শনিবার ● ৭ নভেম্বর ২০২৬

বরগুনা হাসপাতালে চিকিৎসকের ৭৭ শতাংশ পদ শূন্য, ৪৭০ রোগীর ভরসা ১৪ জন

হোম » লিড নিউজ » বরগুনা হাসপাতালে চিকিৎসকের ৭৭ শতাংশ পদ শূন্য, ৪৭০ রোগীর ভরসা ১৪ জন
শনিবার ● ৭ নভেম্বর ২০২৬


 

বরগুনা হাসপাতালে চিকিৎসকের ৭৭ শতাংশ পদ শূন্য, ৪৭০ রোগীর ভরসা ১৪ জন

সাগরকন্যা প্রতিবেদক, বরগুনা

 

বরগুনার ১২ লাখ মানুষের প্রধান সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল। অথচ চিকিৎসক সংকটে হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবা কার্যত ভেঙে পড়েছে। চিকিৎসকের অনুমোদিত ৮৩টি পদের মধ্যে ৬৪টিই শূন্য। কর্মরত ১৯ জনের মধ্যে সরাসরি রোগী দেখছেন মাত্র ১৪ জন। অন্যদিকে ২৫০ শয্যার হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ৪৭০ রোগী। অতিরিক্ত রোগীর চাপ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব, পরীক্ষা-নিরীক্ষার সীমাবদ্ধতা ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সংকটে প্রতিদিনই বাড়ছে রোগীদের দুর্ভোগ। জটিল রোগীদের অনেককেই পাঠানো হচ্ছে বরিশাল কিংবা ঢাকায়। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ।

 

শনিবার (৭ নভেম্বর) হাসপাতালটিতে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৪৭০। নির্ধারিত শয্যার প্রায় দ্বিগুণ রোগীকে সীমিত জনবল দিয়ে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। অথচ সরকারি বরাদ্দে খাবার দেওয়া হচ্ছে মাত্র ২৫০ রোগীর জন্য। ফলে চিকিৎসার পাশাপাশি খাবার ও শয্যা নিয়েও ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীরা।

 

হাসপাতালের জনবল পরিস্থিতি অনুযায়ী, ১৭টি মেডিকেল অফিসার পদের মধ্যে শূন্য নয়টি। ২৮টি সহকারী সার্জন পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র তিনজন। সাতটি রেজিস্ট্রার পদের একটিতেও চিকিৎসক নেই। প্যাথলজিস্ট ও রেডিওলজিস্টের পদও শূন্য। অ্যানেসথেসিয়ার চারটি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র একজন।

 

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ২৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র পাঁচজন। তাঁদের কেউ অন্য হাসপাতালে সংযুক্ত, কেউ অনুপস্থিত, আবার কেউ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করছেন। অ্যানেসথেসিয়ার সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. আবু সালেহ পিরোজপুর সদর হাসপাতালে সংযুক্ত রয়েছেন। সার্জারির সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. মো. ইউসুফ হারুন অননুমোদিতভাবে অনুপস্থিত রয়েছেন বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। মেডিসিনের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. মো. আশিকুর রহমানকে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছে। বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি কিছুদিন আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সঙ্গে কথা বলেও সমস্যার সমাধান করতে পারেননি।

 

প্যাথলজিস্ট ও রেডিওলজিস্ট না থাকায় হাসপাতালের পরীক্ষা-নিরীক্ষার কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। সুভাষ দত্ত নামের একজন প্যাথলজিস্ট ও রেডিওলজিস্ট থাকলেও তাঁকে সিভিল সার্জন কার্যালয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কেন তাঁকে হাসপাতাল থেকে সরিয়ে সেখানে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তা জানেন না হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক। সংশ্লিষ্টদের মতে, তাঁকে হাসপাতালে ফিরিয়ে আনা গেলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সংকট কিছুটা কমতে পারে।

 

জরুরি বিভাগেও চিকিৎসক সংকট রয়েছে। সেখানকার মেডিকেল অফিসার ডা. আশফাকুর রহমান ও ডা. মো. আব্দুল করিম কোর্সের পরীক্ষায় অংশ নিতে ঢাকায় যাচ্ছেন। এতে জরুরি চিকিৎসাসেবা পরিচালনায় চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 

