শুক্রবার ● ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জুমার দিনের বিশেষ নিবন্ধ ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকার ও আমাদের করণীয়

হোম » ইসলামী জীবন » জুমার দিনের বিশেষ নিবন্ধ ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকার ও আমাদের করণীয়
শুক্রবার ● ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬


ছবি: AI

মুফতি মো. বেলাল হোসাইন

 

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক ও সামাজিক আচরণ- সব ক্ষেত্রেই ইসলামের রয়েছে সুস্পষ্ট নির্দেশনা। একজন মানুষের সঙ্গে অন্য মানুষের সম্পর্ক কেমন হবে, সমাজে কীভাবে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্প্রীতি বজায় থাকবে, সে বিষয়েও ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছে। আর সামাজিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কগুলোর একটি হলো প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক।

 

প্রতিবেশী মানুষের নিকটতম সামাজিক সঙ্গী। সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে অনেক সময় আত্মীয়স্বজনের আগেই প্রতিবেশী পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ পান। তাই ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

 

রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষার ব্যাপারে উম্মতকে বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন। হাদিসে এসেছে, হজরত জিবরাইল (আ.) বারবার রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে নসিহত করতে থাকেন। এমনকি রাসুলুল্লাহ (সা.) ধারণা করেছিলেন, হয়তো প্রতিবেশীকেও উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেওয়া হবে।

 

এ থেকেই বোঝা যায়, ইসলামে প্রতিবেশীর মর্যাদা ও অধিকার কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

 

কারা আমাদের প্রতিবেশী?

 

প্রতিবেশী বলতে শুধু বাড়ির পাশের মানুষকে বোঝায় না। এক রেওয়ায়েতের বর্ণনা অনুযায়ী, বাড়ির চারদিকে চল্লিশটি বাড়ি পর্যন্ত বসবাসকারীরা প্রতিবেশীর অন্তর্ভুক্ত।

 

তবে ইসলামের দৃষ্টিতে প্রতিবেশীর ধারণা আরও বিস্তৃত। শহর কিংবা গ্রামে পাশাপাশি বসবাসকারী মানুষ যেমন প্রতিবেশী, তেমনি সফরে একসঙ্গে থাকা ব্যক্তিরাও সাময়িকভাবে প্রতিবেশীর মর্যাদা লাভ করেন। বিদেশে ভ্রমণের সময় সফরসঙ্গী, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ, অফিস-আদালত কিংবা যেকোনো কর্মস্থলে একসঙ্গে অবস্থানকারীরাও একে অপরের প্রতিবেশী হিসেবে গণ্য হতে পারেন।

 

অর্থাৎ, একজন মানুষের সঙ্গে যে ব্যক্তি নির্দিষ্ট সময় ও স্থানে নৈকট্যের সম্পর্ক তৈরি করেন, তার প্রতিও দায়িত্ব ও সুন্দর আচরণের শিক্ষা দেয় ইসলাম।

 

প্রতিবেশীর প্রতি আমাদের করণীয়

 

প্রতিবেশী কোনো প্রয়োজনে সাহায্য চাইলে সামর্থ্য অনুযায়ী তার সহযোগিতা করা উচিত। একজন মুসলমান কখনো প্রতিবেশীর বিপদ দেখে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন না। বিপদে-আপদে তার পাশে দাঁড়ানো মানবিক ও ইসলামী দায়িত্ব।

 

অভাবগ্রস্ত প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানো

 

প্রতিবেশী আর্থিক সংকটে পড়লে তাকে সহযোগিতা করা উচিত। কেউ ঋণ চাইলে সামর্থ্য অনুযায়ী তাকে সাহায্য করা এবং অভাবী হলে তার প্রয়োজন পূরণে এগিয়ে আসা ইসলামের শিক্ষা।

 

বর্তমান সময়ে অনেক মানুষ অভাবের কারণে নীরবে কষ্ট করেন। অথচ পাশের বাড়ির মানুষ হয়তো তা জানতেও পারেন না। তাই প্রতিবেশীর খোঁজখবর নেওয়া এবং তার প্রয়োজন সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রত্যেকের দায়িত্ব।

 

অসুস্থতায় খোঁজখবর নেওয়া

 

প্রতিবেশী অসুস্থ হলে তার খোঁজখবর নেওয়া, সুস্থতার জন্য দোয়া করা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসা বা অন্য কোনো সহযোগিতা করা উচিত। অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, এটি মানবিকতারও পরিচয়।

 

কষ্টে ধৈর্য ধারণ করা

 

প্রতিবেশীর গরু-বাছুর, হাঁস-মুরগি কিংবা শিশুদের কারণে অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো ক্ষতি হলে ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দেওয়া উচিত।

 

ছোটখাটো বিষয় নিয়ে প্রতিবেশীর সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে পড়া কখনো কাম্য নয়। পারস্পরিক আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করাই উত্তম।

 

পরিবার ও সম্পদের নিরাপত্তায় সচেতন থাকা

 

প্রতিবেশীর স্ত্রী-সন্তান, বাড়িঘর ও জীবজন্তুর নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন থাকা উচিত। প্রতিবেশীর অনুপস্থিতিতে তার সম্পদ ও পরিবারের ক্ষতি হয়- এমন কোনো আচরণ একজন মুসলমানের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।

 

