নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও বরিশালে প্রতিদিন ৪ কোটি টাকার ইলিশ বেচাকেনা!

হোম » বরিশাল » নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও বরিশালে প্রতিদিন ৪ কোটি টাকার ইলিশ বেচাকেনা!
রবিবার ● ১৮ অক্টোবর ২০২৬


নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও বরিশালে প্রতিদিন ৪ কোটি টাকার ইলিশ বেচাকেনা!সাগরকন্যা প্রতিবেদক, বরিশাল

 

বরিশালের মেঘনা নদীতে মা ইলিশ রক্ষায় অভিযান চলছে। অন্যদিকে দুর্গম চর ও মোহনায় দিনরাত চলছে ইলিশ শিকার। ছোট-বড় ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে ধরা এসব মাছ নদীতীরের বিভিন্ন ঘাটে নিলামে বিক্রি হচ্ছে। পরে স্পিডবোট ও ট্রলারে করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হচ্ছে।

 

স্থানীয় জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীদের দাবি, বরিশালের হিজলা উপজেলার আটটি ঘাটে প্রতিদিন সাড়ে তিন থেকে চার কোটি টাকার ইলিশ কেনাবেচা হচ্ছে। তাঁদের ভাষ্য, হিজলাকে কেন্দ্র করে মেঘনার এই অংশে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে মা ইলিশ শিকার, কেনাবেচা ও পাচারের একটি বড় চক্র সক্রিয় রয়েছে।

 

গত বুধবার সকালে হিজলার বাউশিয়া লঞ্চঘাট, পুরোনো হিজলা নদীর পাড়, দুর্গাপুর, হরিনাথপুর ও আবুপুর এলাকায় গিয়ে কয়েকটি অস্থায়ী হাটে ইলিশ বিক্রি হতে দেখা যায়।

 

গত ৮ অক্টোবর থেকে মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়েছে। হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার মেঘনা ও এর শাখা নদ-নদী দেশের গুরুত্বপূর্ণ ইলিশ অভয়াশ্রমের অন্তর্ভুক্ত। তবে নিষেধাজ্ঞা শুরুর পর অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে দুই দফা হামলার ঘটনা ঘটেছে।

 

অভিযানের দ্বিতীয় দিন হিজলা-গৌরবদী ইউনিয়নের ওরাকল বাজারের ৭ নম্বর ঘাটসংলগ্ন মেঘনা নদীতে অভিযান চালাতে গিয়ে হামলার শিকার হন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমানসহ অভিযানের দলের সদস্যরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোস্টগার্ড সদস্যরা ১১টি ফাঁকা গুলি ছোড়েন।

 

গত বৃহস্পতিবার অভিযানকারী আরেকটি দলের ওপর হামলা হয়। এ সময় জেলেদের ছোড়া ইটের আঘাতে দলের সঙ্গে থাকা এক শ্রমিক মাথায় গুরুতর আঘাত পান।

 

দুর্গম চর ও মোহনায় সক্রিয় জেলেরা

 

জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, মেঘনার জানপুর, খালিশপুর ও চরকিল্লা অবৈধভাবে ইলিশ শিকার ও বিক্রির প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া হিজলার হরিনাথপুর ইউনিয়নের আবুপুর সড়কের মোড়ে ছোট নৌকায় ধরা ইলিশ বিক্রির অস্থায়ী হাট বসে।

 

তাঁদের দাবি, এসব এলাকা দুর্গম এবং কয়েকটি জেলার মোহনা হওয়ায় অভিযানের ক্ষেত্রে সীমানাজটিলতা তৈরি হয়। কোনো একটি জেলার প্রশাসন অভিযান চালাতে গেলে এই জটিলতার সুযোগ নেয় অবৈধভাবে মাছ শিকার করা ব্যক্তিরা। এ সুযোগে অন্তত দুই হাজার জেলে বড় ট্রলার নিয়ে দিনরাত ইলিশ ধরছেন বলে তাঁদের দাবি।

 

প্রতিটি ট্রলারে ২০ থেকে ৩০ জন জেলে থাকেন। অভিযানকারী দলের হাত থেকে বাঁচতে অনেক ট্রলারে দুই থেকে তিনটি ইঞ্জিন লাগানো হয়েছে। স্থানীয়ভাবে এসব ট্রলার ‘ফাইটার’ নামে পরিচিত।

 

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সংঘবদ্ধ জেলেরা অভিযানকারী দলকে দেখেই পালিয়ে যান না; বরং ইট-পাথর, বাঁশ, লাঠি ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা করেন। লাঠির মাথায় কাপড় পেঁচিয়ে পেট্রল ঢেলে আগুনের গোলা বানিয়ে ছোড়ার অভিযোগও রয়েছে।

 

জানপুর ও আবুপুরের ছয় জেলে জানান, আশুলি আবুপুর, আবুপুর ও হরিনাথপুর এলাকার মেঘনার শাখা নদীগুলোতেও কয়েক শ ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ইলিশ ধরা হচ্ছে। এসব নৌকায় দুটি করে ইঞ্জিন বসানো হয়েছে।

 

জেলেদের হিসাব অনুযায়ী, একটি ছোট নৌকায় প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকার ইলিশ ধরা পড়ে। বড় ট্রলারে ধরা পড়ে দেড় থেকে দুই লাখ টাকার মাছ।

 

