শনিবার ● ১৫ আগস্ট ২০২৬
দুমকিতে খালের খাসজমি দখল, উচ্ছেদের অপেক্ষায় সরকারি সম্পত্তি
হোম » পটুয়াখালী » দুমকিতে খালের খাসজমি দখল, উচ্ছেদের অপেক্ষায় সরকারি সম্পত্তি
![]()
সাগরকন্যা প্রতিবেদক, দুমকি (পটুয়াখালী)
পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার পীরতলা বাজার, আঙ্গারিয়া বন্দর, সাতানী কালভার্ট বাজার, মুরাদিয়া বোর্ড অফিস বাজার ও জলিশা কদমতলা বাজারসংলগ্ন খালের সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত জমি দীর্ঘদিন ধরে দখল ও ভরাটের অভিযোগ উঠেছে। কোথাও খালের জায়গা ভরাট করে দোকানপাট, বাড়িঘর ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এতে সরকারি সম্পত্তি বেহাত হওয়ার পাশাপাশি সংকুচিত হয়ে পড়ছে খাল, ব্যাহত হচ্ছে পানি নিষ্কাশন ও স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ।
পীরতলা খালের দখল ও দূষণের বিষয়টি নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে খালটির দখল, ভরাট, ময়লা-আবর্জনা ফেলা এবং পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার চিত্র উঠে এসেছে। ২০১৯ সালের একটি প্রতিবেদনে খালের দুই পাড়ে দখল ও স্থাপনা নির্মাণের কথা বলা হয়। ২০২৪ সালেও খালটিকে দখল-ভরাট ও ময়লা-আবর্জনার কারণে প্রায় অস্তিত্বহীন হওয়ার কথা উঠে আসে।
অস্থায়ী দোকান থেকে স্থায়ী স্থাপনা
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পীরতলা খালের দুই পাড়ে গড়ে ওঠা অনেক অস্থায়ী দোকানের পেছনের অংশ ধীরে ধীরে মাটি ও বালু দিয়ে ভরাট করে দোকানের পরিসর বাড়ানো হয়েছে। কোথাও কাঠ, বাঁশ ও টিন দিয়ে শুরু হওয়া স্থাপনা পরে পাকা ভবন বা স্থায়ী দোকানে রূপ নিয়েছে।
খালের জমি ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণের পাশাপাশি বিভিন্ন বাজারের ময়লা-আবর্জনাও নিয়মিত খালে ফেলা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে একদিকে খালের তলদেশ ভরাট হচ্ছে, অন্যদিকে পানি প্রবাহের পথ সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
দুমকি উপজেলা প্রশাসনের সরকারি তথ্যেও পীরতলা খালসহ উপজেলার একাধিক খালের ঐতিহাসিক অস্তিত্বের উল্লেখ রয়েছে।
শুধু পীরতলা নয়, অন্য খালেও একই চিত্র
স্থানীয়দের অভিযোগ, পীরতলা খালের পাশাপাশি আঙ্গারিয়া বন্দর, দুমকি সাতানী কালভার্ট বাজার, মুরাদিয়া বোর্ড অফিস বাজার ও জলিশা কদমতলা বাজারসংলগ্ন খালের পাড়ের সরকারি খাস জমিতেও একইভাবে দখল ও ভরাট চলছে।
প্রথমে অস্থায়ী দোকান বা টিনের ঘর নির্মাণের মাধ্যমে দখল শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে অনেক স্থাপনা স্থায়ী রূপ পেয়েছে। কোথাও খালের অংশ ভরাট করে দোকানের আয়তন বাড়ানো হয়েছে, আবার কোথাও ভরাট করা জায়গায় নতুন স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে দুমকির এসব বাজার ও বাজারসংলগ্ন খালের সরকারি খাস জমি দখলের অভিযোগ উঠে আসে। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে দোকানপাট ও বাড়িঘর নির্মাণ এবং খাল ভরাটের কারণে সরকারি সম্পত্তি ও পানি প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা বলা হয়।
২০২২ সালে মাপজোক, এরপর কী?