বরং প্রয়োজন হলে প্রতিবেশীর নিরাপত্তায় এগিয়ে আসা উচিত।

 

আনন্দে অংশীদার হওয়া

 

প্রতিবেশীর কোনো সুখের সংবাদ বা আনন্দের উপলক্ষ এলে তাতে আনন্দ প্রকাশ করা এবং তাকে শুভেচ্ছা জানানো উচিত। অন্যের সুখে আনন্দিত হওয়া সুন্দর চরিত্রের পরিচয়।

 

হিংসা বা বিদ্বেষের পরিবর্তে একজন মুসলমান অন্যের ভালোতে আনন্দিত হবেন- এটাই ইসলামের শিক্ষা।

 

দুঃখে সমবেদনা জানানো

 

প্রতিবেশী কোনো বিপদ বা দুঃখের সম্মুখীন হলে তার প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করা উচিত।

 

মানুষের জীবনে সুখ-দুঃখ থাকবেই। দুঃসময়ে একজন ভালো প্রতিবেশীর সহানুভূতি অনেক বড় শক্তি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

 

খাবারে প্রতিবেশীর অংশ রাখা

 

বাড়িতে বিশেষ কোনো খাবার রান্না হলে কিংবা ফলমূলের ব্যবস্থা হলে প্রতিবেশীকেও তা থেকে কিছু হাদিয়া দেওয়া ইসলামের অন্যতম সুন্দর শিক্ষা।

 

সামর্থ্য না থাকলে এমনভাবে খাবার ঘরে আনার কথা বলা হয়েছে, যাতে অভাবী প্রতিবেশীর সন্তানরা তা দেখে কষ্ট না পায়। নিজের সন্তানদেরও এ বিষয়ে সচেতন করা প্রয়োজন।

 

একটি খাবার ভাগাভাগি করার মধ্য দিয়েও মানুষের মধ্যে ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়।

 

মৃত্যুর পর জানাজায় অংশ নেওয়া

 

কোনো প্রতিবেশী মৃত্যুবরণ করলে তার জানাজায় অংশ নেওয়া এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করা প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।

 

মৃত্যুর সময় একজন মানুষের পরিবারের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় আশপাশের মানুষের সহযোগিতা ও সহমর্মিতা।

 

বাতাস ও আলো চলাচলে বাধা না দেওয়া

 

প্রতিবেশীর সঙ্গে সমঝোতা ছাড়া এমন উঁচু দেয়াল বা ইমারত নির্মাণ করা উচিত নয়, যাতে তার স্বাভাবিক জীবনযাপন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিজের সুবিধার জন্য অন্যের অসুবিধা সৃষ্টি করা ইসলামের শিক্ষা নয়।

 

ময়লা-আবর্জনা ফেলে কষ্ট না দেওয়া

 

প্রতিবেশীর বাড়ির আশপাশে ময়লা-আবর্জনা ফেলে দুর্গন্ধ বা অন্য কোনো কষ্ট দেওয়া সম্পূর্ণ অনুচিত। নিজের বাড়ি পরিষ্কার রেখে অন্যের পরিবেশ নোংরা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

 

রাস্তা, ড্রেন কিংবা প্রতিবেশীর সীমানার পাশে অপরিকল্পিতভাবে আবর্জনা ফেলার কারণে অন্যের কষ্ট হচ্ছে কি না, সে বিষয়েও আমাদের সচেতন থাকা প্রয়োজন।

 

সুন্দর সমাজের ভিত্তি হোক প্রতিবেশীসুলভ আচরণ

 

বর্তমান সময়ে সমাজে পারস্পরিক হিংসা, বিদ্বেষ, অসহিষ্ণুতা ও ছোটখাটো বিষয় নিয়ে বিরোধ বেড়েই চলেছে। অনেক সময় সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের শত্রুতার সৃষ্টি হয়। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো ক্ষমা, সহনশীলতা, সহযোগিতা ও পারস্পরিক ভালোবাসা।

 

একজন প্রকৃত মুসলমান কখনো তার প্রতিবেশীকে কষ্ট দেন না। বরং তিনি চেষ্টা করেন, তার আচরণে যেন প্রতিবেশী নিরাপদ ও স্বস্তিতে থাকেন।

 

প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা শুধু একটি সামাজিক দায়িত্ব নয়; এটি একজন মুমিনের চরিত্র ও ঈমানি দায়িত্বেরও অংশ। আমরা যদি প্রত্যেকে নিজের প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্বশীল হই, তাহলে পরিবার থেকে সমাজ- সবখানেই শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হবে।

 

জুমার দিনের এই পবিত্র সময়ে আসুন, আমরা নিজেদের আচরণের দিকে ফিরে তাকাই। আমার কারণে কোনো প্রতিবেশী কষ্ট পাচ্ছেন কি না, আমি কি আমার প্রতিবেশীর সুখ-দুঃখের খবর রাখি, বিপদে কি তার পাশে দাঁড়াই- এসব প্রশ্ন নিজেদের কাছে করি।

 

প্রতিবেশীর অধিকার যথাযথভাবে পালন করার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও মানবিক সমাজ।

 

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে প্রতিবেশীর অধিকার যথাযথভাবে আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

লেখক: ইমাম ও খতিব, আলীপুর (কুয়াকাটা) কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ

বাংলাদেশ সময়: ৭:০৭:১৭ ● ২১ বার পঠিত