শনিবার ● ২০ জুন ২০২৬
৫ বছরেও চালু হয়নি আইসিইউ, চিকিৎসা সংকটে ভোলা জেনারেল হাসপাতাল
হোম » লিড নিউজ » ৫ বছরেও চালু হয়নি আইসিইউ, চিকিৎসা সংকটে ভোলা জেনারেল হাসপাতাল

সাগরকন্যা প্রতিবেদক, ভোলা
দ্বীপজেলা ভোলার প্রায় ২২ লাখ মানুষের উন্নত চিকিৎসা সেবার অন্যতম ভরসাস্থল ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট ভোলা জেনারেল হাসপাতাল। কিন্তু হাসপাতালটির ছয় শয্যার আইসিইউ (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) পাঁচ বছর ধরে অচল অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে কোটি টাকার সরকারি যন্ত্রপাতি ব্যবহারহীন অবস্থায় নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। একই সঙ্গে হৃদরোগসহ সংকটাপন্ন রোগীরা প্রয়োজনীয় নিবিড় পরিচর্যা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, আইসিইউ সেবা না থাকায় গুরুতর রোগীদের বরিশাল ও ঢাকায় রেফার করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সময় রোগীর অবস্থা আরও অবনতি ঘটে। সচেতন মহলের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ এই ইউনিট চালুর বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান তৎপরতা নেই। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রয়োজনীয় জনবল ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পেলেই আইসিইউ চালু করা সম্ভব হবে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালে হাসপাতালের নতুন বহুতল ভবনের তৃতীয় তলায় ছয়টি আইসিইউ বেড স্থাপন করা হয়। পাশাপাশি পাঁচটি ভেন্টিলেটর, সাতটি অক্সিজেন কনসেনট্রেটর, ছয়টি হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা এবং সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় ইউনিটটি এখনো চালু করা যায়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে আইসিইউ।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ৮৭টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২২ জন চিকিৎসক। ৯২টি নার্স পদের বিপরীতে দায়িত্ব পালন করছেন ৭৬ জন। হৃদরোগীদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে রয়েছেন মাত্র একজন কার্ডিওলজি বিশেষজ্ঞ। অন্যদিকে প্রতিদিন হাসপাতালের ধারণক্ষমতার প্রায় তিন গুণ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন।
হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে গত পাঁচ দিন ধরে পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. আবু কালাম হাওলাদার অভিযোগ করে বলেন, ‘হাসপাতালে সঠিক চিকিৎসা পাইতেছি না, কইয়া লাভ নাই। টাকা-পয়সা নাই দেইখাই পোলাপানে আমারে এখানে ভর্তি কইররা রাখছে।’
একই ওয়ার্ডে ১৪ দিন ধরে চিকিৎসাধীন উত্তর দিঘলদী ইউনিয়নের মো. ফরমুজুল হক হাওলাদার বলেন, ‘ভোলা সদর হাসপাতালের বেডে শুধু শুয়েই আছি। যে অবস্থায় ছেলে-মেয়েরা এনে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছে, সে অবস্থাতেই আছি। আমার স্বাস্থ্যের কোনো উন্নতি হয়নি।’
রোগীদের স্বজন লাইজু বেগম, মনোয়ারা বেগম ও আলী আকবর বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। বাবাদের চিকিৎসার জন্য ভোলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করেছি। কিন্তু দিনের পর দিন পার হলেও অবস্থার উন্নতি দেখছি না। হাসপাতালের লোকজন ঢাকা বা বরিশালে নিয়ে যেতে বলে। টাকা-পয়সা থাকলে তো এখানে রাখতাম না।’
তারা আরও বলেন, ‘প্রতিদিন সকালে একজন ডাক্তার কয়েক মিনিটের জন্য ওয়ার্ডে রাউন্ড দেন। এরপর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হৃদরোগের আর কোনো চিকিৎসককে পাওয়া যায় না। চিকিৎসার অভাবে কেউ মারা গেলে দায়ভার কে নেবে? আইসিইউ ইউনিট চালু থাকলে রোগীরা আরও ভালো চিকিৎসা পেত।’
বোরহানউদ্দিন উপজেলার পক্ষিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. ওমর ফারুক হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ভোলা জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে সেখানে যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়ার অভিযোগ করেন তার স্বজনরা।
রোগীর ভাগনে মো. রাসেল বলেন, ‘আমার মামাকে চিকিৎসার জন্য ভোলা সদর হাসপাতালে আনার পর হৃদরোগের যথাযথ চিকিৎসা পাইনি। তাই অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি।’
সচেতন নাগরিক মো. রাকিব ও হাসনাইন বলেন, ‘ভোলাবাসীর কাজে না এলে ভোলা সদর হাসপাতালে ছয়টি আইসিইউ বেড স্থাপন করা হয়েছে কেন? হৃদরোগে আক্রান্ত মুমূর্ষু রোগীরা আজও আইসিইউ সেবা পাচ্ছেন না। আমরা ভোলাবাসী রাষ্ট্রীয় নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সামান্য চিকিৎসা দিয়ে রোগীদের ঢাকা ও বরিশালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পথে অনেকের প্রাণ ঝরে যায়। আইসিইউ সেবার অভাবে আর কত প্রাণ হারাতে হবে?’
ভোলা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. তৈয়বুর রহমান বলেন, ‘আইসিইউ চালানোর জন্য অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ, প্রশিক্ষিত নার্সসহ প্রয়োজনীয় জনবল দরকার। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল ও অন্যান্য সুবিধা পাওয়া গেলে আইসিইউ ইউনিট চালু করা হবে এবং রোগীদের আইসিইউ সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।’
হৃদরোগীদের চিকিৎসা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ভোলা জেনারেল হাসপাতালে হৃদরোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। শুধু যেসব রোগীর বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রয়োজন হয়, তাদের রেফার করা হয়।’
ভোলার চিকিৎসাসেবার গুরুত্বপূর্ণ এই আইসিইউ ইউনিট দ্রুত চালুর জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের প্রত্যাশা, ইউনিটটি চালু হলে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাবেন এবং দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান ঘটবে।
বাংলাদেশ সময়: ৬:৩৪:৪৪ ● ২৩ বার পঠিত
