বৃহস্পতিবার ● ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

হুমকিতে দীর্ঘমেয়াদি কৃষি উৎপাদন অতিরিক্ত রাসায়নিক সারে বিপন্ন বাউফলে চরাঞ্চলের মাটি

হোম পেজ » ফিচার » হুমকিতে দীর্ঘমেয়াদি কৃষি উৎপাদন অতিরিক্ত রাসায়নিক সারে বিপন্ন বাউফলে চরাঞ্চলের মাটি
বৃহস্পতিবার ● ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬


 

হুমকিতে দীর্ঘমেয়াদি কৃষি উৎপাদন, অতিরিক্ত রাসায়নিক সারে বিপন্ন বাউফলের চরাঞ্চলের মাটি

সাগরকন্যা প্রতিবেদক, বাউফল (পটুয়াখালী)

তরমুজ চাষ লাভজনক হওয়ায় গত এক দশক ধরে উপকূলীয় পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার চরাঞ্চলে ব্যাপক হারে তরমুজ আবাদ বেড়েছে। তবে অধিক ফলনের আশায় অনেক চাষি সরকারের সুপারিশকৃত সার নীতিমালা উপেক্ষা করে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার করছেন। এতে মাটির স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদন হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সুপারিশ অনুযায়ী, এ অঞ্চলে প্রতি শতক তরমুজ চাষের জমিতে মোট ২ কেজি ৮৩১ গ্রাম রাসায়নিক সার এবং ২৮ কেজি জৈব সার ব্যবহারের কথা রয়েছে। এর মধ্যে ইউরিয়া ১ কেজি ২৮ গ্রাম, টিএসপি বা ডিএপি ৭২৯ গ্রাম, এমওপি ৬৪৮ গ্রাম, জিপসাম ৩৪০ গ্রাম, জিংক সালফেট ৬২ গ্রাম এবং বোরিক এসিড ২৪ গ্রাম। পাশাপাশি মাটির প্রাণ হিসেবে পরিচিত জৈব সার ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

 

কিন্তু মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। কৃষকদের একটি অংশ যেখানে প্রতি শতকে ২ কেজি ৮৩১ গ্রাম রাসায়নিক সার ব্যবহারের কথা, সেখানে ১০ থেকে ১২ কেজি পর্যন্ত প্রয়োগ করছেন। বিপরীতে জৈব সার প্রায় ব্যবহারই করা হচ্ছে না। এতে জমির জৈব উপাদান হ্রাস পাচ্ছে, মাটির স্বাভাবিক গঠন বিনষ্ট হচ্ছে এবং ফলন ধরে রাখতে ভবিষ্যতে আরও বেশি সারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন চাষিরা।

 

চরকালাইয়া গ্রামের তরমুজ চাষি আনোয়ার প্যাদা, মিলন গাজী, ইব্রাহিম ও জাকির প্যাদা সাগরকন্যার এ প্রতিবেদককে বলেন, তরমুজ চাষে সারই প্রধান উপাদান। তাঁদের ভাষ্য, যত বেশি সার দেওয়া হয় তত বেশি ফলন পাওয়া যায়। ভালো ফলনের জন্য প্রতি শতক জমিতে তাঁরা ১০ থেকে ১২ কেজি পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক সার ব্যবহার করেন বলেও জানালেন। চারা রোপণ থেকে ফল পরিপক্ব হওয়া পর্যন্ত চার ধাপে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি, এমওপিসহ বিভিন্ন সার প্রয়োগ করা হয়।

 

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়- এর মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মাদ আসাদুল হক বলেন, জমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে মাটির পিএইচ (অম্লতা) ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। এতে জৈব পদার্থ কমে যায়, পুষ্টি উপাদানের ভারসাম্য নষ্ট হয়, উপকারী অণুজীব ধ্বংস হয় এবং মাটির গঠন ভেঙে পড়ে। ফলে মাটি ধীরে ধীরে অনুর্বর হয়ে যায় এবং চাষাবাদের উপযোগিতা কমে আসে। তাঁর মতে, ক্ষতিগ্রস্ত জমিতে আমন ধানসহ অন্যান্য ফসলের ফলনও কমে যাচ্ছে।

 

বাউফল উপজেলার শৌলা গ্রামের কৃষক আফজাল মিয়া, চরমিয়াজান গ্রামের জলিল ফরাজি ও মমিনপুরের আলাল হোসেনসহ অন্তত ১৫ জন কৃষক জানান, আগে তাঁদের জমিতে আমন ধানের ফলন ভালো হতো। কয়েক বছর ধরে তরমুজ চাষে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের পর জমির অবস্থা বদলে গেছে। এখন তরমুজ চাষের পর ধান আবাদ করলে গাছ সবল দেখালেও আশানুরূপ ফলন হয় না। রবি মৌসুমে অন্যান্য ফসল আবাদেও সমস্যার মুখে পড়ছেন তাঁরা।

 

 

হুমকিতে দীর্ঘমেয়াদি কৃষি উৎপাদন, অতিরিক্ত রাসায়নিক সারে বিপন্ন বাউফলের চরাঞ্চলের মাটি

কৃষকদের অভিযোগ, তরমুজ ক্ষেতে ব্যবহৃত অতিরিক্ত রাসায়নিক সার জোয়ার বা বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে পাশের ডোবা-নালা ও খালে মিশে যায়। ওই পানি পান করে গবাদিপশু, বিশেষ করে মহিষ, অসুস্থ হয়ে পড়ে। সম্প্রতি উপজেলার কেশবপুর ইউনিয়নের চরমমিনপুর এলাকায় একটি কৃষক পরিবারের সাতটি মহিষ মারা যাওয়ার এবং চারটি অসুস্থ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলেও স্থানীয়রা জানান।

 

বাউফল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মিলন বলেন, অনেক কৃষক মনে করেন বেশি সার দিলে ফলনও বেশি হবে- এমন ধারণা থেকেই অতিরিক্ত সার ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে বাস্তবে এটি দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি জানান, কৃষি বিভাগ নিয়মিতভাবে কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে আসছে। মাঠপর্যায়ের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের নির্দেশনা মেনে সুষম সার ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন বজায় রাখা সম্ভব।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, তাৎক্ষণিক লাভের চেয়ে টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব না দিলে উপকূলীয় এই অঞ্চলের উর্বর জমি দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এখনই সচেতনতা বৃদ্ধি ও সুপারিশকৃত সারের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি বলেও মনে করছেন তাঁরা।

বাংলাদেশ সময়: ১২:০৫:১১ ● ২৫ বার পঠিত