শুক্রবার ● ১০ জুলাই ২০২৬

ভাঙন ও অব্যবস্থাপনায় সৌন্দর্য হারাচ্ছে কুয়াকাটা, সংকটে পর্যটন খাত

হোম » লিড নিউজ » ভাঙন ও অব্যবস্থাপনায় সৌন্দর্য হারাচ্ছে কুয়াকাটা, সংকটে পর্যটন খাত
শুক্রবার ● ১০ জুলাই ২০২৬


 

ভাঙন ও অব্যবস্থাপনায় সৌন্দর্য হারাচ্ছে কুয়াকাটা, সংকটে পর্যটন খাত

এ.এম. মিজানুর রহমান বুলেট, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)

 

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সাগরের অব্যাহত ভাঙন এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত দিন দিন সৌন্দর্য হারাচ্ছে। সৈকতের বিস্তীর্ণ এলাকায় বালু ক্ষয়, জিও ব্যাগের স্তুপ এবং বিভিন্ন স্থানে ভূমিধসের কারণে নষ্ট হচ্ছে নান্দনিক পরিবেশ। এতে পর্যটননির্ভর স্থানীয় অর্থনীতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

 

একসময় যে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে একই স্থান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উপভোগ করতে দেশ-বিদেশের পর্যটকরা ভিড় করতেন, বর্তমানে সেখানে দেখা মিলছে ভাঙনকবলিত সৈকত, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জীর্ণ জিও টিউব ও জিও ব্যাগ এবং অসমতল বালুচরের।

 

পর্যটনসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সাল থেকে সৈকতে ভাঙন শুরু হয়। ২০০৫ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে তা ভয়াবহ রূপ নেয়। ২০১১ সালের পর ভাঙনের তীব্রতা কিছুটা কমলেও প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আবারও প্রকট হয়ে ওঠে। চলতি বছরও উত্তাল ঢেউয়ের তাণ্ডবে সৈকতের পশ্চিম মাঝিবাড়ি এলাকায় বেশ কয়েকটি ব্লক সরে গেছে। ঝাউবন, গঙ্গামতি ও চর গঙ্গামতিসহ দীর্ঘ ৩০ কিলোমিটার সৈকতের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকা ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। অনেক স্থানে বালু সরে গিয়ে নিচের মাটি উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে।

 

স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘ ২৫ বছরের ভাঙনে ইতোমধ্যে বিলীন হয়েছে ফয়েজ মিয়ার নারিকেল বাগান, শালবন, এলজিইডির বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট কাম রেস্ট হাইস, জেলা পরিষদের ডাকবাংলো, বিস্তীর্ণ ঝাউবন, কুয়াকাটা উদ্যানসহ বিভিন্ন স্থাপনা। গত বছর ভেঙে গেছে সৈকতসংলগ্ন নির্মাণাধীন সড়ক। বর্তমানে ঝুঁকিতে রয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ বক্স, মসজিদ, মন্দির, জেলা পরিষদের নির্মিত ট্যুরিজম পার্ক, ওয়াশরুমসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। জোয়ারের সময় সৈকতের অনেক অংশে হাঁটার মতো বালুচরও থাকে না।

 

পর্যটকরা জানান, আগে যেখানে বিস্তীর্ণ বালুকাবেলায় হাঁটাচলা ও সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত উপভোগ করা যেত, এখন সেখানে চোখে পড়ে জিও ব্যাগের সারি। এতে সৈকতের সৌন্দর্য ও আকর্ষণ অনেকটাই কমে গেছে।

 

পর্যটনসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দীর্ঘমেয়াদে সৈকতের নান্দনিকতা নষ্ট হলে পর্যটকের সংখ্যা কমে যাবে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে স্থানীয় পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতে। তাদের দাবি, দ্রুত গ্রোয়েন বাঁধসহ কার্যকর স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হোক।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, জিও ব্যাগ দিয়ে সাময়িকভাবে ভাঙন নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও কুয়াকাটাকে রক্ষায় প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও বিজ্ঞানভিত্তিক উপকূল ব্যবস্থাপনা। নিয়মিত ড্রেজিং, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ এবং উপকূলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রেখে পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর তারা গুরুত্বারোপ করেন।

 

কুয়াকাটার পর্যটনকর্মী জনি আলমগীর বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড গত পাঁচ বছর ধরে বর্ষা মৌসুমে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।

 

কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আব্দুল মোতালেব শরীফ বলেন, কুয়াকাটার সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন সৈকতের স্থায়ী সুরক্ষা। ভাঙনের ঝুঁকি থেকে সৈকত ও পর্যটনসম্পদ রক্ষায় দ্রুত কার্যকর প্রকল্প বাস্তবায়ন জরুরি।

 

কুয়াকাটা প্রেসক্লাবে সাবেক সভাপতি মো. আনোয়ার হোসেন আনু বলেন, প্রতিবছর একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। কুয়াকাটা বিশ্বের অন্যতম নান্দনিক সমুদ্রসৈকত। তাই ভূমিক্ষয় রোধে গবেষণাভিত্তিক ও সময়োপযোগী স্থায়ী প্রকল্প নিতে হবে। স্থানীয়দের মতামত নিয়ে সঠিক নকশায় প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে সৈকতের সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন থাকবে। ভুল পরিকল্পনার কারণে অতীতের একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি।

 

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কলাপাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহ আলম বলেন, ভাঙন রোধে সৈকত এলাকায় অস্থায়ীভাবে বালুভর্তি জিও টিউব স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে প্রায় ৭৫৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন ও বাস্তবায়ন হলে স্থায়ীভাবে ভাঙন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে বলে আমরা আশা করছি।

বাংলাদেশ সময়: ১৬:৫৪:১৩ ● ৩৮ বার পঠিত