বুধবার ● ১২ আগস্ট ২০২৬

সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য প্রবাসে মা, সাফল্যের দিনে চোখে জল

হোম » ফিচার » সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য প্রবাসে মা, সাফল্যের দিনে চোখে জল
বুধবার ● ১২ আগস্ট ২০২৬


 

সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য প্রবাসে মা, সাফল্যের দিনে চোখে জল

সঞ্জিব দাস, গলাচিপা (পটুয়াখালী) থেকে

 

সন্তানের সাফল্যের খবর শুনে একজন মায়ের আনন্দের সীমা কতটা হতে পারে, তা হয়তো ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। কিন্তু সেই সাফল্যের মুহূর্তে সন্তানকে একবার বুকে জড়িয়ে ধরার সুযোগ না থাকলে আনন্দের সঙ্গে মিশে যায় গভীর বেদনা। পটুয়াখালীর গলাচিপার এক মায়ের জীবন যেন সেই আনন্দ-বেদনারই গল্প।

 

তিন সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে নিজের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলো কাটিয়েছেন প্রবাসে। ২০১৪ সালে ছোট ছোট তিন সন্তানকে রেখে জীবিকার সন্ধানে হংকংয়ে পাড়ি জমান তিনি। এরপর ২০১৯ সালেও জীবিকার প্রয়োজনে আবার বিদেশে যেতে হয় তাকে। প্রায় এক যুগ ধরে প্রবাসের মাটিতে কঠোর পরিশ্রম করে চলেছেন। তার একমাত্র লক্ষ্য- সন্তানরা যেন সুশিক্ষিত হয়ে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারে।

 

আজ সেই তিন সন্তানই মায়ের দীর্ঘ ত্যাগের প্রতিদান দিচ্ছে নিজেদের সাফল্যের মধ্য দিয়ে। একজন পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জনের পাশাপাশি পেয়েছে জিপিএ-৫। অন্য দুই সন্তানও পড়াশোনায় মেধার স্বাক্ষর রেখে এগিয়ে যাচ্ছে। দূর প্রবাসে বসে সন্তানদের সাফল্যের খবর শুনে আনন্দে চোখ ভিজে যায় মায়ের। তবে সেই অশ্রুতে আনন্দের পাশাপাশি জমে আছে দীর্ঘ বিচ্ছেদ ও না-পাওয়ার কষ্ট।

 

স্বামী পরিত্যক্ত হওয়ার পর শুরু যুদ্ধ

 

স্বামী পরিত্যক্ত হওয়ার পর মাত্র দুই বছর বয়সী এক সন্তানসহ তিন শিশুসন্তানকে নিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন ওই নারী। সন্তানদের খাবার, পোশাক, চিকিৎসা, পড়াশোনা এবং ভবিষ্যৎ- সবকিছু নিয়েই প্রতিদিন বাড়তে থাকে দুশ্চিন্তা।

 

একদিকে সংসারের অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে তিনটি নিষ্পাপ মুখ। সন্তানদের ভবিষ্যৎ যেন অন্ধকারে হারিয়ে না যায়, সেই চিন্তা থেকেই জীবিকার সন্ধানে বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

 

২০১৪ সালে হংকংয়ে পাড়ি জমান। মায়ের কাছে সেটি শুধু বিদেশযাত্রা ছিল না; ছিল সন্তানদের জন্য নিজের জীবনকে নতুন করে উৎসর্গ করার শুরু।

 

প্রবাসের মাটিতে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। সহ্য করেছেন একাকীত্ব। ঈদ-পার্বণ কিংবা বিশেষ কোনো দিনেও সন্তানদের পাশে থাকতে পারেননি। সন্তান অসুস্থ হলে মাথায় হাত রেখে সান্ত্বনা দেওয়ার সুযোগ হয়নি। আবার তাদের আনন্দের মুহূর্তেও পাশে দাঁড়িয়ে আনন্দ ভাগ করে নিতে পারেননি। তবু থামেননি তিনি। কারণ তার চোখের সামনে ছিল তিন সন্তান ও তাদের ভবিষ্যৎ।

 

মায়ের অনুপস্থিতিতে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে সন্তানদের জীবন

 

পারিবারিক জীবনের নানা পরিবর্তনের কারণে সন্তানদের বাবার সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা সীমিত হয়ে পড়ে বলে জানান ওই মা। এতে মায়ের দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে সন্তানদের নিরাপত্তা, পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ে।

 

একপর্যায়ে সন্তানদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসনের শরণাপন্ন হন তিনি। তার আকুতি এবং সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় নিয়ে তিন সন্তানের সরকারি শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়।

 

সেখান থেকেই যেন বদলে যেতে থাকে তাদের জীবন। মায়ের কাছ থেকে দূরে থাকলেও তারা পায় নিরাপদ পরিবেশ, পড়াশোনার সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ গড়ার পরিবেশ।

 

