রবিবার ● ৩১ মে ২০২৬
কুয়াকাটা পর্যটনে সংকট: পর্যটক কমছে, বাড়ছে অব্যবস্থাপনা
হোম » মতামত » কুয়াকাটা পর্যটনে সংকট: পর্যটক কমছে, বাড়ছে অব্যবস্থাপনা

আসাদুজ্জামান দিদার
বাংলাদেশের অন্যতম নৈসর্গিক সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটা দীর্ঘদিন ধরেই ‘সাগরকন্যা’ নামে পরিচিত। এখান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত- উভয় দৃশ্যই উপভোগ করা যায়, যা দেশের অন্যান্য সমুদ্রসৈকতের তুলনায় কুয়াকাটাকে বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটকের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে সৈকতে নোংরা-আবর্জনা, যত্রতত্র দোকান স্থাপন, ওয়াশরুম সংকট, ব্যবসায়ীদের গলাকাটা বাণিজ্য এবং সেবার নিম্নমান নিয়ে বাড়ছে পর্যটকদের অভিযোগ।
পর্যটক কমে যাওয়ার কারণ
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও হোটেল মালিকদের ভাষ্যমতে, কয়েক বছর আগেও ছুটির মৌসুমে কুয়াকাটার অধিকাংশ হোটেল ও রিসোর্ট পূর্ণ থাকত। এখন অনেক সময় অর্ধেক কক্ষও ভাড়া হয় না। পর্যটক কমে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ সামনে এসেছে-
১. সৈকতের পরিবেশগত অবনতি
২. অপরিকল্পিত দোকানপাট ও দখল
৩. পর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থার অভাব
৪. নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
৫. পর্যটনসেবার নিম্নমান
৬. হোটেল-মোটেলে অতিরিক্ত ভাড়া ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবসা
৭. রেস্তোরাঁ মালিকদের গলাকাটা বাণিজ্য
পর্যটকদের অভিযোগ, কুয়াকাটায় গিয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ পরিবেশ পাওয়া যায় না। ফলে অনেকে এখন বিকল্প হিসেবে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত কিংবা দেশের অন্যান্য পর্যটন এলাকাকে বেছে নিচ্ছেন।
সৈকতে বাড়ছে নোংরা ও আবর্জনা
সৈকতের বিভিন্ন স্থানে প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন, খাবারের প্যাকেট ও পরিত্যক্ত ময়লা পড়ে থাকতে দেখা যায়। বিশেষ করে পর্যটকদের ফেলে যাওয়া আবর্জনা প্রতিদিন অপসারণ না হওয়ায় সৈকতের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে।
জিওটেক্স ব্যাগে বালি ভরাট করে সাগরের ঢেউ প্রতিরোধের ব্যবস্থা সৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অনেকাংশে ম্লান করে দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরিবেশবিদদের মতে, এভাবে চলতে থাকলে শুধু পর্যটন নয়, সামুদ্রিক পরিবেশও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। সৈকতের আশপাশে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন নেই এবং পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমও নিয়মিত নয়।
যত্রতত্র দোকান ও দখল
সৈকতের বিভিন্ন অংশে অনিয়ন্ত্রিতভাবে অস্থায়ী দোকান বসানো হয়েছে। কোথাও চায়ের দোকান, কোথাও ভ্রাম্যমাণ খাবারের স্টল, আবার কোথাও বিনোদনসামগ্রীর দোকান- সব মিলিয়ে অনেক স্থানে হাঁটার স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।
পর্যটকদের অভিযোগ, সৈকতের সৌন্দর্য রক্ষার পরিবর্তে ব্যবসায়িক বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। অনেক দোকানদার অতিরিক্ত দামে পণ্য বিক্রি করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ওয়াশরুম সংকট
কুয়াকাটার অন্যতম বড় সমস্যা হলো মানসম্মত পাবলিক ওয়াশরুমের অভাব। পর্যটকদের সংখ্যা বাড়লেও প্রয়োজনীয় স্যানিটেশন ব্যবস্থা বাড়েনি। অনেক ওয়াশরুম অস্বাস্থ্যকর ও ব্যবহার-অনুপযোগী। বিদ্যমান ওয়াশরুমগুলোর বেশির ভাগই মানসম্মত নয়।
নারী, শিশু ও বয়স্ক পর্যটকদের জন্য এই সমস্যা আরও গুরুতর হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক পরিবার শুধুমাত্র এই ভোগান্তির কারণে দীর্ঘ সময় সৈকতে অবস্থান করতে চান না। অন্তত ডজনখানেক মানসম্মত পাবলিক ওয়াশরুম স্থাপন প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
পর্যটকদের অভিযোগ, রাতে সৈকতের কিছু এলাকায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা থাকে না। চুরি, হয়রানি কিংবা অসাধু দালালদের উৎপাতের কথাও শোনা যায়। বিশেষ করে নারী পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। মাঝেমধ্যে নারী পর্যটক হেনস্তা বা ইভটিজিংয়ের খবরও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, দৃশ্যমান ট্যুরিস্ট পুলিশ, সিসিটিভি নজরদারি এবং দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।
সাংবাদিক ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের নেতিবাচক প্রচার
