্ট্র ও গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হবে।

লেখক: আহবায়ক, গ্রামডাক্তার কল্যাণ সমিতি, মহিপুর থানা শাখা, পটুয়াখালী।

বাংলাদেশ সময়: ১৬:০৭:২৮ ● ৭৬ বার পঠিত