সাগরকন্যা প্রতিবেদক, কয়রা (খুলনা)
খুলনার কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কাগজে-কলমে শয্যাসংখ্যা ৫০ হলেও বাস্তবে মাত্র ১৯ শয্যার অবকাঠামোয় চলছে চিকিৎসাসেবা। ছয় বছর আগে ৩১ শয্যার পুরোনো ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়। এরপর নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখনো শুরু হয়নি নির্মাণকাজ। অন্যদিকে, ৫০ শয্যার হাসপাতাল ভবন নির্মাণের প্রক্রিয়াও আটকে আছে মাটি পরীক্ষার পর। ফলে দীর্ঘদিন ধরে শয্যাসংকট ও সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীরা।
সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় কয়রা উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের মানুষের চিকিৎসার অন্যতম ভরসা এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হাসপাতালটিতে স্থানীয়দের পাশাপাশি আশপাশের এলাকার মানুষও চিকিৎসা নিতে আসেন। বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরকারি এই হাসপাতাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অবকাঠামোগত সংকটের পাশাপাশি চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতিতে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। হাসপাতালে শয্যা পাওয়া, রাতে চিকিৎসক পাওয়া এবং জরুরি প্রয়োজনে অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহারের সুযোগ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে তাঁদের।
জায়গীরমহল গ্রামের বাসিন্দা আবদুর রউফ বলেন, হাসপাতালে নিয়মিত চিকিৎসক পাওয়া নিয়ে রোগীদের মধ্যে অভিযোগ রয়েছে। রাতের বেলায় চিকিৎসাসেবা পেতেও সমস্যা হয়। অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও চালক না থাকায় সেটি সব সময় ব্যবহার করা যায় না।
কয়রা উপকূলীয় ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকা হওয়ায় এখানকার মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বেশি। ডায়রিয়া, পানিবাহিত রোগ, জ্বর ও শ্বাসকষ্টের পাশাপাশি দুর্ঘটনা, প্রসূতি জটিলতা এবং বিভিন্ন জরুরি সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। বর্ষা মৌসুম, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় রোগীর চাপ বাড়তে পারে। দুর্যোগে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হলে গুরুতর রোগীদের অন্য হাসপাতালে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি বলে মনে করেন এলাকাবাসী।
মসজিদকুড় গ্রামের বাসিন্দা আবু তৈয়ব বলেন, নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার পরও বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে। দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করে ৫০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা চালু করা প্রয়োজন। সাধারণ মানুষের চিকিৎসার জন্য উপজেলা পর্যায়ের এই হাসপাতালের ওপর নির্ভরতা অনেক বেশি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
হাসপাতালের সংকট শুধু শয্যাসংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান ও সহায়ক কর্মীর ঘাটতিও সেবার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাঁদের মতে, নতুন ভবন নির্মাণের পাশাপাশি চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ, ওষুধের সরবরাহ, পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধা এবং জরুরি চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
আমাদী খান সাহেব কোমর উদ্দিন ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, উপকূলীয় এলাকার স্বাস্থ্য অবকাঠামো সাধারণ এলাকার তুলনায় আরও সক্ষম হওয়া প্রয়োজন। দুর্যোগের সময় একসঙ্গে অনেক মানুষের চিকিৎসার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। অথচ বছরের পর বছর ধরে নতুন ভবন নির্মাণ ও ৫০ শয্যার সেবা চালুর কথা শোনা গেলেও মানুষ এখনো ১৯ শয্যার অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করছে। দীর্ঘ সময়েও সমস্যার সমাধান না হওয়া দুঃখজনক। তিনি জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. রেজাউল করিম বলেন, হাসপাতালের ৩১ শয্যাবিশিষ্ট ভবন নির্মাণের দরপত্রপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। তবে এখনো কাজ শুরু হয়নি। ঠিকাদার কাজের জন্য নির্মাণসামগ্রী আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অন্যদিকে, ৫০ শয্যার ভবন নির্মাণের প্রক্রিয়া মাটি পরীক্ষার পর আর এগোয়নি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সংকট কাটিয়ে হাসপাতালটির পূর্ণ সক্ষমতা চালু হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত নির্মাণকাজ শুরু করে প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসাসুবিধা নিশ্চিত করা হবে, যাতে উপকূলীয় এই জনপদের মানুষ নিজ উপজেলাতেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেতে পারেন।