পীরতলা বাজারের এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ২০২২ সালে ভূমি অফিসের লোকজন এসে খালের মাপজোক করেছিলেন। তখন বেশ কিছু অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করা হলেও পরবর্তী সময়ে উচ্ছেদ অভিযান এগোয়নি। কেন অভিযান থেমে যায়, সে বিষয়ে তিনি কোনো তথ্য জানাতে পারেননি।
মুরাদিয়া বোর্ড অফিস বাজারের এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ব্রিজ থেকে দক্ষিণ দিকে অন্তত আট থেকে ১০টি প্লটে সরকারি খালের জমি ভরাট করে দোকান নির্মাণ করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। একবার উচ্ছেদের নোটিশও হয়েছিল। পরে আর উচ্ছেদ করা হয়নি।
দখল-ভরাটে বাড়ছে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি
খাল দখল ও ভরাটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে পানি নিষ্কাশন ও কৃষিতে। স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় এসব খাল দিয়ে কৃষিজমির পানি নিষ্কাশন ও সেচের ব্যবস্থা হতো। কিন্তু দীর্ঘদিনের দখল, ভরাট ও ময়লা-আবর্জনায় অনেক জায়গায় খালের প্রস্থ কমে গেছে এবং পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
পীরতলা খাল নিয়ে আগের প্রতিবেদনগুলোতেও একই ধরনের সংকটের কথা উঠে এসেছে। স্থানীয় কৃষকেরা জানিয়েছেন, শুকনো মৌসুমে পানির সংকট এবং বর্ষায় পানি নিষ্কাশনে ধীরগতির কারণে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
দুমকির বিভিন্ন খাল দখল ও দূষণের কারণে পানিপ্রবাহ এবং জলজ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়েও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
যোগসাজশের অভিযোগ, মেলেনি স্বাধীন প্রমাণ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দার অভিযোগ, সরকারি খাস জমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ভূমি প্রশাসনের নজরের বাইরে থাকার কথা নয়। এরপরও দখলদার ও অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করে দৃশ্যমান উচ্ছেদ কার্যক্রম না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
কেউ কেউ ভূমি প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে দখলদারদের যোগসাজশের অভিযোগও করেছেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে যাচাইসাপেক্ষ দাবি হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
‘দুই-এক মাসের মধ্যেই উচ্ছেদ’
এ বিষয়ে দুমকি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লাহ খায়রুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘পীরতলা খালের বেদখলের জমি উদ্ধারে দাপ্তরিক কার্যক্রম চলছে। খাল খনন প্রকল্পের কাজের সঙ্গে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে।’
কবে নাগাদ উচ্ছেদ শুরু হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগামী দুই-এক মাসের মধ্যেই উচ্ছেদ কার্যক্রম দেখতে পাবেন।’
প্রশাসনের কার্যক্রমই এখন দেখার বিষয়
স্থানীয়দের দাবি, শুধু পীরতলা নয়, উপজেলার সব সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত খাল ও খালসংলগ্ন জমির সীমানা নতুন করে নির্ধারণ করে দখল ও স্থাপনার পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা প্রয়োজন। এরপর আইন অনুযায়ী উচ্ছেদ করে সরকারি সম্পত্তি উদ্ধার এবং খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার দাবি তাদের।
তবে দখলদারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সরকারি খাস জমির প্রকৃত পরিমাণ, কোন কোন স্থাপনা সরকারি জমিতে রয়েছে এবং কারা এসব জমি ভোগদখল করছেন- এসব বিষয়ে সরকারি নথি ও সরেজমিন পরিমাপের তথ্য প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত পুরো চিত্র স্পষ্ট নয়।
এখন দেখার বিষয়, উপজেলা প্রশাসনের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী দুই-এক মাসের মধ্যে উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু হয় কি না। একই সঙ্গে খালের সীমানা নির্ধারণ, দখলদারদের তালিকা প্রকাশ এবং উদ্ধার করা সরকারি জমি পুনরায় দখলমুক্ত রাখার জন্য প্রশাসন কী ধরনের স্থায়ী ব্যবস্থা নেয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ সময়: ১৬:৪৯:৪০ ● ৩২ বার পঠিত
