বুধবার ● ২২ জুলাই ২০২৬
বরগুনায় সাইক্লোন শেল্টার সংকট, নিরাপদ আশ্রয়ের বাইরে রয়ে যায় লাখো মানুষ
হোম » বরগুনা » বরগুনায় সাইক্লোন শেল্টার সংকট, নিরাপদ আশ্রয়ের বাইরে রয়ে যায় লাখো মানুষ

এম মজিবুল হক কিসলু, বরগুনা থেকে
বরগুনায় প্রায় ১৪ লাখ মানুষের জন্য স্থায়ী সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে ৫০৯টি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জেলার ছয় উপজেলায় ১৬৮টি স্থায়ী সাইক্লোন শেল্টার ও ৩৪১টি সাইক্লোন শেল্টার কাম স্কুল রয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে দুর্যোগের সময় জেলার মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ মানুষের আশ্রয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের সময় বিপুলসংখ্যক মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের বাইরে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা বরগুনার মানুষ ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের সঙ্গে লড়াই করে বসবাস করছে। ২০০৭ সালের সিডর, ২০০৯ সালের আইলা, ২০২০ সালের আম্পান, ২০২২ সালের সিত্রাং ও ২০২৩ সালের মোখার মতো দুর্যোগের ভয়াবহ স্মৃতি এখনো উপকূলের মানুষের মনে তাজা। কিন্তু দুর্যোগ মোকাবিলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সাইক্লোন শেল্টারের সংখ্যা জনসংখ্যার তুলনায় এখনও অপর্যাপ্ত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বরগুনা সদর, আমতলী, বামনা, পাথরঘাটা, তালতলী ও বেতাগী উপজেলায় সরকারি হিসাবে স্থায়ী সাইক্লোন শেল্টার ১৬৮টি এবং সাইক্লোন শেল্টার কাম স্কুল ৩৪১টি। দুর্যোগের সময় এসব আশ্রয়কেন্দ্রের পাশাপাশি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন বহুতল ভবনও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তবে আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা ৬০০ ছাড়ালেও উপকূলীয় জনসংখ্যার তুলনায় তা পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলার উপকূলীয় ইউনিয়নগুলোর মধ্যে বরগুনা সদর, আমতলী, তালতলী, পাথরঘাটা, বেতাগী ও বামনা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এম. বালিয়াতলী, বুড়িরচর, আয়লাপাতাকাটা, নলটোনা, ঢলুয়া, কুকুয়া, নিশানবাড়িয়া, চরদুয়ানী, ছোটবগী, বড়বগী ও কাকচিড়াসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের বাসিন্দাদের দুর্যোগের সময় নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক সাইক্লোন শেল্টার দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। কোথাও পর্যাপ্ত টয়লেট নেই, কোথাও নেই বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা। নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধারও ঘাটতি রয়েছে। আবার অনেক এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার সড়ক বেহাল থাকায় দুর্যোগের সময় সেখানে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।
বরগুনা সদর উপজেলার ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) টিম লিডার জাকির হোসেন বলেন, ‘বরগুনা একটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় জেলা। বর্তমানে যে সংখ্যক সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে, তা সব মানুষের জন্য পর্যাপ্ত নয়। নতুন আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং সেখানে সহজে পৌঁছানোর জন্য যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। দুর্যোগের সময় মানুষের জীবন রক্ষাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।’
বরগুনা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আবু জাফর মোঃ সালেহ বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি বাড়ছে। সে অনুযায়ী আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যাও বাড়াতে হবে। পাশাপাশি আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার সড়কগুলো সারা বছর চলাচল উপযোগী রাখতে হবে। পরিকল্পিত উদ্যোগ ছাড়া উপকূলের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।’
তালতলী উপজেলার নিশানবাড়িয়া গ্রামের গৃহিণী মোরশেদা আক্তার বলেন, ‘দুর্যোগের সময় শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা খুব কষ্টকর। অনেক জায়গায় আলাদা টয়লেট বা নারীদের জন্য নিরাপদ ব্যবস্থা নেই।’
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সরকার পর্যায়ক্রমে নতুন সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ ও পুরোনো আশ্রয়কেন্দ্র সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে উপকূলীয় এলাকার জনসংখ্যা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ও দুর্যোগের তীব্রতা বিবেচনায় আরও সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ সময়: ১৫:৫২:০০ ● ২৭ বার পঠিত
