শনিবার ● ৩০ মে ২০২৬

জিয়া স্মৃতি জাদুঘরে কিছুক্ষণ

হোম » মতামত » জিয়া স্মৃতি জাদুঘরে কিছুক্ষণ
শনিবার ● ৩০ মে ২০২৬


 

জিয়া স্মৃতি জাদুঘরের সামনে লেখক।

নূরুজ্জামান মামুন

 

বহুবার নানা কাজে চট্টগ্রাম ভ্রমণ করেছি। প্রতিবার যাওয়ার আগে পরিকল্পনা থাকত জিয়া স্মৃতি জাদুঘরটি দেখার। কিন্তু চট্টগ্রামে পৌঁছে আর মন সায় দিত না। অনেকবার প্রস্তুতি নিয়েও যাওয়া হয়নি। সেখানে গিয়ে নিজের চোখে কীভাবে দেখব একটি নির্মম হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি- এই ভাবনাই আমাকে বারবার পিছু টেনে ধরেছে। কারণ, ওই স্থানেই ঘুমন্ত অবস্থায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা, সবুজ বিপ্লবের নায়ক, সার্কের স্বপ্নদ্রষ্টা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে। সেই কারণেই বহুবার সেখানে না গিয়ে ফিরে এসেছি। তবে এবারের ভ্রমণে সহকর্মীর বিশেষ অনুরোধে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিই ইতিহাসের একটি জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের স্থানটি পরিদর্শনের।

 

শেষ বিকেলে (৯ মার্চ ২০১৩) গাড়ির ড্রাইভারকে বললাম, যেখানে জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা হয়েছিল, সেখানে নিয়ে যেতে। ড্রাইভার দ্রুত গতিতে গাড়ি চালিয়ে ছুটল শহরের প্রাণকেন্দ্র কাজীর দেউড়ির দিকে। যাওয়ার পথে সিডিএ সড়কের দুই পাশের নানা দৃশ্য দেখছিলাম। আর ভাবছিলাম- কীভাবে দেখব ইতিহাসের এমন একটি নির্মম হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য? ভাবতে ভাবতেই মন ভারী হয়ে আসে।

 

গাড়ি থেকে নেমে সহকর্মীর সাংবাদিকতার কার্ড দেখিয়ে ভেতরে প্রবেশ করি। তবে আমি টিকিট কেটে পাহাড়ের ওপর অবস্থিত জিয়া স্মৃতি জাদুঘরে প্রবেশ করি। সহকর্মী ভবনটির কারুকার্য দেখে ভীষণ উৎফুল্ল। এটি ব্রিটিশ আমলে নির্মিত পুরোনো সার্কিট হাউস। কিন্তু আমার মন তখন কতটা ভারাক্রান্ত হয়ে গিয়েছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।

 

দ্বিতল ভবনের নিচতলায় প্রবেশ করেই দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করি- কোন কক্ষে হত্যা করা হয়েছিল আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতিকে? তিনি হাত দিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে নির্দেশ দেন। এক একটি কক্ষে প্রবেশ করি আর চোখে পড়ে দেয়ালে জিয়াউর রহমানের পরিহিত সাধারণ পোশাকসহ ব্যবহৃত নানা জিনিসপত্র, তাঁর হাতে লেখা ডায়েরি, দেশ-বিদেশে তাঁর কর্মকাণ্ডের স্মৃতিচিহ্ন- সব মিলিয়ে এক ধরনের নীরব বিষণ্ন পরিবেশ।

 

সিঁড়ি বেয়ে যত উপরে উঠেছি, মন ততই ভারী হয়ে উঠেছে। এক পর্যায়ে পৌঁছি দ্বিতীয় তলার সেই কক্ষে- যেখানে জীবনের শেষ রাতে ঘুমিয়ে ছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। রুমের মাঝখানে একটি খাট, পাশে সোফা, দেয়ালে আর্ট করা পাঞ্জাবি-পাজামা পরা একটি ছবি (সেই রাতে তিনি যে পোশাকে ছিলেন)।

 

কক্ষটির উত্তর পাশে একটি স্ট্রেচার রাখা, যাতে বহন করা হয়েছিল জিয়াউর রহমানের মরদেহ। পাশে রক্তমাখা একটি কার্পেট। সেই দৃশ্য দেখে দ্রুত কক্ষ থেকে বের হয়ে পূর্ব পাশের খোলা জায়গায় আসি। সামনে বারান্দা। সেখানে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম- কীভাবে এমন একজন রাষ্ট্রপতিকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করা সম্ভব হলো!