আর দূর দেশে থাকা মা প্রতিটি দিন কাটাতে থাকেন সন্তানদের সাফল্যের অপেক্ষায়।

 

সাফল্যের খবর আসে, কিন্তু মা থাকেন দূর দেশে

 

অবশেষে সেই অপেক্ষার দিন আসে। তিন সন্তানের একজন পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জনের পাশাপাশি জিপিএ-৫ পায়। সন্তানের এই অসাধারণ সাফল্যের খবর যখন প্রবাসে থাকা মায়ের কানে পৌঁছায়, তখন আনন্দে আপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।

 

বছরের পর বছর কষ্ট, শ্রম আর অপেক্ষার যেন এটাই প্রথম বড় পুরস্কার।

 

কিন্তু সেই পুরস্কারের মুহূর্তে সন্তানকে কাছে পাননি মা। ফলাফল হাতে নেওয়ার সময় পাশে দাঁড়াতে পারেননি। সন্তানের মাথায় হাত রেখে বলতে পারেননি, ‘তুই পেরেছিস।’

 

সন্তানের সাফল্যের দিনে পাশে থাকতে না পারার এই আক্ষেপই যেন তার আনন্দের মধ্যে সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা।

 

মায়ের স্বপ্নের পথে এগিয়ে চলছে অন্য দুই সন্তানও

 

শুধু একজন নয়, প্রবাসী মায়ের অন্য দুই সন্তানও পড়াশোনায় মেধার পরিচয় দিয়ে এগিয়ে চলছে।

 

তাদের একজন বরিশাল ব্যাপ্টিস্ট মিশনে পড়াশোনা করছে। অন্যজন পড়ছে পটুয়াখালী কারিগরি স্কুলে। শিক্ষকদের কাছেও তারা ভালো ও মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত।

 

তিন সন্তানই এখন ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে নিজেদের ভবিষ্যতের দিকে। তাদের প্রতিটি অর্জনের পেছনে অদৃশ্যভাবে জড়িয়ে আছে একজন মায়ের ত্যাগ, অশ্রু, অপেক্ষা ও প্রার্থনা।

 

‘সন্তানদের মুখে হাসি দেখার জন্যই সব কষ্ট সহ্য করেছি’

 

প্রবাসী মা বলেন, ‘আমি হয়তো সন্তানদের পাশে থেকে তাদের বড় করতে পারিনি। তাদের ছোটবেলার অনেক মুহূর্ত আমি হারিয়েছি। তাদের আনন্দের দিনে কাছে থাকতে পারিনি। কিন্তু তাদের মুখে হাসি দেখার জন্যই জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলো পার করেছি।’

 

তিনি আরও বলেন, ‘আমার সন্তানরা যেন ভালো মানুষ হয়, লেখাপড়া করে নিজেদের পায়ে দাঁড়ায়- এটাই আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। তারা যদি জীবনে ভালো কিছু করতে পারে, তাহলে আমার এত বছরের কষ্ট সার্থক হবে।’

 

এক মায়ের কাছে সন্তানরাই তার পৃথিবী

 

প্রবাসে থাকা এই মায়ের গল্প শুধু একজন নারীর গল্প নয়। এটি সেইসব মায়ের গল্প, যারা সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের বর্তমানকে বিসর্জন দেন।

 

সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে গিয়ে নিজের ক্ষুধা ভুলে যাওয়া, সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগাতে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দেওয়া কিংবা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হাজার মাইল দূরে একাকী জীবন কাটানো- এসব ত্যাগের মূল্য কোনো অর্থ দিয়ে মাপা যায় না।

 

আজ তার তিন সন্তান এগিয়ে যাচ্ছে। একজনের সাফল্য ইতোমধ্যে মাকে গর্বিত করেছে। অন্য দুজনও এগিয়ে চলছে একই স্বপ্নের পথে।

 

তবে একটি অপূর্ণতা এখনো রয়ে গেছে- সন্তানদের সাফল্যের দিনে মা পাশে নেই।

 

হয়তো কোনো একদিন প্রবাসের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে সেই মা সন্তানদের সামনে দাঁড়াবেন। হয়তো তখন কোনো কথা বলবেন না। শুধু তিন সন্তানকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে নীরবে কাঁদবেন।

 

সেই কান্নায় থাকবে এক যুগের বিচ্ছেদ, অসংখ্য রাতের একাকীত্ব, হাজারো না-পাওয়ার কষ্ট এবং শেষ পর্যন্ত সন্তানদের সাফল্য দেখে পাওয়া এক মায়ের সীমাহীন আনন্দ।

 

সন্তানদের জন্য এই মায়ের একটাই প্রার্থনা- তারা যেন সুশিক্ষিত, সৎ ও ভালো মানুষ হয়ে নিজেদের জীবন গড়ে তোলে এবং একদিন দেশের মুখ উজ্জ্বল করে।

বাংলাদেশ সময়: ১৬:৪২:২৯ ● ৪৬ বার পঠিত