রবিবার ● ২৬ এপ্রিল ২০২৬
নেছারাবাদে দুই পা ও এক হাতবিহীন নবজাতকের জন্ম, বাবার প্রত্যাখ্যান
হোম » পিরোজপুর » নেছারাবাদে দুই পা ও এক হাতবিহীন নবজাতকের জন্ম, বাবার প্রত্যাখ্যান

সাগরকন্যা প্রতিবেদক, নেছারাবাদ (পিরোজপুর)
পৃথিবীর আলো দেখার সঙ্গে সঙ্গেই যে শিশুটি পেল না পিতার স্বীকৃতি, সেই নবজাতককে বুকের গভীরে জড়িয়ে নিয়েই মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন মা। জন্মগত শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়েই জন্ম নেওয়া সন্তানকে পরিত্যাগের প্রস্তাব এলেও তা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি।
গত বুধবার (২২ এপ্রিল) রাত আটটার দিকে নেছারাবাদ উপজেলার মিয়ারহাট বন্দরের নিউ সততা প্রাইভেট হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেন লিজা আক্তার। জন্মের পর দেখা যায়, শিশুটি দুই পা ও একটি হাত ছাড়াই পৃথিবীতে এসেছে। অন্য হাতের একটি আঙ্গুলও কম রয়েছে।
নবজাতকের জন্মের খবর পেয়ে পিতা, দিনমজুর আলআমীন, শিশুটিকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। এমনকি স্ত্রীকে শিশুটিকে অন্যত্র দিয়ে দেওয়া বা ফেলে আসার পরামর্শও দেন, জানিয়েছেন মা। তবে স্বামীর এমন নিষ্ঠুরতার মুখেও ভেঙে পড়েননি লিজা আক্তার। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, কোনো অবস্থাতেই তিনি তার সন্তানকে পরিত্যাগ করবেন না।
নবজাতকের মা লিজা আক্তারের বাড়ি পাশ্ববর্তী নাজিরপুর উপজেলার কলারদোয়ানিয়া গ্রামে। এটি তার তৃতীয় সন্তান; এর আগে একটি ছেলে ও একটি মেয়ে রয়েছে। জীবিকার তাগিদে তিনি ঢাকায় দিনমজুরের কাজ করতেন এবং সন্তানসম্ভবা অবস্থায় কয়েকদিন আগে বাড়িতে ফেরেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে লিজা আক্তার বলেন, ‘আমার সন্তান অন্য শিশুদের মতো স্বাভাবিক নয়। তার দুই পা ও একটি হাত নেই। এজন্য তার বাবা তাকে ফেলে দিতে বলেছে। কিন্তু আমি আমার সন্তানকে কখনো ফেলে দিতে পারব না। স্বামী না রাখলেও আমি সন্তানকে ছাড়ব না। আমি তাকে মানুষ করে তুলব।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি যতদিন বেঁচে আছি, কাজ করে সন্তানকে খাওয়াতে পারব। কিন্তু আমার পরে তার কী হবে, এই চিন্তাই আমাকে কষ্ট দেয়। কোনো সহৃদয় ব্যক্তি যদি সাহায্যের হাত বাড়ান, তাহলে আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ কিছুটা নিরাপদ হতে পারে।’
এদিকে মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। নবজাতক ও তার মায়ের আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় সিজারিয়ান অপারেশনসহ সব চিকিৎসা ব্যয় মওকুফ করা হয়েছে। হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. গোলাম মোস্তফা জানান, মানবিক কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অপারেশন পরিচালনাকারী চিকিৎসক ডা. প্রীতিষ বিশ্বাস সাগরকন্যাকে বলেন, জিনগত কারণ বা গর্ভকালীন যথাযথ চিকিৎসার অভাবে অনেক সময় এ ধরনের শিশু জন্ম নিতে পারে। অপারেশনটি ঝুঁকিপূর্ণ হলেও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং মানবিক বিবেচনায় কোনো সার্জন ফি নেওয়া হয়নি।
ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। পিতার নির্মম আচরণ যেমন সমালোচিত হচ্ছে, তেমনি মায়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, সাহস ও মানবিকতা স্পর্শ করছে মানুষের হৃদয়।
বাংলাদেশ সময়: ১৫:২৫:০২ ● ২৭ বার পঠিত
