মঙ্গলবার ● ৯ ডিসেম্বর ২০২৫
সংগ্রামে গড়া সফলতা ‘সফল জননী’ সম্মাননা পেলেন কলাপাড়ার মাহমুদা বেগম
হোম পেজ » লিড নিউজ » সংগ্রামে গড়া সফলতা ‘সফল জননী’ সম্মাননা পেলেন কলাপাড়ার মাহমুদা বেগম
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)
সংগ্রাম, ত্যাগ আর অটল মানসিকতা-এসবের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক জীবনের নাম মাহমুদা বেগম। কলাপাড়ার নীলগঞ্জ গ্রামের এই নারী বেগম রোকেয়া দিবসে উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে ‘সফল জননী’ হিসেবে সম্মাননা পেয়েছেন। মাত্র ১২ বছর বয়সে বিয়ে। নতুন সংসার, যৌথ পরিবার ও আট সন্তানের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে থেমে যায় তাঁর নিজের শিক্ষা জীবনের স্বপ্ন। তবুও থেমে থাকেননি। সন্তানদের শিক্ষিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই ছিল তাঁর একমাত্র লক্ষ্য।
সেই সংকল্পই আজ বাস্তবতাঃ
প্রথম সন্তান মো. মঞ্জুরুল হোসেন এসএসসি ও এইচএসসিতে রেকর্ড নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে এলএলবি ও এলএলএম সম্পন্ন করে ১৮তম বিসিএসে সহকারী জজ হিসেবে যোগ দেন। বর্তমানে আইন ও বিচার বিভাগের সলিসিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দ্বিতীয় পুত্র মো. মোস্তাক হোসাইন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে এটিএন বাংলায় ব্যবস্থাপক (অনুষ্ঠান) হিসেবে কর্মরত। তৃতীয় ছেলে মো. মুজাহিদ হোসাইন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। চতুর্থ ছেলে মো. মওদুদ হোসাইন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জন শেষে ‘অ্যাডভান্স বাংলাদেশ’র স্বত্বাধিকারী হিসেবে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। ছোট ছেলে মো. মেহেদী হোসাইন স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে উপ-ব্যবস্থাপক (হিসাব) পদে কর্মরত এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে সুপারিশপ্রাপ্ত কর আইনজীবী। ছেলেদের পাশাপাশি তাঁর কন্যারাও এগিয়ে। জ্যেষ্ঠ কন্যা মমতাজ মিলি পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে পরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দ্বিতীয় কন্যা মুর্শিদা জাহান সাথী ঢাকার একটি স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহকারী প্রধান শিক্ষক। কনিষ্ঠ কন্যা মেহবুবা মালা পড়াশোনা শেষে বর্তমানে সংসার করছেন। সন্তানদের এ সাফল্যের পেছনে ছিল এক নারীর নীরব সংগ্রাম- রাত জেগে পড়ানো, দিনের পর দিন না খেয়ে সন্তানদের আগলে রাখা, নিজের সব স্বপ্নকে সন্তানের ভবিষ্যতের কাছে উৎসর্গ করা।
আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টায় পটুয়াখালী শিল্পকলা একাডেমিতে বেগম রোকেয়া দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী তাঁর হাতে ‘সফল জননী’ সম্মাননা তুলে দেন। অনুষ্ঠানে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক শিরিন সুলতানা উপস্থিত ছিলেন। সম্মাননা পেয়ে আবেগাপ্লুত মাহমুদা বেগম বলেন, আমি নিজের জন্য কিছু করতে পারিনি। কিন্তু সন্তানদের জন্য স্বপ্ন দেখে গেছি। কত রাত যে নির্ঘুম কেটেছে, কত কষ্ট যে বুকের ভেতর জমেছে- তার হিসাব নেই। আজ সন্তানদের সাফল্যই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার। তবে আনন্দের মাঝেই রয়েছে বেদনার ছায়া। দুই বছর আগে তাঁর স্বামী মো. মোতাহার হোসেন মাতুব্বর ইন্তেকাল করেন। সরকারি চাকরিজীবী স্বামীটি জীবনভর তাঁর অনুপ্রেরণা ছিলেন বলে জানান তিনি। এ বিষয়ে জ্যেষ্ঠ পুত্র মঞ্জুরুল হোসেন বলেন, আমাদের অর্জনের পেছনে মায়ের অশেষ ত্যাগ। তিনি আমাদের বাতিঘর। আমরা তাঁকে নিয়ে গর্বিত। মাহমুদা বেগমের এই যাত্রা শুধু একজন মায়ের গল্প নয়; এটি গ্রামবাংলার হাজারো সংগ্রামী নারীর প্রতিচ্ছবি- যেখানে ত্যাগই শক্তি, আর স্বপ্ন কখনো থেমে থাকে না।
এমবি/এমআর
বাংলাদেশ সময়: ১৯:৪৩:১৯ ● ২৩৮ বার পঠিত