তিনটি অভয়াশ্রমের বড় অংশে শিকার

 

মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বরিশাল সদর উপজেলার কালাবদর নদের হবিনগর থেকে মেহেন্দীগঞ্জের বামনীরচর পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার, মেহেন্দীগঞ্জের গজারিয়া নদীর হাট থেকে হিজলা লঞ্চঘাট পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার এবং হিজলার মৌলভীর হাট থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম জাঙ্গালিয়া পর্যন্ত ২৬ কিলোমিটার এলাকা ইলিশের অভয়াশ্রম হিসেবে নির্ধারিত। ২০১৯ সালে এটি দেশের ষষ্ঠ ইলিশ অভয়াশ্রম হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়।

 

জেলেদের দাবি, অভয়াশ্রমের বড় অংশে ইলিশ শিকারের নিয়ন্ত্রণ হিজলাকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে। তাঁদের ভাষ্য, শুধু জানপুরেই অন্তত ২০টি মাছঘাট রয়েছে।

 

এই তিন এলাকার ঘাট নিয়ন্ত্রণকারীদের এক প্রতিনিধির দাবি, নিষেধাজ্ঞার সময় এসব ঘাটে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার ইলিশ কেনাবেচা হয়। এ ছাড়া আবুপুরের অস্থায়ী বাজারে আরও ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার মাছ বিক্রি হয়।

 

ওই প্রতিনিধির ভাষ্য, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, চাঁদপুর ও নোয়াখালীসহ বিভিন্ন এলাকার অন্তত ২৫০ জন পাইকার সেখানে অবস্থান করেন। ঘাটে মাছ বিক্রির ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দিতে হয় বলেও তিনি জানান।

 

ঘাটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নাম

 

স্থানীয় জেলে, মাছ ব্যবসায়ী ও বিএনপির কয়েকজন নেতার ভাষ্য, আগে এসব ঘাট নিয়ন্ত্রণ করতেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও হিজলা-গৌরবদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঘাটগুলোর নিয়ন্ত্রণ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবদুল গাফফার তালুকদারের হাতে যায়। গত বছর তাঁর মৃত্যুর পর ঘাটগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আলতাফ হোসেন ওরফে খোকন দপ্তরি, সদস্যসচিব দেওয়ান মনির হোসেন এবং গাফফার তালুকদারের দুই ছেলে বলে তাঁদের দাবি।

 

তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জানপুর, খালিশপুর ও চরকিল্লায় দেওয়ান মনিরের দুটি, আলতাফ হোসেনের তিনটি এবং গাফফার তালুকদারের দুই ছেলের দুটি ঘাটে ইলিশ কেনাবেচা হয়। আবুপুরের ঘাটের নিয়ন্ত্রণ বরিশাল জেলা যুবদলের এক নেতা এবং হরিনাথপুর ইউনিয়ন বিএনপির এক শীর্ষ নেতার হাতে বলেও তাঁরা দাবি করেন।

 

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আলতাফ হোসেন ও দেওয়ান মনির হোসেন।

 

আলতাফ হোসেন বলেন, তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও ইলিশ শিকারের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগেই তাঁর ঘাট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। জেলেরা প্রশাসনের সঙ্গে বেপরোয়া আচরণ করছেন। প্রশাসনের ব্যর্থতার কারণেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না বলে তিনি দাবি করেন।

 

দেওয়ান মনির হোসেন বলেন, নিষেধাজ্ঞার আগেই তাঁর ঘাট বন্ধ করা হয়েছে। তাঁরা প্রশাসনকে সহায়তা করছেন।

 

অভিযান পরিচালনায় বরাদ্দ ও জনবলসংকট

 

হিজলা উপজেলা মৎস্য বিভাগের একটি সূত্র জানায়, এত বড় এলাকায় নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের জন্য বরাদ্দ মাত্র দেড় লাখ টাকা। এই অর্থ দিয়ে তিন-চার দিনের বেশি অভিযান চালানো কঠিন। ফলে শুরুতে অভিযান জোরালো থাকলেও পরে তা সীমিত হয়ে পড়ে।

 

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান বরাদ্দসংকটের কথা স্বীকার করে গণমাধ্যমকে বলেন, তাঁরা প্রতিদিন অভিযান পরিচালনা করছেন। কিন্তু বিপুলসংখ্যক জেলে ও বড় ট্রলারের তুলনায় অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল তাঁদের নেই।

 

বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ সহকারী পরিচালক মো. আনিসুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, একটি বড় চক্র অবৈধভাবে ইলিশ শিকার করছে। কোস্টগার্ড ও নৌ পুলিশের সহায়তায় অভিযান চলছে। তবে জনবল কম এবং এলাকাটি দুর্গম হওয়ায় অভিযান পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ছে।

 

তিনি বলেন, জেলেরা বেপরোয়া হওয়ায় রাতে অভিযান চালাতে সংশ্লিষ্টদের ভয় কাজ করে। নৌবাহিনীকে অভিযানে যুক্ত করতে না পারলে এই চক্রকে ঠেকানো কঠিন হবে বলে তিনি মনে করেন।

বাংলাদেশ সময়: ১০:৪৩:১৭ ● ২৪ বার পঠিত




পাঠকের মন্তব্য

(মতামতের জন্যে সম্পাদক দায়ী নয়।)

আর্কাইভ