বৃহস্পতিবার ● ২৭ আগস্ট ২০২৬
কুয়াকাটায় দুই দিনে ট্রলিং বোটে ৮০ মণ ইলিশ, সাধারণ জেলেদের জালে কমছে মাছ
হোম » জেলে-মৎস্য » কুয়াকাটায় দুই দিনে ট্রলিং বোটে ৮০ মণ ইলিশ, সাধারণ জেলেদের জালে কমছে মাছ
![]()
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, কুয়াকাটা (পটুয়াখালী)
পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে একটি রূপান্তরিত আর্টিসানাল ট্রলিং বোটে মাত্র দুই দিনের মাছ শিকারে প্রায় ৮০ মণ ইলিশ ধরা পড়েছে। বুধবার (২৬ আগস্ট) বিকেলে বিপুল পরিমাণ ইলিশ নিয়ে এফবি আব্দুল্লাহ নামের বোটটি আলীপুর মৎস্য বন্দরে আসে। পরে আলীপুরের সিফাত ফিসে নিলামের মাধ্যমে মাছগুলো প্রায় ২০ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়।
বোটটির মাঝি বাদশা সাগরকন্যাকে জানান, চার দিন আগে ১৮ জন জেলে নিয়ে তারা গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যান। দুই দিন মাছ ধরার পর মঙ্গলবার পায়রা বন্দরের শেষ বয়া সংলগ্ন এলাকায় তাদের জালে বিপুল পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়ে। তবে ধরা পড়া ইলিশের আকার তুলনামূলক ছোট বলে জানান তিনি।
এদিকে ট্রলিং বোটে অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়লেও কুয়াকাটা, মহিপুর, আলীপুর ও আশাখালী উপকূলের সাধারণ জেলেদের মধ্যে মাছের প্রাপ্যতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। জেলেদের অভিযোগ, দিনের পর দিন সাগরে অবস্থান করেও তারা আগের মতো মাছ পাচ্ছেন না। অনেক সময় জ্বালানি, বরফ, খাবার ও শ্রমিকের খরচ তুলতে না পেরে লোকসান নিয়ে তীরে ফিরতে হচ্ছে।
সাধারণ মাছধরা ট্রলারের জেলে হানিফ মাঝি বলেন, ‘আগে অল্প সময় সাগরে গেলেই পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া যেত। এখন দিনের পর দিন সমুদ্রে থেকেও কাঙ্ক্ষিত মাছ পাওয়া যায় না।’ তার অভিযোগ, কিছু ট্রলিং বোট অগভীর সমুদ্র থেকে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ মাছ তুলে নেওয়ায় সাধারণ জেলেদের মাছ ধরার সুযোগ কমে যাচ্ছে।
জেলেদের দাবি, কিছু ট্রলিং বোটে ফিশ ফাইন্ডার, জিপিএস ও রাডারের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাছের অবস্থান শনাক্ত করা হচ্ছে। এরপর অপেক্ষাকৃত সূক্ষ্ম ফাঁসের জাল ব্যবহার করে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ মাছ আহরণ করা হচ্ছে। এতে বড় ইলিশের পাশাপাশি ছোট ইলিশ, পোনা ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীও জালে আটকা পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জেলেদের আশঙ্কা, ছোট মাছ ও পোনা নির্বিচারে আহরণ অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের মজুত কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য।
চলতি মাসের শুরুতেও কুয়াকাটা সংলগ্ন সাগরে একটি অবৈধ আর্টিসানাল ট্রলিং বোটের জালে একবারে ৪৬ মণ ইলিশ ধরা পড়ার ঘটনা ঘটে। পরে মাছগুলো প্রায় ৪৮ লাখ ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। অল্প সময়ের ব্যবধানে একই উপকূলে ট্রলিং বোটে বিপুল পরিমাণ ইলিশ আহরণের একাধিক ঘটনা সামনে আসায় সাধারণ জেলেদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে- সাগরে ইলিশের প্রাচুর্য ফিরেছে, নাকি আধুনিক প্রযুক্তি ও শক্তিশালী জালের মাধ্যমে মাছের ঝাঁক শনাক্ত করে অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ মাছ আহরণ করা হচ্ছে।
জেলেদের ভাষ্য, শুধু কত মণ মাছ ধরা পড়ছে, তা দিয়ে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করলে হবে না। কোন বোটে কী ধরনের জাল ব্যবহার করা হচ্ছে, কোথায় মাছ ধরা হচ্ছে এবং ধরা পড়া মাছের আকার কেমন- এসব বিষয়ও নজরদারির আওতায় আনা প্রয়োজন।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. রাজিব সরকার বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি অবৈধ জালের ব্যবহারও ইলিশ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। অবৈধ জাল উৎপাদন বন্ধ এবং অবৈধ ট্রলিংয়ের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে ইলিশের উৎপাদন আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা জানান, সামুদ্রিক মৎস্য আইনের তফসিল অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অবৈধ জাল ব্যবহার করে ট্রলিংয়ের অভিযোগে বোট মালিকদের মাইকিং করে সতর্ক করা হয়েছে। এর আগে কয়েকটি বোট জব্দ করে মামলাও করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
সাধারণ জেলেদের দাবি, অবৈধভাবে মাছ আহরণ বন্ধের পাশাপাশি ট্রলিং বোটে ব্যবহৃত জাল, মাছ ধরার স্থান ও ধরা পড়া মাছের আকারের ওপর কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। এতে সাগরের মৎস্যসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ জেলেদের জীবিকা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মৎস্যসম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ সময়: ১৪:২০:৫০ ● ২৯ বার পঠিত
