বুধবার ● ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বেতাগীতে সাইবার আতঙ্কে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ
হোম » বরগুনা » বেতাগীতে সাইবার আতঙ্কে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ
![]()
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, বেতাগী (বরগুনা)
বরগুনার বেতাগীতে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার অপরাধের অভিযোগও বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পেজ ও গ্রুপে স্থানীয় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সচেতন ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেশ কিছুদিন ধরে একটি চক্র উপজেলার বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, চক্রটি বিভিন্ন উপায়ে কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সাধারণ ছবি সংগ্রহ করে। পরে সেগুলো বিকৃত করে বা গোপন মুহূর্তের ছবি-ভিডিও থাকার দাবি তুলে ভুয়া ও আপত্তিকর কনটেন্ট তৈরি করা হয়।
এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনবক্সে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ওই ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ দাবি করা হয়। মান-সম্মান ও সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই চক্রটির দাবিকৃত অর্থ দিতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার টাকা না দিলে ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।
বেতাগী সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী নুসরাত বলেন, ‘আমরা ভাই-বোন কোথাও ঘুরতে গেলে অনেক সময় গোপনে আমাদের ছবি ধারণ করে সেগুলো বিভিন্ন অ্যাপ ও পেজে পোস্ট করা হচ্ছে। এভাবে যদি আমাদের ব্যক্তিগত ছবি প্রকাশ করা হয়, তাহলে আমাদের নিরাপত্তা কোথায়?’
একই কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. নবীন বলেন, ‘এখানকার বেশ কিছু পেজে মানুষের অজান্তে ছবি তুলে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় প্রকাশ পাওয়ার পাশাপাশি অনেকেই হয়রানি ও বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছেন। বিষয়টি দ্রুত বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।’
একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মোসা. সিলবি প্রশ্ন করে বলেন, ‘আমাদের নিরাপত্তা কোথায়? রাস্তাঘাটে বা বিভিন্ন জায়গায় বসে থাকা অবস্থায় গোপনে ছবি তুলে তা পোস্ট করা হচ্ছে। বিষয়টি সত্যিই উদ্বেগজনক। এতে আমরা প্রতিনিয়ত বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়ছি এবং হয়রানির শিকার হচ্ছি।’
অনার্সের শিক্ষার্থী মেহেদী বলেন, ‘শুনেছি, ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ধারণ করে কাউকে ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায়ের ঘটনাও ঘটছে। সাধারণ ও নিরীহ শিক্ষার্থীরা এ ধরনের হয়রানি থেকে মুক্তি চান।’
দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী নাফিজা বলেন, ‘সত্যি বলতে এসব বিষয় দেখতে খুব খারাপ লাগে। আমাদের ব্যক্তিগত বিষয়গুলো এখানে পোস্ট করা হচ্ছে। আমরা চাই, আমাদের ব্যক্তিগত বিষয়গুলো গোপন থাকুক এবং কেউ যেন সেগুলো অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করতে না পারে।’
আইনজীবীরা বলছেন, কারও অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ধারণ, বিকৃত করা কিংবা অনলাইনে ছড়িয়ে দিয়ে হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইল করা গুরুতর অপরাধ হতে পারে। এ ধরনের ঘটনায় নীরব না থেকে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
স্থানীয় শিক্ষাবিদ ও শিক্ষকেরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে দ্রুত সাইবার সচেতনতা তৈরি করা জরুরি। ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি, ফোন নম্বর বা পাসওয়ার্ড অপরিচিত কারও সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার না করার বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে হবে। কেউ অনলাইনে হয়রানি বা ব্ল্যাকমেইলের শিকার হলে ভয় না পেয়ে মা-বাবা, শিক্ষক বা প্রশাসনকে জানাতে হবে।
তারা প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক সেল গঠনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিং ও মেন্টরিংয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। কোনো শিক্ষার্থী হঠাৎ চুপচাপ বা বিষণ্ন হয়ে পড়লে তার সঙ্গে কথা বলে সে সাইবার হয়রানির শিকার কি না, তা জানার চেষ্টা করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। পাশাপাশি ক্লাসের ফাঁকে কিংবা শারীরিক শিক্ষার সমাবেশে নিয়মিত সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতামূলক আলোচনা করার কথাও বলেছেন।
বেতাগী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হারুন অর রশীদ হাওলাদার বলেন, ‘কিছু পেজের নাম আমরা একাধিকবার মৌখিকভাবে পেয়েছি। অভিযোগ রয়েছে, এসব পেজে ছেলে-মেয়েদের ব্যক্তিগত ও আপত্তিকর ছবি প্রকাশ করা হচ্ছে। বিষয়গুলো আমাদের নজরে রয়েছে এবং এসব সাইবার অপরাধীকে শনাক্ত করতে পুলিশ কাজ করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কারও ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করে হয়রানি বা সম্মানহানি করলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বেতাগী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘বিভিন্নজনের কাছ থেকে আমিও একাধিক অভিযোগ শুনেছি। এরপর স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে প্রকৃত সাইবার অপরাধী শনাক্ত ও দমনে বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বেতাগী উপজেলায় কেউ সাইবার অপরাধের শিকার হলে ভুক্তভোগীকে আইনি সহায়তা দিতে প্রশাসনিক ও আইনগত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’
বাংলাদেশ সময়: ২১:৩৫:৩৫ ● ২৪ বার পঠিত
