বৃহস্পতিবার ● ৬ আগস্ট ২০২৬

বিদ্যুৎ আছে, কিন্তু নেই; দায় কার?

হোম » মতামত » বিদ্যুৎ আছে, কিন্তু নেই; দায় কার?
বৃহস্পতিবার ● ৬ আগস্ট ২০২৬


 

নাসির উদ্দিন বিপ্লব

নাসির উদ্দিন বিপ্লব

 

বিদ্যুৎ খাতে বাংলাদেশের সাফল্যের অন্যতম সূচক হিসেবে প্রায়ই উৎপাদন সক্ষমতার কথা বলা হয়। বর্তমানে দেশের স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সক্ষমতা আর প্রকৃত উৎপাদনের মধ্যে ব্যবধান দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে। সক্ষমতা যখন প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট, তখন উৎপাদন হচ্ছে তার প্রায় অর্ধেক। ফলাফল- প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়মিত লোডশেডিং।

 

প্রশ্ন উঠতেই পারে, এত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরও কেন এই সংকট?

 

এর প্রধান কারণ জ্বালানি সরবরাহের দুর্বলতা। দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু প্রয়োজনীয় গ্যাসের অভাবে এসব কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাতারবাড়ির দুটি ভাসমান এলএনজি পুনঃগ্যাসীকরণ টার্মিনাল ২১ জুলাই থেকে বন্ধ থাকা। আমদানিকৃত এলএনজিকে গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের এই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো অচল থাকায় গ্যাস সংকট আরও প্রকট হয়েছে। পাশাপাশি পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণে এবং বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।

 

তবে কেবল জ্বালানি সংকটই নয়, বিদ্যুৎ খাতের অর্থনৈতিক কাঠামোও গভীর উদ্বেগের বিষয়। দেশে এমন বহু বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যেগুলো উৎপাদনে না থাকলেও চুক্তি অনুযায়ী ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয়। অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও ব্যয় থেমে থাকে না। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই ব্যয় বেড়ে প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। একই সময়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কাছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার বকেয়া জমেছে। এটি বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ভারসাম্য নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।

 

এমন বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে- যে খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে, সেখানে কেন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না? কেন একদিকে বিদ্যুতের দাম বাড়বে, অন্যদিকে লোডশেডিংও চলবে? এই প্রশ্নের জবাব কেবল সাময়িক উৎপাদন ঘাটতিতে সীমাবদ্ধ নয়; এর উত্তর নিহিত রয়েছে পরিকল্পনা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয়হীনতায়।

 

বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নিঃসন্দেহে প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের পূর্বশর্ত জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত না করে কেবল উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর কৌশল দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হতে পারে না। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতে চুক্তিভিত্তিক ব্যয়, ক্যাপাসিটি চার্জের যৌক্তিকতা এবং বিনিয়োগের কার্যকারিতা নিয়মিত মূল্যায়ন করাও জরুরি। অন্যথায় উৎপাদন সক্ষমতার পরিসংখ্যান যতই উজ্জ্বল হোক, বাস্তবের অন্ধকার দূর হবে না।

 

জ্বালানি নিরাপত্তা, উৎপাদন সক্ষমতার বাস্তব ব্যবহার এবং আর্থিক শৃঙ্খলা- এই তিনটি বিষয়কে সমন্বিত করে দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণের বিকল্প নেই। বিদ্যুৎ খাতে টেকসই সংস্কার ছাড়া লোডশেডিং ও মূল্যবৃদ্ধির এই দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হবে। উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড কেবল স্থাপিত সক্ষমতা নয়; বরং সেই সক্ষমতা কতটা নিরবচ্ছিন্ন সেবায় রূপ নেয়, সেটিই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

 

লেখক: কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সভাপতি। 

বাংলাদেশ সময়: ৫:৩৩:৫৭ ● ২৬ বার পঠিত