সংবাদপত্র, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুক মানুষের মতামত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেকের মতে, এসব মাধ্যমে কুয়াকাটার বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে ধারাবাহিক নেতিবাচক প্রতিবেদন ও কনটেন্ট প্রচারের ফলে পর্যটন খাতের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে পর্যটন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সমস্যাগুলো সমাধানের পাশাপাশি কুয়াকাটার ইতিবাচক দিকগুলোও তুলে ধরা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে সাংবাদিক, কনটেন্ট ক্রিয়েটর, পর্যটনসংশ্লিষ্ট সংগঠন ও কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি।
মানোন্নয়নে যা প্রয়োজন
বিশেষজ্ঞ ও পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, কুয়াকাটাকে আবার আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করতে জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন-
১. সৈকত পরিচ্ছন্ন রাখতে নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ
২. পর্যাপ্ত ডাস্টবিন ও আধুনিক ওয়াশরুম স্থাপন
৩. অবৈধ ও অপরিকল্পিত দোকান উচ্ছেদ
৪. খাবার ও হোটেল ভাড়ার কার্যকর মনিটরিং
৫. পর্যটক নিরাপত্তা জোরদার
৬. পরিবেশবান্ধব পর্যটন নীতিমালা বাস্তবায়ন
৭. স্থানীয় জনগণকে পর্যটন সচেতনতায় সম্পৃক্ত করা
দৃষ্টিনন্দন মেরিন ড্রাইভ ও সাগর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের দাবি
পর্যটন বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্রে রূপ দিতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। বিশেষ করে সমুদ্র উপকূল ঘেঁষে দৃষ্টিনন্দন ‘মেরিন ড্রাইভ কাম সাগর রক্ষা বাঁধ’ নির্মাণ এখন সময়ের দাবি।
এ ধরনের পরিকল্পিত মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ করা হলে একদিকে যেমন উপকূলীয় এলাকা জলোচ্ছ্বাস ও ভাঙনের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা পাবে, অন্যদিকে এটি পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় ভ্রমণপথে পরিণত হবে। সমুদ্রের পাশ দিয়ে দীর্ঘ সড়ক, বসার স্থান, ওয়াকওয়ে, সাইকেল লেন, সৌন্দর্যবর্ধক আলোকসজ্জা এবং সবুজায়ন কুয়াকাটার সৌন্দর্যকে নতুন মাত্রা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভের আদলে আধুনিক পরিকল্পনায় নির্মিত সড়ক কুয়াকাটার পর্যটন অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে। এতে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগ্রহও বাড়বে।
পরিকল্পিত সরকারি মার্কেট নির্মাণের প্রয়োজন
বর্তমানে সৈকতের বিভিন্ন অংশে যত্রতত্র দোকান বসানোর কারণে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে এবং পর্যটকদের চলাচলেও বিঘ্ন ঘটছে। এ সমস্যা সমাধানে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিকল্পিত পর্যটন মার্কেট নির্মাণের দাবি উঠেছে।
পরিকল্পিত মার্কেটে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, হস্তশিল্প বিক্রেতা, সামুদ্রিক খাবারের দোকান এবং পর্যটনসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দিষ্ট স্থানে স্থান দেওয়া হলে সৈকতের সৌন্দর্য রক্ষা পাবে এবং ব্যবসায়ও শৃঙ্খলা ফিরবে।
এ ছাড়া আধুনিক মার্কেটে থাকতে পারে-
ফুড কোর্ট
হস্তশিল্প জোন
সামুদ্রিক মাছ ও শুকনা মাছ কর্নার
পর্যটক তথ্যকেন্দ্র
আধুনিক পাবলিক ওয়াশরুম
পার্কিং সুবিধা
শিশুদের বিনোদন এলাকা
এতে একদিকে যেমন পর্যটকরা স্বাচ্ছন্দ্যে কেনাকাটা করতে পারবেন, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানও বাড়বে।
সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনার আহ্বান
পর্যটনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধুমাত্র বিচ্ছিন্ন উন্নয়ন নয়; কুয়াকাটার জন্য প্রণীত মাস্টারপ্ল্যানের বাস্তবায়ন অতীব জরুরি। যেখানে পরিবেশ সংরক্ষণ, নিরাপত্তা, আধুনিক অবকাঠামো, পরিচ্ছন্নতা এবং টেকসই পর্যটন- সবকিছুকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে।
কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত শুধু দেশের নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় সমুদ্র পর্যটনকেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।
সব সংকটের পরও কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এখনো পর্যটকদের আকর্ষণ করার মতো শক্তিশালী। সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ নেওয়া গেলে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত আবারও দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
সম্পাদকীয় নোট: এটি একটি মতামতধর্মী লেখা, এর সকল দায়দায়িত্ব একমাত্র লেখকের। লেখক গ্রাম ডাক্তার কল্যান সমিতি, মহিপুর থানা শাখা (পটুয়াখালী)’র আহবায়ক।
বাংলাদেশ সময়: ১০:৪৪:০৮ ● ৪৯ বার পঠিত