চিকিৎসকের পাশাপাশি নার্স ও অন্যান্য কর্মচারীর সংকটও প্রকট। নার্সের অনুমোদিত ১০৮টি পদের বিপরীতে কর্মরত ৯৭ জন। তাঁদের মধ্যে ৩৪ জন শিক্ষা ছুটি, মাতৃত্বকালীন ছুটি ও প্রেষণে রয়েছেন। ফলে সরাসরি রোগীসেবায় নিয়োজিত আছেন মাত্র ৬৩ জন। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. রেজওয়ানুর আলমের মতে, স্বাভাবিক সেবা নিশ্চিত করতে অন্তত ২০০ নার্স প্রয়োজন।

 

তৃতীয় শ্রেণির ৫২টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১৫ জন। চতুর্থ শ্রেণির ২০টি পদের মধ্যে শূন্য আটটি। অন্য স্থান থেকে প্রেষণে আনা সাতজন কর্মীকেও গত মাসে নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা, ওয়ার্ড ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য সেবা কার্যক্রমেও চাপ তৈরি হয়েছে।

 

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা একাধিক রোগী বলেন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেও যদি বরিশালে যেতে হয়, তাহলে দরিদ্র মানুষের দুর্ভোগের শেষ থাকে না। চিকিৎসকের অভাবে তাঁরা প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়ছেন। তাঁদের অভিযোগ, জরুরি বিভাগে রোগী এলে কর্মরত চিকিৎসক তড়িঘড়ি করে বরিশালে পাঠিয়ে দেন। এতে চিকিৎসার দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

 

বরগুনা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি হাসান ঝন্টু বলেন, শুধু চিকিৎসক সংকট নয়, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবেও রোগীরা ভোগান্তিতে পড়ছেন। বরগুনায় কখনো ডেঙ্গু, কখনো হাম, আবার কখনো ডায়রিয়ার রোগীর চাপ বাড়ছে। একই জনবল দিয়ে এসব রোগীর চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। সম্প্রতি হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড খোলা হলেও জায়গার সংকটে হাম ও ডায়রিয়ার রোগীদের পাশাপাশি চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

 

তিনি বলেন, হাসপাতালটিতে হামের পরীক্ষা হয় না। নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠাতে হয়। ফলে রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগছে। এ ছাড়া নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) না থাকায় সংকটাপন্ন রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র পাঠাতে হচ্ছে। অপারেশনের সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও গর্ভবতী নারীদের অস্ত্রোপচার হচ্ছে না।

 

গণমাধ্যমকর্মী মুশফিক আরিফ বলেন, সামান্য জটিলতা দেখা দিলেই রোগীদের অন্যত্র পাঠানো হচ্ছে। গত ২৫ অক্টোবর সংকট মোকাবিলায় তিনজন জুনিয়র কনসালট্যান্টকে বরগুনায় পদায়ন করা হয়েছিল। তাঁদের একজন ডা. সুমন কুমার দাস। কিন্তু ২৯ অক্টোবর মন্ত্রণালয় তাঁর পদায়নের আদেশ বাতিল করে। এতে হাসপাতালের চিকিৎসক সংকট নিরসনের উদ্যোগও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

 

বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ বলেন, চিকিৎসক সংকটের বিষয়টি সত্য। শূন্য পদে দ্রুত চিকিৎসক পদায়নের জন্য প্রতি মাসে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে নতুন চিকিৎসক এলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

 

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. রেজওয়ানুর আলম বলেন, বহির্বিভাগে একজন চিকিৎসককে প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২০০ রোগী দেখতে হচ্ছে। এত রোগীকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। জনবল সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে।

 

তিনি জানান, ২০১০ সালে হাসপাতালটি ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। কিন্তু সেই অনুপাতে চিকিৎসক ও অন্যান্য জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি। চিকিৎসকের অভাবে রোগীদের অন্যত্র পাঠিয়ে দিতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ সময়: ১৮:১৩:৪৪ ● ৩৩ বার পঠিত