মঙ্গলবার ● ১৭ মার্চ ২০২৬

ঈদ: সার্বজনীনতা ও আমার ভাবনা

হোম পেজ » মুক্তমত » ঈদ: সার্বজনীনতা ও আমার ভাবনা
মঙ্গলবার ● ১৭ মার্চ ২০২৬


মো. বেল্লাল হাওলাদার

মো. বেল্লাল হাওলাদার

ঈদ আসে আনন্দের বার্তা নিয়ে- পবিত্রতা, ভালোবাসা ও ভাগাভাগির এক অনন্য আহ্বান হিসেবে। নতুন পোশাকের সঙ্গে পরিবারের সবার মুখে ফোটে হাসি, আর ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের উচ্ছ্বাস। ছোট-বড় নির্বিশেষে এই আনন্দ যেন ছুঁয়ে যায় প্রতিটি হৃদয়কে।

 

শৈশবের ঈদ ছিল অন্যরকম উচ্ছ্বাসে ভরা। ঈদের আগের দিনগুলোতে বাজারের ভিড়, দর্জির ব্যস্ততা আর ঘরের প্রস্তুতি মিলিয়ে তৈরি হতো এক বিশেষ আবহ। সেই স্মৃতির কেন্দ্রে আছেন আমার বাবা। তিনি নিজের জন্য কখনো নতুন পোশাক কিনতেন না, কিন্তু আমাদের জন্য সামর্থ্যের সবটুকু উজাড় করে দিতেন। নতুন জামা পেয়ে আমরা যখন আনন্দে আত্মহারা, তখন তিনি হয়তো পুরোনো পাঞ্জাবিতেই ঈদের নামাজে যেতেন। তবু তাঁর মুখে থাকত তৃপ্তির হাসি- সন্তানদের আনন্দেই যে একজন বাবার পরিপূর্ণতা।

 

ঈদের সকাল মানেই এক পবিত্র প্রস্তুতি- ভোরে গোসল, নতুন পোশাক, নামাজের অপেক্ষা। ঘরে মায়ের ব্যস্ততা, সেমাই, ফিরনি ও পায়েসের আয়োজন, অতিথি আপ্যায়নের প্রস্তুতি- সব মিলিয়ে যেন এক আনন্দময় পরিবেশ। নামাজ শেষে পরিবার নিয়ে একসঙ্গে খাওয়া, আত্মীয়স্বজনের বাড়ি বেড়ানো, ছোটদের সালামি দেওয়া- দিনটি পরিণত হতো এক প্রাণবন্ত উৎসবে।

 

একসময় ঈদ মানেই ছিল সামাজিক বন্ধনের উজ্জ্বল প্রকাশ। প্রতিবেশী থেকে আত্মীয়- সবাই ছিল এই আনন্দের অংশীদার। বাড়ি বাড়ি যাতায়াত, আন্তরিক আপ্যায়ন, গল্প-আড্ডা- এসবের মধ্যেই তৈরি হতো সম্পর্কের উষ্ণতা। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই চিত্র অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। এখন ঈদের আনন্দ অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিকেন্দ্রিক, সীমাবদ্ধ নিজস্ব পরিসরে। প্রতিবেশী-সম্পর্কের সেই আন্তরিকতাও ক্রমে কমে এসেছে।

 

আজ আমি নিজেও সংসারের দায়িত্বে জড়িত। ঈদ এলে বাজার করা, পরিবারের সবার জন্য কেনাকাটা, ঘরের আয়োজন- সবকিছুতেই ব্যস্ততা। নিজের জন্য কিছু কেনার চেয়ে এখন বেশি আনন্দ পাই প্রিয়জনদের জন্য কিছু করতে পারায়। তাদের মুখে হাসি দেখলেই মনে হয়- এটাই ঈদের প্রকৃত অর্থ। তখন বাবার সেই তৃপ্তিময় হাসির গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

 

তবে এই আনন্দ সবার জীবনে সমানভাবে ধরা দেয় না। ঈদ এলেই সমাজে ধনী-গরিবের ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে ঝলমলে শপিংমল, অন্যদিকে অভাবের নীরব বাস্তবতা। দিনমজুর, ভ্যানচালক বা কৃষকের জন্য সন্তানের নতুন পোশাকের ব্যবস্থা করাই হয়ে ওঠে কঠিন সংগ্রাম। সন্তানের ছোট্ট আবদার অনেক সময় তাদের হৃদয়ে নীরব বেদনার জন্ম দেয়।

 

ঈদের সময় অনেক দরিদ্র পরিবার নিজেকে গুটিয়ে রাখে। লজ্জা বা সংকোচে তারা আনন্দের অংশ হতে পারে না। এই বৈষম্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি আমাদের সামাজিক সংবেদনশীলতারও এক পরীক্ষা।

 

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ঈদুল ফিতর আমাদের শেখায় সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ। যাকাত ও ফিতরার মাধ্যমে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে নির্দেশনা রয়েছে, তা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে ঈদের আনন্দ সত্যিই সর্বজনীন হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় আভিজাত্যের প্রদর্শনই প্রাধান্য পায়।

 

আমরা যদি প্রত্যেকে সামর্থ্য অনুযায়ী অন্তত একজন অসচ্ছল মানুষের পাশে দাঁড়াই, তাহলে বহু পরিবারে ঈদের আনন্দ পৌঁছে যেতে পারে। একটি শিশুর হাতে নতুন পোশাক তুলে দেওয়া কিংবা একটি পরিবারের জন্য সামান্য খাবারের ব্যবস্থা করা- এগুলো হয়তো বড় কিছু নয়, কিন্তু যাদের কিছুই নেই, তাদের জন্য তা হতে পারে অমূল্য আনন্দ।

 

ঈদের মূল শিক্ষা হলো ভাগাভাগি, সহমর্মিতা ও মানবিকতা। এই মূল্যবোধ হৃদয়ে ধারণ করতে পারলে সমাজে বৈষম্য কমবে, বাড়বে মানুষের প্রতি মানুষের টান। তখন হয়তো একদিন ঈদের সকাল সত্যিই সবার জন্য সমান আনন্দের বার্তা নিয়ে আসবে- যেখানে কোনো শিশুর চোখে থাকবে না বঞ্চনার অশ্রু, আর প্রতিটি ঘরে ফুটবে হাসি।

 

লেখক, সাংবাদিক ও সংগঠক

বাংলাদেশ সময়: ১৬:১৩:০০ ● ৩৩ বার পঠিত