বৃহস্পতিবার ● ২৯ অক্টোবর ২০২৬
ঋণের চাপেই দুই মেয়েকে হত্যা করে মায়ের আত্মহত্যা, পুলিশের ধারণা
হোম » বরগুনা » ঋণের চাপেই দুই মেয়েকে হত্যা করে মায়ের আত্মহত্যা, পুলিশের ধারণা
![]()
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, বরগুনা
বরগুনা জেলা পরিষদের ডাকবাংলোয়ে মা ও দুই মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় চার লাখ টাকার বেশি ঋণ এবং পারিবারিক আর্থিক সংকটের তথ্য সামনে এনেছে পুলিশ। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, ঋণের কিস্তি পরিশোধের দুশ্চিন্তা থেকে দুই মেয়েকে হত্যা করে আত্মহত্যা করেছেন মা ইতি রানী বিশ্বাস (৩৪)। তবে মামলার বাদী ও ইতি রানীর স্বামী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাসের দাবি, তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়েকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেল পাঁচটায় সংবাদ সম্মেলনে তদন্তের এসব তথ্য জানান বরগুনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মুকিত হাসান খান।
পুলিশ জানায়, গত ৩ মার্চ বরগুনা জেলা পরিষদের ডাকবাংলার তৃতীয় তলার দুটি কক্ষ থেকে ইতি রানী ও তাঁর দুই মেয়ে আরাধ্যা বিশ্বাস (১২) ও অনুরাধা বিশ্বাসের (৩) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ওই দিন সকালে দুই মেয়েকে নিয়ে ডাকবাংলায় পরিচ্ছন্নতার কাজে গিয়েছিলেন ইতি রানী। এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে বরগুনা সদর থানায় হত্যা মামলা করেন দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস।
সিসিটিভি ফুটেজে ২২ মিনিটের ঘটনাপ্রবাহ
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ডাকবাংলার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ঘটনার দিন সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে দুই মেয়েকে নিয়ে সেখানে প্রবেশ করেন ইতি রানী। পরে তৃতীয় তলায় গিয়ে সকাল ১০টা ৫০ মিনিট ৪৭ সেকেন্ডে একটি কক্ষে প্রবেশ করে বড় মেয়ে আরাধ্যা। কিছুক্ষণ পর ছোট মেয়ে অনুরাধাকে অন্য একটি কক্ষে রেখে ওই কক্ষে যান ইতি রানী।
ফুটেজে আরও দেখা যায়, সকাল ১১টা ১৩ মিনিট ২৩ সেকেন্ডে ইতি রানী প্রথম কক্ষ থেকে বেরিয়ে তিন সেকেন্ড পর অন্য কক্ষে প্রবেশ করেন। এরপর তাঁদের কাউকেই জীবিত অবস্থায় কক্ষ থেকে বের হতে দেখা যায়নি।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, এই সময়ের মধ্যে কোমল পানীয় বা খাবার পানির সঙ্গে চেতনানাশক ওষুধ মিশিয়ে দুই মেয়েকে পান করানোর পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। পরে নিজেও চেতনানাশক ওষুধ সেবন করে আত্মহত্যা করেন ইতি রানী।
ময়নাতদন্তে দুই শিশুকে হত্যার তথ্য
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসকদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ইতি রানীর মৃত্যুর কারণ হিসেবে বেঞ্জোডায়াজেপিন-জাতীয় রাসায়নিকের বিষক্রিয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর মৃত্যু আত্মহত্যাজনিত বলে মত দিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
অন্যদিকে, দুই শিশুর মৃত্যুর কারণ হিসেবে একই ধরনের রাসায়নিকের বিষক্রিয়ার পাশাপাশি আঘাতজনিত শ্বাসরোধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের মৃত্যু হত্যাজনিত বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা। তিনজনের কারও ক্ষেত্রে ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
ঋণ ৪ লাখ ৭ হাজার ৭২৩ টাকা
তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, ইতি রানী পাঁচটি এনজিও থেকে ২ লাখ ২৭ হাজার ৭২৩ টাকা এবং তাঁর স্বামী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস একটি এনজিও থেকে ৮০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। এ ছাড়া অনিল রায় ও বাবুল রায়ের কাছ থেকে ধার নেওয়া হয়েছিল এক লাখ টাকা। সব মিলিয়ে তাঁদের ঋণের পরিমাণ ৪ লাখ ৭ হাজার ৭২৩ টাকা।
দুলাল চন্দ্র পেশায় সুপারি ব্যবসায়ী ও দর্জি। ছোট টেইলারিংয়ের দোকান এবং সীমিত সুপারির ব্যবসা থেকে সংসারের খরচ চালানো কঠিন ছিল। প্রায় ৩০ বছর আগে নদীভাঙনে তাঁদের বসতভিটা বিলীন হয়ে যায়। এরপর থেকে তাঁরা সরকারি জায়গায় বসবাস করছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ঋণের কিস্তি পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতেন ইতি রানী। সংসারের আর্থিক সংকট কাটাতে মৃত্যুর প্রায় দুই মাস আগে মাসিক তিন হাজার টাকা বেতনে ডাকবাংলায় পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। এসব কারণে তিনি হতাশায় ভুগছিলেন বলে পুলিশের ধারণা।
‘স্ত্রী ও দুই সন্তানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে’
তবে পুলিশের এ ধারণার সঙ্গে একমত নন মামলার বাদী দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস। তিনি বলেন, “ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আমরা এখনো হাতে পাইনি। তাতে কী লেখা এসেছে, তাও জানি না। ঋণের কারণে আমার স্ত্রী দুই সন্তানকে মেরে ফেলবে, তা হতে পারে না। আমার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার চাই।”
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মুকিত হাসান খান জানান, মামলার আলামত, সাক্ষ্যপ্রমাণ, সিসিটিভি ফুটেজ ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা। খুব শিগগিরই আদালতে মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
বাংলাদেশ সময়: ২১:৫১:৪০ ● ৩১ বার পঠিত