 

এমন সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন মেঝের দিকে ইঙ্গিত করেন। প্রথমে আমি শঙ্কিত হই। পরে তিনি জানান, মেঝেতে গুলির চিহ্ন রয়েছে। তাঁর ধারণা, ঘাতকরা দরজা খুলতে বলেছিল। এরপর প্রেসিডেন্ট জিয়া দরজা খুলে বের হতেই এলোপাতাড়ি গুলি চালানো হয়। দরজার পাশে দেয়ালে রক্তের ছিটে পড়েছিল, যা এখনো সংরক্ষিত আছে।

 

এই দৃশ্য দেখে নিজেকে আর সামলাতে পারিনি। সহকর্মীকে রেখে দ্রুত নিচে নেমে আসি। বারবার নিজেকে প্রশ্ন করি- দেশের রাষ্ট্রপতি হয়েও কেন তিনি এমন অরক্ষিত স্থানে রাত যাপন করেছিলেন? কাজ শেষ করে কেন তিনি ঢাকায় ফিরে যাননি? মুহূর্তেই মনে হয়, তিনি ছিলেন জনতার জিয়া। তিনি দেশ ও দেশের জনগণকে ভালোবাসতেন। সে কারণেই জনগণের সুখ-দুঃখ উপলব্ধি করতে গ্রাম থেকে গ্রামে ছুটে যেতেন। সাধারণ মানুষের মতোই জীবনযাপন করতেন।

 

বর্তমান প্রজন্ম জাদুঘরটি দেখলেই বুঝতে পারবে জিয়াউর রহমান কতটা সাধারণ জীবনযাপন করতেন।

 

জাদুঘর ত্যাগ করার আগে মনে মনে বলি- জিয়াউর রহমানকে শুধু হত্যা করা হয়নি, হত্যা করা হয়েছে একটি স্বনির্ভর জাতি গঠনের স্বপ্নকে। যদি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা না হতো, তাহলে হয়তো আমরা পেতাম আরও একটি স্বনির্ভর, আধুনিক বাংলাদেশ।

 

প্রসঙ্গত, জিয়াউর রহমান হত্যার কিছুদিন আগে কলাপাড়া উপজেলার মিঠাগঞ্জ ইউনিয়নে আমাদের গ্রামের বাড়ির পাশে নিজ হাতে খাল খনন করেছিলেন। আমার পরিবার তখন ওই খননকাজের তদারকির দায়িত্বে ছিল। জিয়াউর রহমান খুশি হয়ে প্রয়াত শাহজাহান মিয়া দাদাকে (মাঝা ভাই) একটি টেলিভিশন উপহার দিয়েছিলেন।

 

হাই স্কুলের মাঠ থেকে স্পিডবোটে প্রেসিডেন্টের বহরে বাবার সঙ্গে আমিও গিয়েছিলাম খাল খনন অনুষ্ঠানে। প্রেসিডেন্ট আমাকে কোলে তুলে আদর করেছিলেন। সেই শৈশবের স্মৃতি আমার মনে গভীরভাবে দাগ কেটে আছে। আমার মা ও পরিবারের সবাই ছিলেন জিয়া-সমর্থক। তাঁদের দেখে আমিও ধীরে ধীরে প্রেসিডেন্ট জিয়ার ভক্ত হয়ে উঠি।

 

জিয়াউর রহমান হত্যার দিন আমাদের বাড়িতে মায়ের এক আত্মীয় বেড়াতে আসেন। হত্যাকারীদের সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে থাকতে পারে- এই সন্দেহে আমি তাকে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার কথা বলেছিলাম, এমনকি রাগের বশে কঠোর প্রতিক্রিয়ার কথাও বলেছিলাম। যদিও সে কথা আমার স্পষ্ট মনে না থাকলেও বড় হয়ে বাবা-মায়ের কাছ থেকে শুনেছি। মহান নেতার শাহাদাতবার্ষিকীতে তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি এবং তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।

 

সম্পাদকীয় নোট: এটি একটি মতামতধর্মী লেখা, এর সকল দায়দায়িত্ব একমাত্র লেখকের। লেখক কানাডাপ্রবাসী সাংবাদিক।

বাংলাদেশ সময়: ১৮:১১:৫২ ● ১৯ বার পঠিত