বৃহস্পতিবার ● ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কুয়াকাটা পল্লী বিদ্যুতের ‘ভৌতিক বিলে’ নাজেহাল গ্রাহক
হোম » বিশেষ প্রতিবেদন » কুয়াকাটা পল্লী বিদ্যুতের ‘ভৌতিক বিলে’ নাজেহাল গ্রাহক
![]()
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, কুয়াকাটা (পটুয়াখালী)
পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় পল্লী বিদ্যুতের বিল নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রাহকরা। জুলাই মাসের পরিশোধিত বিল আগস্ট মাসের বিলে পুনরায় যুক্ত হওয়া, প্রকৃত মিটার রিডিংয়ের সঙ্গে বিলের হিসাবের অসঙ্গতি, নির্ধারিত সময়ে বিলের কাগজ না পাওয়া এবং ভুল বিল সংশোধনে বারবার অফিসে যেতে হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে অনেক গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল স্বাভাবিকের তুলনায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি এসেছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।
গ্রাহকদের অভিযোগ, ভুল বিলের কারণে কেউ অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করেছেন, আবার কেউ বিলের অস্বাভাবিক অঙ্ক দেখে সংশোধনের জন্য পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে ছুটছেন। অভিযোগ রয়েছে, সমস্যা সমাধানের জন্য অফিসে গিয়ে গ্রাহকদের এক কর্মকর্তা থেকে অন্য কর্মকর্তার টেবিলে ঘুরতে হচ্ছে। নতুন সংযোগ ও মিটার স্থাপন নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় কয়েকজন গ্রাহক।
মৎস্যবন্দর আলীপুরের ব্যবসায়ী মো. আবুল কালামের মিটার নম্বর ৫০০১৫৮০০৬। আগস্ট মাসে তাঁর বিদ্যুৎ বিল আসে ২ হাজার ৭৮৬ টাকা। তাঁর দাবি, হিসাব যাচাইয়ের পর প্রকৃত বিল দাঁড়ানোর কথা ১ হাজার ৩৬১ টাকা। একইভাবে গ্রাহক মিজানুর রহমানের মিটার নম্বর ০০২৫০৬৭৫-এর আগস্ট মাসের বিল আসে ১ হাজার ৬৪০ টাকা। তাঁর দাবি, সংশোধিত হিসাবে বিল হওয়ার কথা ১ হাজার ২০৬ টাকা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জুয়েল ফরাজী, রহিম ফরাজী ও মজিদ ফরাজীসহ শত শত গ্রাহকের বিলেও অতিরিক্ত অর্থ যুক্ত হয়েছে। তবে কতজন গ্রাহকের বিলে এমন অসঙ্গতি হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
পাঁচ মিটারেই অসঙ্গতির অভিযোগ
মৎস্যবন্দর আলীপুরের মেসার্স সুফিয়া মেডিকেল হলের স্বত্বাধিকারী হাজী মো. মহিবুল্লাহ জানান, তাঁর দোকান, বাসা ও অফিস মিলিয়ে মোট পাঁচটি বিদ্যুৎ মিটার রয়েছে। আগস্ট মাসে প্রতিটি মিটারের বিলই স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি আসে। চারটি মিটারের বিল পরিশোধের পর পঞ্চম মিটারের বিল দিতে গিয়ে অস্বাভাবিক অঙ্ক দেখে তিনি বিষয়টি যাচাই করেন।
তিনি বলেন, ‘বিলের কাগজ যাচাই করে দেখি, জুলাই মাসের বিল আগেই পরিশোধ করা হলেও সেই অর্থ আগস্ট মাসের বিলের সঙ্গে আবারও যুক্ত করা হয়েছে। পরে পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে যোগাযোগ করলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে অফিসে আসতে বলা হয়। অফিসে যাওয়ার পর বিল সংশোধন করে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
মহিবুল্লাহর দাবি, যেসব মিটারে অতিরিক্ত বা দ্বিগুণ বিল ইতোমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে, সেই অর্থ সরাসরি ফেরত না দিয়ে পরবর্তী মাসের বিলের সঙ্গে সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘ভুল যদি অফিসের কারণে হয়ে থাকে, তাহলে গ্রাহকের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হলো কেন? নিজের টাকা সমন্বয় করিয়ে নিতে একজন গ্রাহককে আবার অফিসে আসতে হবে কেন?’
মিটার রিডিং নিয়েও প্রশ্ন
পরিশোধিত বিল পুনরায় যুক্ত হওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি মিটার রিডিং সংগ্রহের পদ্ধতি নিয়েও দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রয়েছে গ্রাহকদের মধ্যে। তাঁদের দাবি, অনেক সময় মিটারের প্রকৃত রিডিং সংগ্রহ না করে অনুমাননির্ভর হিসাবে বিল তৈরি করা হয়। ফলে কোনো মাসে অস্বাভাবিক বেশি, আবার কোনো মাসে তুলনামূলক কম বিল আসে।
গ্রাহকদের ভাষ্য, পরবর্তীতে প্রকৃত মিটার রিডিংয়ের সঙ্গে বিলের হিসাবের পার্থক্য ধরা পড়লেও তা সংশোধনের উদ্যোগ নিতে গ্রাহকদেরই অফিসে যেতে হয়। নিয়মিত ও সঠিকভাবে মিটার রিডিং সংগ্রহ এবং তা যাচাই করা হলে এ ধরনের জটিলতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব বলে মনে করেন তারা।
শেষ দিনে বিল, গুনতে হয়েছে বিলম্ব মাশুল
আগস্ট মাসের বিদ্যুৎ বিল নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গ্রাহকের হাতে পৌঁছানো নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন গ্রাহক জানান, তারা বিল পরিশোধের নির্ধারিত সময়সীমার শেষ দিন অর্থাৎ ৩০ আগস্ট বিলের কাগজ হাতে পেয়েছেন। ফলে পরদিন বিল পরিশোধ করতে গিয়ে কাউকে কাউকে বিলম্ব মাশুল দিতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
গ্রাহকদের প্রশ্ন, বিল বিতরণে বিলম্ব হলে তার দায় কেন গ্রাহককে বহন করতে হবে? সময়সীমার শেষ দিনে বিল হাতে পৌঁছালে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিল পরিশোধের সুযোগ কোথায়?
এ নিয়ে পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কয়েকজন গ্রাহকের বাকবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
![]()
অভিযোগ নিয়ে টেবিল থেকে টেবিলে ঘোরার অভিযোগ
বিল সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে গেলে গ্রাহকদের একাধিক কর্মকর্তার টেবিলে ঘোরানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, একজন কর্মকর্তা অন্য কর্মকর্তার কাছে পাঠান। আবার সেখান থেকে অন্য টেবিলে যেতে বলা হয়। এতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অনেক সময় দ্রুত সমাধান পাওয়া যায় না।
গ্রাহকদের অভিযোগ, শেষ পর্যন্ত অনেককে উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মোস্তফা আমিনুর রাশেদের কাছে যেতে হয়। তবে সেখানেও সব অভিযোগের তাৎক্ষণিক সমাধান পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।
বিল বিতরণে বিলম্বের বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট বিল বিতরণকারীর কাছ থেকে অর্থ আদায়ের কথা বলা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন গ্রাহক। তাঁদের প্রশ্ন, বিল বিতরণে দায়িত্বে অবহেলা হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে শনাক্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব কি গ্রাহকের, নাকি কর্তৃপক্ষের?
নতুন সংযোগ ও মিটার নিয়েও অভিযোগ
নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ ও মিটার স্থাপন নিয়েও নানা অনিয়মের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, নতুন সংযোগের জন্য আবেদন করার পরও অনেক গ্রাহক নির্ধারিত সময়ে সংযোগ পাচ্ছেন না। এ ক্ষেত্রে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও তুলেছেন কয়েকজন গ্রাহক।
তবে এসব অভিযোগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি চান গ্রাহকরা
গ্রাহকদের মতে, বিদ্যুৎ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য সেবা। তাই বিল প্রস্তুত, মিটার রিডিং সংগ্রহ, বিল বিতরণ, ভুল বিল সংশোধন এবং নতুন সংযোগ দেওয়ার প্রতিটি পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
তাঁদের দাবি, নতুন বিল তৈরির আগে পূর্ববর্তী মাসের বিল পরিশোধের তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত মিটার রিডিং নিশ্চিত করে বিল তৈরি এবং নির্ধারিত সময়ের যথেষ্ট আগেই গ্রাহকের হাতে বিল পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
ভুল বা অতিরিক্ত বিলের ক্ষেত্রে গ্রাহককে দিনের পর দিন অফিসে ঘোরানোর পরিবর্তে দ্রুত সমস্যার সমাধান করার দাবি জানিয়েছেন তারা। অতিরিক্ত আদায় করা অর্থ দ্রুত ফেরত দেওয়া অথবা গ্রাহকের সম্মতিতে পরবর্তী বিলের সঙ্গে সমন্বয়ের ব্যবস্থাও চান ভুক্তভোগীরা।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, কুয়াকাটা পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে পৃথক গ্রাহক অভিযোগ ও নিষ্পত্তি ডেস্ক চালু করা হলে ভোগান্তি অনেকাংশে কমবে। অভিযোগ গ্রহণের পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকলে গ্রাহকদের এক কর্মকর্তা থেকে অন্য কর্মকর্তার কাছে ছুটতে হবে না।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
অভিযোগগুলোর বিষয়ে কুয়াকাটা পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মোস্তফা আমিনুর রাশেদ বলেন, ‘সফটওয়্যারের সমস্যার কারণে বিদ্যুৎ বিল বেশি হয়েছে। এটা ঠিক হয়ে যাবে।’
অতিরিক্ত বিল বা অন্যান্য অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যদি কেউ কোনো অনিয়ম করে থাকে, সেটা গ্রাহক বুঝে নেবেন।’
তবে গ্রাহকদের অভিযোগ, শুধু সফটওয়্যারজনিত সমস্যার কথা বললেই সংকটের সমাধান হয় না। ভুল বিল শনাক্ত ও সংশোধনের পাশাপাশি অতিরিক্ত আদায় করা অর্থের যথাযথ নিষ্পত্তি এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের সমস্যা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় গ্রাহকদের প্রত্যাশা, বিলিং জটিলতার অভিযোগগুলো দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে পরিশোধিত বিল পুনরায় যুক্ত হওয়া, মিটার রিডিংয়ের সঙ্গে হিসাবের অসঙ্গতি কিংবা অস্বাভাবিক বিলের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নেবে।
বাংলাদেশ সময়: ১৫:২৯:১৪ ● ১১ বার পঠিত
